বাংলাদেশ

ইজতেমা ময়দানে ধর্মভিত্তিক বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে বিপিসি চেয়ারম্যান!

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাবেক স্বৈরাচার সরকারের আজ্ঞাবহ একজন আমলা কীভাবে খোলস বদলে এখনো রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতকে জিম্মি করে রেখেছে তার জলজ্যান্ত উদাহারণ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বর্তমান চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান। অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক (তদন্ত-১) থাকাকালীন যিনি ছিলেন দুর্নীতিবাজদের রক্ষাকর্তা, আজ তিনি দেশের জ্বালানি খাতকেও তুলে দিয়েছেন একচেটিয়া মাফিয়া সিন্ডিকেটের হাতে।

মুখে ধর্মীয় লেবাস আর অন্তরে উগ্র মতাদর্শ ধারণকারী এই রেজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতি থেকে শুরু করে ইজতেমা ময়দানে রক্তক্ষয়ী হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

ভারতে বিতর্কিত ও উগ্রপন্থী হিসেবে সমালোচিত দিল্লির মাওলানা সাদের অনুসারী বা “সাদপন্থীরা” বাংলাদেশে এক চরম নেতিবাচক ও ধিক্কৃত গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। বাংলদেশে থেকে তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করছেন বিপিসি চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান। এদিকে তার সাথে যুক্ত হয়েছে বর্তমান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। ধর্মীয় অঙ্গনকে কলঙ্কিত করা এবং রক্তক্ষয়ী সহিংসতার নেপথ্য কারিগর হিসেবে ওলামা-মাশায়েখ ও সাধারণ তৌহিদী জনতার কাছে এরা এক চরম আতঙ্কের নাম।

টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে ঘুমন্ত তাবলিগী সাথীদের ওপর অতর্কিত ও নৃশংস হামলা এবং হত্যাকাণ্ডে প্রধান পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে এখন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে মো. রেজানুর রহমানকে। ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে (১৯ ডিসেম্বর) ইজতেমা মাঠ দখলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর ফাঁসি দাবি করে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ দেয়ালে ওলামা-মাশায়েখ ও সর্বস্তরের তৌহিদী জনতার ব্যানারে তাঁর ছবি সংবলিত বিশাল পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। যেখানে স্পষ্টাক্ষরে লেখা রয়েছে, “গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ দিবাগত রাতে সাদপন্থী কর্তৃক টঙ্গী ময়দানে ঘুমন্ত তাবলীগের সাথীদের ওপর অতর্কিত হামলা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড রেজানুর রহমান এবং অন্যান্য দোষীদের ফাঁসি চাই!”

ধর্মীয়ভাবে চরম বিতর্কিত হওয়ার পাশাপাশি, বাংলাদেশে এই সাদপন্থী গোষ্ঠীকে ভারতের সরাসরি এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী ও নগ্ন দালাল হিসেবেও দেখা হয়। ভারতীয় আধিপত্যবাদের ওপর ভর করে দেশের ধর্মীয় ও কৌশলগত ক্ষেত্রে বিভেদ তৈরি এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে এরা দিল্লির প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নে লিপ্ত বলে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের নিয়ন্ত্রণ ও জোড় ইজতেমা আয়োজনকে কেন্দ্র করে তাবলিগ জামাতের মাওলানা জুবায়ের অনুসারী (শুরায়ে নেজাম) এবং দিল্লির মাওলানা সাদ অনুসারীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রশাসন ও জুবায়েরপন্থীদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সাদপন্থীরা মাঠ দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে ১৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ৩টার দিকে এক ভয়াবহ ও রক্তাক্ত সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘুমন্ত মুসল্লিদের ওপর চালানো এই হামলায় কিশোরগঞ্জের বাচ্চু মিয়া (৭০), ঢাকার বেলাল হোসেন (৫৫) এবং বগুড়ার তাজুল ইসলামসহ (৬৫) মোট ৩ জন মুসল্লি নিহত হন এবং শতাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন।

থানায় হত্যা মামলা ও চেয়ারম্যানের সম্পৃক্ততা
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জুবায়েরপন্থী শুরায়ে নেজামের সাথী এস এম আলম হোসেন বাদী হয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকশত জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার নথিপত্র ও স্থানীয় ওলামা-মাশায়েখদের অভিযোগ অনুযায়ী, এই হামলার পেছনে নীল নকশা তৈরিতে এবং হামলাকারীদের মদদ দিতে নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান।

