বাংলাদেশ

জনতা ব্যাংকে জিয়া পরিষদের কমিটি নিয়ে বিতর্ক বহিষ্কৃত নেতাকে সভাপতি করার অভিযোগ, অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক পিএলসি.-ভিত্তিক জিয়া পরিষদের নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির অভ্যন্তরে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের যৌথ অনুমোদন ছাড়াই ১২১ সদস্যের কমিটি গঠনের অভিযোগের পাশাপাশি, বহিষ্কৃত একজন নেতাকে সভাপতি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন সংগঠনের একাধিক নেতা। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো স্বাধীন তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

সংগঠনের একটি কমিটির কপিতে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল জনতা ব্যাংক শাখার কমিটি অনুমোদনের তারিখ উল্লেখ রয়েছে। সেখানে সভাপতি হিসেবে সাইফুল আবেদীন সেলিমের নাম রয়েছে। কিন্তু সংগঠনের কয়েকজন নেতার দাবি, ওই সময় তিনি বহিষ্কৃত ছিলেন এবং তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয় একই বছরের ২৩ মে। ফলে বহিষ্কারাদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় কীভাবে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জিয়া পরিষদের এক নেতা বলেন, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের প্রায় দুই মাস আগেই একজনকে সভাপতি করা হলে পুরো অনুমোদন প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেয়।

সংশ্লিষ্ট নেতাদের দাবি, ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সাইফুল আবেদীন সেলিমকে সংগঠনের সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। সে সময় তার বিরুদ্ধে সংগঠনের তৎকালীন সভাপতি ড. আব্দুল কুদ্দুসসহ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তারে ভূমিকা রাখা এবং ময়মনসিংহে একটি কর্মসূচি ভণ্ডুলে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়। আরও অভিযোগ করা হয়, আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কিছু ব্যক্তির সহায়তায় ওই কর্মসূচি নস্যাৎ করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো নথি পাওয়া যায়নি।

কমিটি প্রকাশের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, গত ২৩ জুন কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে নতুন কমিটির খবর প্রকাশিত হলেও সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি যাদের কমিটির সদস্য হিসেবে দেখানো হয়েছে, তাঁদের অনেকেই বিষয়টি আগে জানতেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই কমিটির তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সংগঠনের গঠনতন্ত্র সম্পর্কে অবগত কয়েকজন নেতা জানান, নতুন কমিটি অনুমোদনের আগে স্থায়ী কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের যৌথ স্বাক্ষরে অনুমোদনের বিধান রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল্লাহিল মাসুদ এককভাবে কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন, যা গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এ ছাড়া কমিটি অনুমোদনের পেছনে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সাইফুল আবেদীন সেলিম ও হাফিজুর রহমানের অনুকূলে কমিটি অনুমোদনে এই অর্থ লেনদেন হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সাইফুল আবেদীন সেলিমের বিরুদ্ধে অতীতে বদলি, পদোন্নতি, ঋণের সুদ মওকুফ এবং বিমানবন্দর বুথকেন্দ্রিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন নেতা। যদিও এসব বিষয়ে কোনো আদালতের রায় বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

অন্যদিকে আব্দুল্লাহিল মাসুদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ব্যাংকভিত্তিক কমিটি গঠনের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তাকে সভাপতি করার আশ্বাস দিয়ে কয়েক দফায় সাত লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল্লাহিল মাসুদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে সাইফুল আবেদীন সেলিম বলেন, সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও নিয়ম মেনেই কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আগেই সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

ব্যাংকপাড়ার একাধিক জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তাদের মতে, কমিটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া, গঠনতন্ত্র অনুসরণ এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দ্রুত স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। এতে সংগঠনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকবে।

Related Articles

Back to top button