বাংলাদেশ

কৃষকদের শত শত বিঘা কৃষি জমি দখল করেছে প্রবাসী পল্লী

# সরকারি খাস জমি ও অর্পিত সম্পত্তি জবর দখলসহ খাল-বিল, জলাশয় ভরাট করেছে
# ভাড়া জমিতে সাইনবোর্ড লাগিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার প্রবাসীর সাথে প্রতারণা
# মামলার রায়ের পরেও ঠেকানো যাচ্ছে না প্রবাসী পল্লীর অবৈধ প্রকল্পের কার্যক্রম
# প্রবাসী পল্লী গ্রুপে শেখ রেহানাসহ সাবেক এমপি মন্ত্রীদের পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ
# প্রধানমন্ত্রী, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন শত শত ভুক্তভোগী কৃষক

স্টাফ রিপোর্টার
ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে পরিচিত পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী গ্রুপ ভুয়া কাগজের মাধ্যমে শতশত কৃষকের কৃষি জমি দখল করার অভিযোগ উঠেছে। কেউ জমি দখল করতে বাধা দিলে তাকে মারধর, মিথ্যা মামলার ভয় ও বিভিন্নভাবে নাজেহাল করেছে। গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা নিয়ে নয়ছয় করার অভিযোগও রয়েছে। উক্ত প্রবাসী পল্লীর বিরুদ্ধে শত শত বিঘা সরকারি খাস জমি ও অর্পিত সম্পত্তি জবর দখলসহ খাল-বিল জলাশয় ভরাট করেছে। এ ব্যাপারে জলাধার ভরাট আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। মামলার রায়ে আদালত প্রকল্পটি স্থগিত রাখার নির্দেশ দিলেও তা মানছেনা ভুমি খেকো প্রবাসী পল্লী। বরং প্রকল্পটিকে ক্রমশ সম্প্রসারিত করা হচ্ছে চারিদিকে। ধ্বংস করা হচ্ছে কৃষকের কৃষি জমিসহ প্রাকৃতিক জলাধার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত ১৭ বছর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে সুসম্পর্কের জেরে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী গ্রুপ তাদের অবৈধ কর্মকান্ড-অব্যাহত রেখেছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার অন্যতম দোসর প্রবাসী পল্লী গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহিদুর রহমান মুহিদ। যার সাথে ছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের ঘনিষ্টতা। শেখ রেহানাকে ম্যানেজ করে তারই ভাই হাবিবুর রহমান হাবিবকে সিলেট-৩ আসনের বিনা ভোটের এমপি বানিয়ে ছিলো। মুহিদ ছিলো ২০২১ সালে তাঁতী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। শেখ রেহানার কয়েকজন ক্যাশিয়ারের অন্যতম একজন ছিলেন মুহিদুর রহমান মুহিদ। আবাসন ব্যবসার আড়ালে প্রবাসী পল্লী গ্রুপ ফ্যাসিস্টদের কালো টাকা নিরাপদে রাখার গোপন চুক্তিতে কাজ করছে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। নরসিংদী জেলার কান্দাইল মৌজায় স্থানীয় কৃষকদের জমি জোরপূর্বক দখল, বালু ভরাট এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেওয়ার অভিযোগও আছে। ভুক্তভোগীরা ন্যায় বিচারের আশায় রাজউক, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ একাধিক দপ্তরে আবেদন-নিবেদন করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না।
উল্টো প্রতিবাদকারীদের মিথ্যা মামলায় ফাসিয়ে নানাভাবে হয়রানি করছে পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী কর্তৃপক্ষ। হাইকোর্টের রিট পিটিশন নং ৬১২৯/২০১১) প্রদর্শন করে দাবি করা হচ্ছে, উক্ত মৌজায় তাদের এককভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমতি রয়েছে। অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সেখানে জমি ক্রয় করতে পারবে না। পরবর্তীতে, সংশ্লিষ্ট রিটের অপব্যবহার করে উকিল নোটিশ প্রেরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ব্যাপক হয়রানি করা হচ্ছে। যা উচ্চ আদালতের আদেশের অপব্যবহার এবং আদালতের অবমাননার শামিল বলে জানান ব্যারিস্টার আক্তার-উল-আলম। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি বিশেষের পক্ষে হাইকোর্টে রিট করার কোন সুযোগ নেই।
এদিকে বিগত ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সরকার পরিবর্তনের পর উক্ত ভুমি দস্যু চক্রটি কিছু সময় পলাতক থাকলেও ২০২৬ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তারা পুনরায় উক্ত প্রকল্প এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ কুচক্রী মহলটি বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সাথে আঁতাত করে পূর্বের অবৈধ সকল কার্যক্রম পূনরায় শুরু করেছে। ফলে নতুন করে শত শত কৃষকের জমি ফের জবর দখল করা হচ্ছে।
