টাইমস ২৪ ডটনেট: চলতি বছর চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে চীনের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে। এর আগে প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছিল আইএমএফ। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রপ্তানি খাতে ভালো অবস্থান থাকলেও অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় ও বিনিয়োগের দুর্বলতা চীনের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস দেশটির নির্ধারিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার সর্বনিম্ন সীমার কাছাকাছি। ২০২৬ সালে চীন ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবাসন খাতের সংকটের কারণে ভোক্তাদের ব্যয় কমেছে। পাশাপাশি বিনিয়োগেও দেখা দিয়েছে ধীরগতি। শক্তিশালী রপ্তানি অর্থনীতির এসব দুর্বলতার কিছুটা প্রভাব সামাল দিলেও সামগ্রিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। এর সঙ্গে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও কাঠামোগত সমস্যাও চীনের প্রবৃদ্ধির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। সরকারের নীতিগত সহায়তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমে যাওয়া ঠেকাতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিক থেকে ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকের মধ্যে বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১৩০ ডলারে উঠতে পারে। একই সময়ে তেলের মজুত আরও কমানোর সুযোগ সীমিত থাকবে। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬ সালে তেলের গড় দাম আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪০ শতাংশ বেশি হতে পারে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে চীনের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন কয়েক বছর ধরে প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে আসছিল। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা, আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ঝুঁকির কারণে এবার লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে, যা বাজারের প্রত্যাশার চেয়ে কম। ২০২২ সালের শেষের পর এটি চীনের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি।
এ বছর চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে রপ্তানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় কম থাকায় বিদেশের বাজারে পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশটির রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ৪০ হাজার ১৪৪ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত হয়েছে ৮০ হাজার ৫৫১ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ৩ শতাংশ বেশি। রপ্তানি আয় আমদানির ব্যয়ের চেয়ে বেশি হলে যে ব্যবধান তৈরি হয়, তাকে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বলা হয়। আইএমএফের ধারণা, ২০২৬ সালে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আরও বাড়তে পারে। ২০২৫ সালে দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রেকর্ড ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছিল।
রপ্তানি বাড়লেও দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি বলে জানিয়েছে বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলি। সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, চীনের রপ্তানি বাড়াতে এখন আগের তুলনায় বেশি মূলধন বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। ফলে রপ্তানি বৃদ্ধির সুফল কর্মসংস্থান ও পরিবারের আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সীমিত থাকছে।
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চাপের মুখে রয়েছে চীন সরকার। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে চাঙা করতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নীতিনির্ধারণী ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমানো, বাড়ি কেনার ঋণের সুদে ভর্তুকি দেওয়া এবং বিনিয়োগ বাড়াতে স্থানীয় সরকারগুলোকে ৫৫ হাজার কোটি ইউয়ান ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। ডলারের হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ২২০ কোটি। মরগান স্ট্যানলির ধারণা, এসব উদ্যোগের ফলে ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকে চীনের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়তে পারে। তবে স্থানীয় সরকারগুলোর ঋণের চাপ, আবাসন খাতের সংকট এবং ভোক্তাদের আস্থার ঘাটতির কারণে ২০২৭ সালেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
অক্টোবরের শুরুতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগানের বিশ্লেষকেরাও বলেছেন, ভোক্তাদের ব্যয় কম থাকায় অবকাঠামো খাতে আরও ব্যয় এবং অতিরিক্ত প্রণোদনার প্রয়োজন হতে পারে। সামনে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকায় নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্মকর্তারা সতর্ক অবস্থানে থাকতে পারেন। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে অক্টোবরের শেষ দিকে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন এবং আগামী মার্চে চীনের বার্ষিক দুই অধিবেশন।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব কর্মসূচির আগে নতুন প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব হতে পারে। আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাসে ২০২৭ সালে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৪ শতাংশে নামার আশঙ্কা করা হয়েছে। এর আগে সংস্থাটি ওই বছরের জন্য ৪ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল।
চীনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমালো আইএমএফ