টাইমস ২৪ ডটনেট: বিক্ষোভের নামে দেশজুড়ে সহিংসতা, লুটপাট ঠেকাতে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায়ও স্বীকার করেছেন তিনি। মঙ্গলবার ফ্রান্সের পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তব্যে লেকর্নু জানিয়েছেন, আগামী ২৪ অক্টোবর (শনিবার) থেকে রাজধানীসহ অন্যান্য শহরেরর দাঙ্গাপ্রবণ এলাকাগুলোতে ব্যাপক পরিসরে সেনা মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি পরিচালিত করা হবে বড় আকারের নিরাপত্তা অভিযান। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান তিনি আরও বলেন, ১৭ অক্টোবর প্যারিস, মার্সেই, লিওঁসহ অন্যান্য শহরে যে দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, তার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আনাই এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
পার্লামেন্ট অধিবেশনে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানান, পুলিশের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীকেও মোতায়েন করা হবে। এছাড়া, শহরের কেন্দ্রস্থলগুলো অরক্ষিত থাকার বিষয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার তাদের কৌশল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ফ্রান্সের চলমান বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিকে ‘সহিংসতা বনাম প্রজাতন্ত্র’-এর লড়াই হিসেবে অভিহিত করে লেকর্নু এই অস্থিরতার জন্য উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে, ওই গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং জনসেবার মান কমে যাওয়ার ফলে জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সরকার তা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি।
সাম্প্রতিক এই অস্থিরতা ফ্রান্সকে কার্যত হতবাক করে দিয়েছে—সেই ব্যাপকতা এবং তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের দৃশ্যমান ব্যর্থতা উভয়ই ছিল উদ্বেগজনক। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ঘটনা উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে যখন জনমত জরিপে উগ্র-ডান ও উগ্র-বামপন্থী প্রার্থীরা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন।
ইতালি ও আলবেনিয়াসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে যে, জীবনযাত্রার মান নিয়ে সৃষ্ট এই ক্ষোভ পুরো মহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যখন ফ্রান্সসহ অনেক দেশই বাজেট সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে।
ফ্রান্সের যেসব এলাকায় বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় কারফিউ জারি করা হয়। এর ফলে গত রাতে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল এবং সরকার জানিয়েছে, এর মাধ্যমে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই স্থানীয় কারফিউ—যার কিছু অংশ ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ওপর প্রযোজ্য—মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
পার্লামেন্টে নিজ বক্তব্যে লেকর্নু সপ্তাহান্তে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের সীমাবদ্ধতাগুলো স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল, পুলিশের মোতায়েন ছিল অত্যন্ত স্থবির, এবং পুলিশের পূর্বনির্ধারিত ছুটি বাতিল না করাটা ছিল কর্তৃপক্ষের একটি বড় ভুল।
পার্লামেন্ট অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ এসব ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেন, “যা ঘটেছে তার জন্য আমি গভীরভাবে দুঃখিত। আমি আমার দায়ভার স্বীকার করছি।”
এই অস্থিরতার কারণ অনুসন্ধানের জন্য পার্লামেন্ট একটি তদন্ত কমিশন গঠন করছে। পাশাপাশি, সড়কে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও খুঁজে বের করার জন্য কর্তৃপক্ষ ২০০ জন গোয়েন্দা নিয়োগ করেছে। মঙ্গলবার পুলিশ এমন একজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাকে লিমোজেস শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলে আগুন দেওয়ার ঘটনায় সন্দেহ করা হচ্ছে। দাঙ্গার সময় এই অগ্নিকাণ্ডে ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তি নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি তালিকায় ছিলেন এবং তিনি একটি উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠীর সদস্য। প্যারিসের ‘রেনেসাঁ’ (Renaissance) দলের আইনপ্রণেতা সিলভেইন মেইলিয়ার্ড রয়টার্সকে বলেছেন, কিছু মোবাইল অ্যাপ দাঙ্গাবাজ ও লুটপাটকারীদের জন্য যেন এক ধরনের ‘ওয়াকি-টকি’ ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এই সংকটের ব্যাপক প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মঙ্গলবার; বিনিয়োগকারীরা আরও অস্থিরতার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ায় ফ্রান্সের ঋণ গ্রহণের ব্যয় আরও বেড়েছে। এমনকি ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড (মুনাফার হার) গত ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সুপারমার্কেট চেইন ‘ক্যারেফোর’ জানিয়েছে, চুরি ও ভাঙচুরের কারণে তাদের কয়েক কোটি ইউরো ক্ষতি হয়েছে। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে তারা এক ‘অভূতপূর্ব পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হয়েছে বলেও সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র সংগঠন ‘ইউএনইএফ’ শনিবার আরও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, ম্যাক্রোঁ সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে, কারণ তাদের মতে, ফ্রান্সের শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে ভুগছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা লিখেছে, “আমরা আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।” এর বাইরে, ‘জিলে জোন’ বা ‘হলুদ ভেস্ট’ পরিচয়ধারী কিছু গোষ্ঠী জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। ‘হলুদ ভেস্ট’ আন্দোলনটি ২০১৮ সালে ম্যাক্রোঁর প্রথম মেয়াদে পেট্রোলের ওপর কর বাড়ানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি অনেকটা নিষ্ক্রিয় ছিল, তবে এখন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সে সময় মাসের পর মাস ধরে রাস্তা অবরোধের ঘটনা ঘটেছিল এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বেশ কিছু ব্যয়বহুল ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের সরকারের পক্ষে এ ধরনের ছাড় বহন করা কঠিন।
সূত্র : রয়টার্স।