বিশেষ করে গত ২৮ জানুয়ারী মাধবদী থানায় দায়েরকৃত একটি মামলায় প্রশাসনকে প্রবাসী পল্লী লিমিটেডকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। যেখানে পুনরায় রিট পিটিশন নং ৬১২৯/২০১১ এর উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারী দায়েরকৃত ফৌজদারি কার্যবিধি ১৪৫ ধারার নোটিশ সংক্রান্ত তদন্তে প্রতীয়মান হয় যে, স্বল্প পরিমান জমি ক্রয়ের বিপরীতে ৫ থেকে ৬ হাজার প্লট বিক্রয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ০২/১০/২০২৪ করা দেওয়ানি মামলা নং: ১২১/২০২৪ বিজ্ঞ সদর সহকারী জজ আদালত, নরসিংদী, কান্দাইল মৌজায় মামলায় উল্লেখিত জমিতে কোন প্রকার কাজ করা যাবে না মর্মে রায় প্রদান করেন। কিন্তু প্রবাসী পল্লী কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞ আদালতের রায়কে উপেক্ষা করে জমিতে অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে পূর্বাচল প্রবাসী পল্লীর বিরুদ্ধে ৫ হাজার বিঘা ফসলি জমি বালু ফেলে ভরাট করার অভিযোগ আছে। এতে করে এক সময়ের সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলা অঞ্চলটি বর্তমানে মরুভুমিতে পরিনত হয়েছে।
মাধবদীর কান্দাইল গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা রতন মিয়া, মানিক ও সাইদুল ইসলাম বলেন, এখানে একসময় হাজার হাজার মণ ধান, গম, পাট, বাহারী পদের টাটকা শাক-সবজি, তরি-তরকারীর বিশাল সমাহার ছিল, আজ সেখানে শুধুই ধুধু বালুচর। এখন আর ফসল ফলেনা। এলাকার শত শত কৃষক পরিবার বেকার হয়ে পড়েছে। অর্ধাহারে-অনাহারে কাটছে অনেকের জীবন।
ক্ষতিগ্রস্ত সাইফুল ইসলাম বলেন, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ পরিবেশ অধিদপ্তর এই প্রকল্পে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেও থামাতে পারেনি প্রচন্ড প্রতাপশালী এই ভূমি দস্যু চক্রটিকে। উক্ত চক্রটি হাজার হাজার প্রবাসীদের নানাভাবে প্রলুব্দ করে তাদের কাছ থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ভূক্তভোগী হারুন মিয়া জানান, প্রবাসীরা শতকরা ৮০ ভাগ কিস্তির টাকা পরিশোধ করেও বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে কাঙ্খিত প্লটটি বুঝে পাওয়ার আশায়। অনেকে প্লট নামের সোনার হরিনের পিছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে মারাও গেছেন। কিন্তু প্লট জুটেনি হতভাগ্যদের কপালে। স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে জমি ভাড়ায় নিয়ে সাইন বোর্ড লাগিয়েও প্লট বানিজ্যের নামে প্রতারণা করছে পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা জানান, ফ্যাসিস্ট হাসিনার অন্যতম দোসর প্রবাসী পল্লী গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহিদুর রহমান মুহিদ। যার সাথে ছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের ঘনিষ্টতা। শেখ রেহানাকে ম্যানেজ করে তার ভাই হাবিবুর রহমান হাবিবকে সিলেট-৩ আসনের এমপি বানিয়ে ছিলেন। মুহিদ ছিলেন ২০২১ সালের তাঁতী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। শেখ রেহানার কয়েকজন ক্যাশিয়ারের অন্যতম একজন ছিলেন মুহিদুর রহমান মুহিদ। আবাসন ব্যবসার আড়ালে প্রবাসী পল্লী গ্রুপ ফ্যাসিস্টদের কালো টাকা নিরাপদে রাখার গোপন চুক্তিতে কাজ করছে বলে জানা গেছে। প্রবাসী পল্লী কার্যত ফ্যাসিসদের কালো টাকা বিনিয়োগের নিরাপদ একটি আবাসন প্রকল্পে পরিনত হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
অভিযোগ আছে, শেখ রেহানাসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন এমপি মন্ত্রির ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে প্রবাসী পল্লী গ্রুপে। খাল, বিল, নীচু জমি, জলাশয় ভরাট এবং ফসলি জমি সরকারি খাস জমি দখলের অভিযোগ আছে এই প্রবাসী পল্লী গ্রুপের বিরুদ্ধে। শেখ রেহানার ক্যাশিয়ার এবং ডামি এমপি হাবিবুর রহমান হাবিব ও তার কোম্পানির বিরুদ্ধে পাঁচ আগষ্ঠ পরবর্তী সময়ে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
প্রবাসী পল্লী লিমিটেড নামের এই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি গত প্রায় ১৭ বছর ধরে প্রবাসী পল্লী হাউজিং প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের নিকট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে আসছে।
প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন প্রলোভন ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি প্রদানের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। ভুক্তভোগীরা তাদের পৈত্রিক ভিটা মাটি ফেরত চেয়ে প্রধানমন্ত্রী, গনপূর্ত ও ভুমিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
পুর্বাচল প্রবাসী পল্লীর মহা-ব্যবস্থাপক মফিজুর রহমান মফিজ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা রাষ্ট্রের সকল নিয়ম-কানুন মেনেই হাউজিং প্রকল্পটি গড়ে তুলছি। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান জানান, সরকারি খাল, জলাশয় ও স্থানীয় কৃষকদের তিন ফসলী জমি অবৈধভাবে দখল ও বালু ভরাটের দায়ে প্রবাসী পল্লী আবাসিক প্রকল্পে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাসহ অর্থ দন্ড করা হয়েছে। জলাধার আইনে দায়ের করা হয়েছে একাধিক মামলাও।
এ বিষয়ে মুঠো ফোনে জানতে চাইলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, যাচাই বাছাই করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Related Articles

Back to top button