নিউ ইয়র্ক থেকে সোহেল হোসাইনঃ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে এসে চার দিনের সরকারি সফরের প্রথম দিনেই কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি বহুমাত্রিক কার্যক্রমে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথম দিনেই ১০টি শীর্ষ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক কর্মসূচিতে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ‘৩৬০ ডিগ্রি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল’ (360-degree diplomatic strategy)-এর বড় ধরণের প্রতিফলন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ডিপ্লোম্যাট সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন সফরের প্রথম দিনের অগ্রগতি নিয়ে বিষদ বিবরণ তুলে ধরেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ড. মাহদী আমিন বলেন, “জনগণের প্রবল সমর্থন নিয়ে দীর্ঘ আন্দোলনের পর নির্বাচিত হয়ে আসা বর্তমান সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। সফরের শুরুতেই সেই লক্ষ্য শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে।” সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্ধারিত ১২টি সূচির মধ্যে ১০টিতে প্রধানমন্ত্রী সশরীরে যোগ দেন।
তিনি বলেন, বিশ্বমঞ্চে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন তারেক রহমান। এর আগে তাঁর পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আরও এক বিরল মুহূর্ত তৈরি হয়েছে, যেখানে বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী দেশের হয়ে কথা বলছেন, অন্যদিকে তাঁরই মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশন পরিচালনা করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিগুলোর বিসদ বর্ণনা করতে গিয়ে উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর দিনের সূচনা হয় জাতিসংঘ মহাসচিবের ব্রেকফাস্ট ইভেন্টের মধ্য দিয়ে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। দিনটি সমাপ্ত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক আয়োজিত এক সান্ধ্য নৈশভোজে সস্ত্রীক যোগ দেওয়ার মাধ্যমে।
তিনি আরও বলেন, দিনটিতে বিশ্ব নেতাদের সাথে বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্যে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের সাথে গঠনমূলক ও আন্তরিক আলোচনা হয় এবং নির্বাচনে বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ জানান।
এছাড়াও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সাথে পৃথক বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা (Regional Cooperation) সুদৃঢ় করার রূপরেখা তৈরি হয়। পাশাপাশি হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অসামান্য অর্জন ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ব্যাপারে গভীর আগ্রহ ব্যক্ত করে দেশটি।
ড. মাহদী আমিন জানান, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূতের সাথে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। অতীতে শহীদ জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সময়কালে সফল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার উদাহরণ টেনে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ফেরানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির ওপর তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মাহদী আমিন বলেন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিদের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুন শিথিলকরণ (de-regulation) ও বাজেট সহায়তার বিষয়ে আলোচনা অগ্রাধিকার পায়।মেটা (Meta)-র প্রতিনিধিবৃন্দের সাথে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিদলের সফল বৈঠকে বাংলাদেশের মেটা ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্ম নিরাপত্তা, তথ্য সংরক্ষণ এবং তথ্য-প্রযুক্তির অগ্রগতি নিয়ে গঠনমূলক বার্তা আদান-প্রদান করা হয়।
প্রেস ব্রিফিংকালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামানসহ প্রেস উইংয়ের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।