ক্ষোভে ফুঁসছে ধর্মপ্রাণ মানুষ
পোস্টারে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাধারণ মুসল্লি ও ওলামারা বলছেন, একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে উসকানি দিয়ে পবিত্র ইজতেমা ময়দানকে রক্তরঞ্জিত করেছেন। তৌহিদী জনতার পক্ষ থেকে অবিলম্বে এই ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মূল পরিকল্পনাকারী রেজানুর রহমানসহ হামলায় জড়িত সকল আসামিকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির (ফাঁসি) আওতায় আনার জন্য সরকারের নিকট জোর দাবি জানানো হয়েছে। প্রশাসনিক ও দুর্নীতির নানাবিধ অভিযোগের পর এবার সরাসরি হত্যা মামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে নাম আসায় বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের পদত্যাগ এবং বিচার নিশ্চিতে চাপ আরও তীব্র হচ্ছে।

দেড় বছরেও অধরা ‘মাস্টারমাইন্ড’ বিপিসি চেয়ারম্যান ও মূল আসামিরা
টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে ঘুমন্ত তাবলিগী মুসল্লিদের ওপর বর্বরোচিত হামলা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলাটি এখন কার্যত হিমাগারে চলে গেছে। মামলার প্রধান অভিযুক্ত ও নেপথ্য ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে আলোচিত সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানসহ হেভিওয়েট আসামিরা এখনও বহাল তবিয়তে ধরাছোঁয়ার বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে শুরুর দিকে কিছু লোকদেখানো তৎপরতা চালানো হলেও বর্তমানে মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষোভ ও হতাশায় ফুঁসছেন নিহতদের পরিবার ও দেশের ওলামা-মাশায়েখ সমাজ।
মামলার বর্তমান অবস্থা: তদন্তে রহস্যজনক স্থবিরতা
২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর টঙ্গী পশ্চিম থানায় জুবায়েরপন্থী শুরায়ে নেজামের পক্ষ থেকে ২৯ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকশ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা রুজু করা হয় (মামলা নং-১৪)। ঘটনার পরপরই পুলিশ ৫ নম্বর আসামি মোয়াজ বিন নূরকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলেও, এরপর থেকে তদন্তের গতি রহস্যজনকভাবে থমকে যায়। দীর্ঘ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মামলার তদন্তকারী সংস্থা কোনো চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আদালতে দাখিল করতে পারেনি। মামলার বাদী পক্ষ ও স্থানীয় আলেমদের অভিযোগ, আমলাতান্ত্রিক প্রভাব এবং একটি বিশেষ মহলের অদৃশ্য ইশারায় মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যাতে মূল অপরাধীদের পার পাইয়ে দেওয়া যায়।

ধরাছোঁয়ার বাইরে ‘মাস্টারমাইন্ড’ ও প্রভাবশালী চক্র
ইজতেমা ময়দানে হামলার মূল নীল নকশাকারী এবং সাদপন্থীদের মাঠ দখলে নিতে প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার মূল কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি পুলিশ। কেবল রেজানুর রহমানই নন, তার সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন বর্তমান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম যার ফলে দেশের জ্বালানি ও ধর্মীয় উভয় খাতই এখন চরম সংকটের মুখে পড়েছে।

এদিকে, মামলার মূল সারির নামধারী প্রায় এক ডজনেরও বেশি প্রভাবশালী সাদপন্থী নেতা ও অর্থ জোগানদাতারা দিব্যি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আলেমদের অভিযোগ, শীর্ষ আমলাদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পর্দার আড়াল থেকে রেজানুর রহমানকে আইনি ঢাল প্রদান করছে।

তৌহিদী জনতার আলটিমেটাম ও তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার হুমকি
তদন্তের এই মন্থর গতি ও আসামিদের আড়াল করার চেষ্টার বিরুদ্ধে গাজীপুর ও ঢাকার ওলামা-মাশায়েখরা নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন। ওলামা নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, একজন সরকারি শীর্ষ কর্মকর্তা একটি ধর্মীয় ময়দান রক্তরঞ্জিত করার সুনির্দিষ্ট মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে স্বস্তিতে চেয়ারে বসে থাকেন?

তাবলীগ জামায়াত সংশ্লিষ্টদের দাবি, অবিলম্বে মামলার তদন্তভার কোনো নিরপেক্ষ ও দক্ষ সংস্থার (যেমন পিবিআই বা সিআইডি) হাতে ন্যস্ত করতে হবে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য পরিকল্পনাকারী মো. রেজানুর রহমানকে বিপিসির চেয়ারম্যান পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। সেই সাথে পলাতক ও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা সকল নামধারী আসামির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করতে হবে।

সচেতন মহল মনে করছেন, যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই স্পর্শকাতর হত্যা মামলার মূল আসামিদের আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে আগামী বিশ্ব ইজতেমার আগে দেশের ধর্মীয় অঙ্গনে আবারও বড় ধরনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।

Related Articles

Back to top button