টাইমস ২৪ ডটনেট : বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জের মধ্যে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংকট মোকাবিলা, অর্থনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায় বাংলাদেশ সরকার। তবে ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী ধাপ, সংস্কারের শর্ত এবং অর্থায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আবারও আলোচনায় বসবে বাংলাদেশ ও আইএমএফের সংশ্লিষ্ট দল।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে গতকাল শুক্রবার অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণ কর্মসূচি, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আলোচনাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকেও বৈঠককে ফলপ্রসূ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও চলমান কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন অর্থমন্ত্রী। বৈঠক শেষে আমির খসরু বলেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে উভয় পক্ষ আবার বসবে। দুই দলের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা করে বিভিন্ন ইস্যুতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে। বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাইকা ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। বর্তমান বছরটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার জনগণের কাছে যে উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থায়ন চাহিদার অন্যতম বড় বিষয় আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি। চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক কিস্তিতে মোট সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা আলোচনায় উঠে এসেছে। এ অর্থায়নের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশা থাকলেও ঋণের কিস্তি, শর্ত ও পরবর্তী পর্যায়ের অর্থ ছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দুই পক্ষের আরও আলোচনা প্রয়োজন। আগামী কয়েক সপ্তাহের বৈঠক এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেই রাজস্ব আয় বাড়ানোর অঙ্গীকার রয়েছে। অতীতে কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি এবং পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর ব্যবস্থার কারণে রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতি হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিতুমীরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ শতাংশ। বর্তমান সরকার ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আয়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তিনি বলেন, কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতি বন্ধ করে রাজস্ব ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু প্রতিশ্রুতিতে নয়, বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে অর্থনীতি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে পূর্বাভাসগুলো বুঝতে হবে। আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের প্রক্ষেপণে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথাও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অতীতে বিভিন্ন সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি—এমন অভিযোগ তুলে তিনি বর্তমান সরকারের সময় সরকারি হিসাব ও অর্থনৈতিক তথ্য যাচাইযোগ্য করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলা সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাট ও অনিয়মের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সামাল দিতে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিতুমীর। তাঁর প্রশ্ন, ব্যাংক খাতের অনিয়মের দায় সাধারণ মানুষ কেন বহন করবে? ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা তাঁদের প্রাপ্য অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁর দাবি, আস্থা ফিরে আসায় অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের চাপ কমেছে এবং অনেকে নতুন করে আমানত রাখছেন। অন্য যেসব ব্যাংকে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে রেজল্যুশন অ্যাক্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তবে ব্যাংক খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে সংস্কার কার্যক্রমের বাস্তবায়ন ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ব্যয় সামাল দেওয়া এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রশ্নটিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে তিতুমীর বলেন, এসব সংকট বাংলাদেশের তৈরি নয়, কিন্তু এর প্রভাব দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ছে। জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সার আমদানির ব্যয়ের পাশাপাশি কৃষি ও পরিবহন খাতের ওপর এর প্রভাব বিবেচনায় নিতে হচ্ছে সরকারকে।
জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিলে দেশের মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে কৃষি উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ পরিস্থিতিতে একদিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা সরকারের জন্য কঠিন ভারসাম্যের বিষয়।
এ প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন তিতুমীর। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন, তাঁদের সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন করে মানুষ যাতে দারিদ্র্যের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা সরকারের লক্ষ্য। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে এ ধরনের কর্মসূচির কার্যকারিতা ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিতুমীর। প্রধানমন্ত্রী উৎপাদনকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চল ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার যে পরিকল্পনার কথা বলেছেন, তার মাধ্যমে উৎপাদন ও রপ্তানি সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি। দারিদ্র্য হ্রাস, ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোকে তিনি সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের পরস্পর-সম্পর্কিত তিনটি দিক হিসেবে তুলে ধরেন।
ব্যাংককের বৈঠক বাংলাদেশের জন্য এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে আলোচনায় সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া এবং ঋণের অর্থ ছাড় বা সংস্কার কর্মসূচির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের আলোচনায় ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতি, সংস্কারের অগ্রাধিকার ও অর্থায়নের শর্ত নিয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, তার ওপর বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক পদক্ষেপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভর করবে।
বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া—এই চারটি ক্ষেত্রেই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় সহযোগিতার যে বার্তা এসেছে, তা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। এখন সেই বার্তাকে কার্যকর অর্থায়ন, বাস্তব সংস্কার ও সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান স্বস্তিতে রূপ দেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