টাইমস ২৪ ডটনেট: ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে গত ৫ সেপ্টেম্বর লংমার্চ করেছিল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এর ঠিক দুই সপ্তাহের মাথায় দ্বিতীয় দফায় ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে লংমার্চ পালন করেছে তারা। শনিবার রাজধানীর ঐতিহাসিক মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সকাল ৭টায় লংমার্চ পূর্ব বৃহৎ সমাবেশের মধ্যে দিয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এদিন পথে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধায় পাঁচটি পথসভা হয়েছে। সমাপনী সমাবেশটি রংপুর জিলা স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দেশের দুই ভিন্ন অঞ্চলে বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার মধ্য দিয়ে জোটটি জাতীয় দাবির পাশাপাশি আঞ্চলিক ইস্যুকেও নিজেদের আন্দোলনের কাঠামোয় যুক্ত ও জনসম্পৃপ্ততা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে রাজধানীর বাইরে ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে রাজনৈতিক উপস্থিতি ধরে রাখার পরিকল্পনাও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। গত ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চে ছয় দফা দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকটসহ জনদুর্ভোগ নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রশাসন ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ। তবে রংপুর লংমার্চের প্রস্তুতি ঘোষণার সময় আগের ছয় দফার সঙ্গে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধের দাবি যুক্ত করে তা সাত দফায় নেওয়া হয়। পরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি যুক্ত হওয়ায় ১৯ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে মোট আট দফা দাবি সামনে এসেছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে রংপুরের কর্মসূচিতে জাতীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবির পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের একটি দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক সমস্যাও গুরুত্ব পেয়েছে। তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনা, বন্যা, নদীভাঙন ও কৃষির সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি জড়িত।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ১১ দলের দাবিগুলো মেনে নেওয়া না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। তিনি বলেন, দফা মনে রাখবেন, এটা নয় দফাও হইতে পারে আবার জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময় এটা এক দফায় পরিণত হবে। এক দফায় যখন পরিণত হবে তখন কিন্তু পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে। গতকাল শনিবার ঢাকা থেকে রংপুর লং মার্চ কর্মসূচির প্রাক্কালে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে আয়োজিত লং মার্চ-পূর্ব সমাবেশে বক্তব্যকালে তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আল্লাহর মেহেরবানীতে চট্টগ্রামের লং মার্চ সফল হয়েছে। এতে অনেকের মাথা গরম হয়ে গিয়েছে। মাথা গরমের কিছু লক্ষণ গত দুইদিন ধরে রাজধানীতে আমরা দেখতে পাচ্ছি। তিনি বলেন, আমরা অনুরোধ করবো হতাশ হয়ে মাথা গরম করবেন না। বরঞ্চ জনতার দাবি মেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন। একইসঙ্গে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, আপনাদের বলি সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আগে সম্প্রতি অতীত থেকে শিক্ষা নিন। শিক্ষা নিয়ে জনগণের দাবি মেনে নিন। যদি দাবি মানতে ব্যর্থ হন তাহলে পরিষ্কার বলে দিচ্ছি কোনো চক্রান্তে কোনো কাজ হবে না। তিনি বলেন, কারণ আমরা কোনো দলীয় দাবি নিয়ে মাঠে নামিনি। আমরা ১৮ কোটি মানুষের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছি। আজকে ১৮ কোটি মানুষ ১১ দলের সঙ্গে আছে। তিনি বলেন, আমরা অনুরোধ করব, হতাশ হয়ে মাথা গরম করবেন না। বরঞ্চ জনতার দাবি মেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন। আজকে আট দফা, মনে রাখবেন, এটা নয় দফা হতে পারে, ১০ দফা হতে পারে। আবার জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময় এটা এক দফায় পরিণত হতে পারে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের দাবি আদায় করে আমরা ঘরে ফিরবো ইনশাআল্লাহ। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা সারা দেশে দেখতে পাচ্ছি—লং মার্চের পক্ষে যে ঐতিহাসিক গণজোয়ার শুরু হয়েছে, সেটাকে প্রতিরোধ করার জন্য গতকাল রাত থেকে আমাদের ব্যানার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। তবে ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলে লং মার্চের এই গণজোয়ার বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, ঢাকা টু চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক লং মার্চ সফল করার পরে আজকে আমরা শুরু করতে যাচ্ছি ঢাকা থেকে রংপুরের আমাদের সেই ঐতিহাসিক লং মার্চ। রংপুরের আজকের এই ঐতিহাসিক লং মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃত্বে, আট দফা দাবিতে। তিনি বলেন, সরকার গুম আইন পাস করেছে, মানবাধিকার আইন পাস করেছে, র্যাবের নাম বদলিয়ে এসআরবি করেছে এবং এই সরকারের যেখানে দায়িত্ব ছিল মানবাধিকারের সুরক্ষা দেওয়া, তারা মানবাধিকার হরণ করার সব ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি করছে। শেখ হাসিনার সরকার জনগণের অধিকার হরণ করতে যেসব আইন এবং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, বর্তমান সরকারও ঠিক একই আইন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করতে শুরু করছে। আমরা বলতে চাই, বিগত ১৬ বছর আমরা লড়াই করেছিলাম মানবাধিকারের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য। আপনারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি আরও বলেন, আমরা জানি, এরশাদও সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করেছিলেন। ফলে তারেক রহমানকে তার যাওয়ার রাস্তা নিজেকেই বাছাই করে নিতে হবে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, গুমের বিষয়ে যদি সমাধান সংসদে করতে পারতেন তাহলে আমাদের লং মার্চে যেতে হতো না। সরকার আমাদের লং মার্চে যেতে বাধ্য করেছে। সরকার আমাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, লড়াইটা অনেক আগে শুরু হয়েছে। এই লড়াইটা বাংলাতে শহীদ তিতুমিরের লড়াই, হাজী শরীয়তুল্লাহর লড়াই, বাংলাদেশে মওলানা ভাসানীর লড়াই, সেই লড়াইয়ের একজন অংশীজন হিসেবে আজকে আমরা এখানে লংমার্চের ঐতিহাসিক আমাদের যাত্রায় জাতীয় সংসদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সরকার আমাদের জিজ্ঞেস করছে কেন আমরা লং মার্চ করছি। এই বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সুস্পষ্টভাবে বাংলাদেশের কাছে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। সরকার যদি অন্ধ হয়ে যায় আমাদের ৮ দফা দাবি যদি পড়তে সক্ষম না হয় সরকারকে শিক্ষিত করতে প্রস্তুত আছি। তিনি বলেন, ওসমান হাদির বিচার, মানবাধিকার রক্ষা, গুমের কালো আইন, সাইবার সিকিউরিটি আইন, পুরাতন বোতলে যে নতুনভাবে ঢুকানো হয়েছে। এই এসআরবি বিলুপ্তকরণসহ বাংলাদেশের তিস্তাপাড়ার মানুষের দুঃখ গুছানোর জন্য বাংলাদেশের মানুষের আজাদীর জন্য যতদিন পর্যন্ত আমরা জীবিত থাকবো এই আজাদীর লড়াই চলবে। সেখানে তারেক রহমান আছেন না অন্য কোনো ফ্যাসিবাদীর দোসর আমাদের সামনে আছেন, আমাদের তোয়াক্কা করার প্রয়োজন নেই।
ঢাকা থেকে রংপুর লং মার্চ-পূর্ব সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্য
দাবি না মানলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে