৩০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ নিয়েও প্রশ্ন , এর মুলহোত হিসাব রক্ষক শাহ আলম

সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পে ১৩২ কোটি টাকার বেশি অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ

সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পে ১৩২ কোটি টাকার বেশি অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ

টাইমস ২৪ ডটনেট: সিরাজগঞ্জের শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়কে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, ক্রয়প্রক্রিয়ায় বিধি লঙ্ঘন এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তরের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট নথিতে প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ডা. কৃষ্ণ কুমার পাল এবং মেসার্স বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মো. জাহের উদ্দিন সরকারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই  শাহ আলম সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পের একমাত্র হিসাব রক্ষক (একাউন্টেন্ট) স্টাফ হিসাবে কর্মরত থেকে টেন্ডার সংক্রান্ত সকল ডকুমেন্ট তৈরি করেন। বিল তৈরি, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় যে কোন চিঠিপত্র তৈরি সহ প্রকল্প পরিচালকের পক্ষে সকল কাজ তদারকি করতেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পের বিভিন্ন কোডের বাজেট এর কপি ও তার কাছেই থাকতো। অন্য কোন দুর্নীতিবাজের পক্ষে তাকে ম্যানেজ না করে সুচাতুরভাবে এত বড় বড় দুর্নীতি করা সম্ভব নয়। 
প্রকল্প পরিচালকের ভাষ্যমতে এই শাহ আলম বেঙ্গল সাইন্টিফিক কোম্পানির যোগ  সাজোষে প্রয়োজনীয় বিলের কাগজপত্র তৈরি করে অন্য সরকারি ডকুমেন্টস এর সাথে তাকে স্বাক্ষর করিয়া নেয়।
তিনি প্রকল্পের কাজ দ্রুত করার স্বার্থে সরল বিশ্বাসে বিভিন্ন কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেন। এরই মধ্যে ফার্ভেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, সিঙ্গাপুরকে একশত ৩২ কোটি টাকা পরিশোধ করেন। 
এছাড়া ভারী মেডিকেল যন্ত্রপাতির লট ( সিটি স্ক্যান এম আর আই) অন্যান্য যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করে গ্রীনটেক লিমিটেডকে অন্যায় ভাবে নির্মাণ খাতের টাকার কোড থেকে ৩০ কোটি টাকা পরিশোধ করেন। 
এ কাজ নিজে বিল তৈরি করে সিরাজগঞ্জ জেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাস না করিয়ে  প্রয়োজনীয় অনুমোদনের স্বাক্ষর কিছু বৈধ ও কিছু জাল পূর্বক তেজগাও হেলথ কমপ্লেক্স এর প্রধান সহকারী জনাব আনিসুজ্জামানকে দিয়ে মহা হিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয় এর স্বাস্থ্য অডিট শাখা থেকে পাস করিয়ে নেয়। এই অপরাধের কারণে পরবর্তীতে আনিসুজ্জামান দীর্ঘদিন জেল খাটেন।কথিত আছে তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে জেলখাটা থেকে রক্ষা পান। 
এছাড়া তিনি এই প্রকল্পের হিসাব রক্ষক থাকাকালীন সময়ে অসংখ্য দুর্নীতির জনক এই শাহ আলম। তিনি দুর্নীতির টাকা দিয়ে মিরপুরে একই বিল্ডিংয়ে তার দুইটি ২১৫০ স্কয়ার ফিট এর দুইটি ফ্লাটসহ ঢাকা শহরে ঢাকা শহরে বাড়ি করার উপযোগী জায়গা সহ অন্তত ১০ টি ফ্লাট রহিয়াছে। এবং নিজ গ্রামের বাড়িতে নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ গড়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।  শাহ আলম সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের তদবির বাণিজ্য ও অপকর্ম এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

ওইসব প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট অফিসার হিসেবে মোহাম্মদ শাহ আলম কর্মরত ছিলেন। ডা. কৃষ্ণ কুমার পাল ও মো. জাহের উদ্দিন তাদের বক্তব্য অনুযায়ি মোহাম্মদ শাহ আলম অ্যাকাউন্ট  হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং তাকে দিয়েই আমরা সবকিছু লেনদেন করেছি। তাদের অভিযোগে আরো জানা গেছে, মোহাম্মদ শাহ আলম নিজেকে বাঁচার জন্য দুদক কর্মকর্তার সাথে অর্থের বিনিময়ে নিজের নাম কে মামলার এজাহার থেকে বাদ দিয়ে আমাদেরকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে শাহ আলম। বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি করে ওই হাসপাতাল থেকে মোটা অংকের অর্থ বিনিময়ে তকদিরের মাধ্যমে দ্রুত বদলি হয়ে ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি হয়ে যান । সেখানেও শাহ আলমকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেনি। এরপর আরো মোটা অংকের অর্থ বিনিময়ে তদবির করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অতিরিক্ত একাউন্ট অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। ঢাকা মেডিকেলে যোগদানের পর থেকে তার পূর্বের অপকর্মগুলো শুরু করেছেন আবার। ডা. কৃষ্ণ কুমার পাল ও মো. জাহের উদ্দিনের অভিযোগে জানা যায়, আমরা যদি এই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হই তাহলে শাহ আলম কেন বাদ যাবে সেও তো একই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিল । তাই দুদককের চেয়ারম্যান, উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাছে আমাদের আবেদন আমাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অ্যাকাউন্ট অফিসার শাহ আলমের বিরুদ্ধে আগে ব্যবস্থা নেওয়া হোক । এটা আমাদের জোর দাবি।


নথিতে বলা হয়েছে, মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে হংকংভিত্তিক ফারভেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের অনুকূলে ১৩২ কোটি ৫০ লাখ ৪ হাজার ১৪৭ টাকা ৩০ পয়সা স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭০টি মেডিকেল আইটেমের কার্যাদেশমূল্য ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ ৪৩ হাজার ৬৪৬ টাকার বিপরীতে ৮০ শতাংশ হিসাবে ৩০ কোটি ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৯১৬ টাকা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কার্যাদেশের স্পেসিফিকেশন অনুসারে যন্ত্রপাতি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তবে এ বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির চূড়ান্ত সরবরাহ ও গ্রহণসংক্রান্ত নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রকল্পের ব্যয় ও ক্রয়পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন: অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পটি জুলাই ২০১৫ থেকে জুন ২০১৯ পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া হয়। প্রকল্পটির প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ৬৩৬ কোটি ৩৭ লাখ ৪৬ হাজার টাকা বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুমোদিত হয়। প্রাথমিক ডিপিপিতে মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ১৪৭ কোটি ৪৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি বা ওপেন টেন্ডারিং মেথড (ওটিএম) অনুসরণের কথা ছিল।

পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত একনেক সভায় সংশোধিত ডিপিপি (আরডিপিপি) অনুমোদন করা হয়। সংশোধিত প্রস্তাবে মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ২৪২ কোটি ৪১ লাখ ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয় এবং ক্রয়পদ্ধতি হিসেবে ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) উল্লেখ করা হয়।

নথিতে বলা হয়েছে, সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদনে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণের শর্ত ছিল। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ওই শর্ত এবং সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে যন্ত্রপাতি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে প্রশাসনিক অনুমোদন, সংশোধিত ডিপিপি, ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং কার্যাদেশের মূল কপি যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বিমান বাহিনী কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে কার্যাদেশ: নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী কল্যাণ ট্রাস্টের কাছে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য কোটেশন আহ্বান করা হয়। পরদিন নয়, বরং ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর ট্রাস্ট কোটেশন দাখিল করে এবং ৫ নভেম্বর বিভিন্ন প্যাকেজের বিপরীতে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) জারি করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

প্যাকেজগুলোর মধ্যে SHAMMAMCH-01, 02, 03, 04, 05, 06, 07, 08, 09, 10, 12, 13 ও 14-এর নাম পাওয়া যায়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেওয়া হলেও প্রকৃত সরবরাহকারী হিসেবে হংকংভিত্তিক ফারভেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের নাম ব্যবহৃত হয়। ওই প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা মেসার্স বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মো. জাহের উদ্দিন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট নথিতে দাবি করা হয়েছে।

নথিতে আরও বলা হয়েছে, ফারভেন্ট কোম্পানি লিমিটেড ২০১৫ সালের ২ জুন হংকংয়ে নিবন্ধিত একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান; এটি নিজে মেডিকেল যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নয় বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া যায়।

তবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী কল্যাণ ট্রাস্ট, বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানি এবং ফারভেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের মধ্যে চুক্তিগত সম্পর্ক, স্থানীয় এজেন্সি এবং প্রকৃত সরবরাহব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ্যে যাচাই করা প্রয়োজন।

১৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকার অর্থ স্থানান্তরের বিবরণ

অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট নথিতে ১৩২ কোটি ৫০ লাখ ৪ হাজার ১৪৭ টাকা ৩০ পয়সার বিপরীতে ২৭টি পৃথক ব্যয় মঞ্জুরিপত্রের উল্লেখ রয়েছে। এসব অর্থের বিপরীতে মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম আমদানির জন্য বিদেশি মুদ্রায় লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলার ব্যবস্থা করা হয় বলে নথিতে বলা হয়েছে।

এলসির সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের নাম: Fervent Company Limited, Hong Kong
ব্যাংকের নাম: Citibank Hongkong Limited
ব্যাংকের ঠিকানা: 2/F Wai Fung Plaza, 664 Nathan Road, Kowloon, Hong Kong
হিসাব নম্বর: 25039086749153
সুইফট কোড: CITIHKAX

নথি অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পরে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড ও জনতা ব্যাংক লিমিটেডের বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুকূলে এলসি খোলা হয়।

নথিতে ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে ২৭টি এলসি খোলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের গ্রিন রোড শাখা, লোকাল অফিস শাখা ও ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখা এবং জনতা ব্যাংক লিমিটেডের মডেল করপোরেট শাখার নাম রয়েছে।

তবে ১৩২ কোটি ৫০ লাখ ৪ হাজার ১৪৭ টাকা ৩০ পয়সার পুরো অর্থ চূড়ান্তভাবে কাকে, কখন এবং কী পরিমাণে পরিশোধ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি এলসির বিপরীতে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সুইফট বার্তা, বিল অব এন্ট্রি, আমদানি-সংক্রান্ত দলিল ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।

৭০টি মেডিকেল আইটেমের বিপরীতে ৩০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধের অভিযোগ: নথিতে বলা হয়েছে, ২৭টি এলসির মধ্যে ১৭টি এলসির আওতায় আংশিক মালামাল জাহাজীকরণের দলিল উপস্থাপন করা হয়। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭০টি মেডিকেল আইটেমের জাহাজীকরণ দলিলে প্রকল্প পরিচালকের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্যতা বা অ্যাকসেপ্টেন্স দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।

ওই ৭০টি আইটেমের কার্যাদেশমূল্য দেখানো হয়েছে ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ ৪৩ হাজার ৬৪৬ টাকা। কার্যাদেশের শর্ত অনুযায়ী জাহাজীকরণসংক্রান্ত দলিলে অ্যাকসেপ্টেন্সের পর ৮০ শতাংশ এবং স্থাপনের পর অবশিষ্ট ২০ শতাংশ পরিশোধের বিধান ছিল বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই হিসাবে ৮০ শতাংশ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ কোটি ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৯১৬ টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ মার্কিন ডলার ও ইউরোতে ফারভেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের হংকংয়ের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়।

নথিতে আরও বলা হয়েছে, পরবর্তীতে জাহাজীকরণ দলিলে উল্লেখ করা ৭০টি আইটেম কাস্টমস থেকে ছাড় করিয়ে কার্টনে প্যাক করা অবস্থায় সরবরাহ করা হলেও কার্যাদেশের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সেগুলো বুঝে নেয়নি।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পণ্য দেশে আমদানি ও কাস্টমস থেকে খালাস হয়ে থাকলে সেগুলোর প্রকৃত অবস্থা কী ছিল, কোথায় সংরক্ষণ করা হয়েছিল, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ কেন গ্রহণ করেনি এবং চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহের ঘাটতি কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আমদানি নথি, কাস্টমসের ছাড়পত্র, পরিদর্শন প্রতিবেদন, স্টক রেজিস্টার ও প্রকল্পের গ্রহণসংক্রান্ত দলিল যাচাই জরুরি।

ডলার ও ইউরোতে পরিশোধের তথ্য: অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট নথিতে ৭০টি আইটেমের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রায় কার্যাদেশমূল্যের হিসাবও উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ২৪ লাখ ৮২ হাজার ৫৯৯.৯৯ মার্কিন ডলার এবং ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৫১৪ ইউরোর অঙ্ক পাওয়া যায় বলে প্রতীয়মান হয়। তবে মূল নথির স্ক্যান ও ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে সংখ্যাগুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নথিতে এ দুই মুদ্রার বিপরীতে বাংলাদেশি টাকায় পৃথক মূল্যও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মুদ্রা রূপান্তরের অঙ্ক, মোট কার্যাদেশমূল্য এবং ৮০ শতাংশ পরিশোধের হিসাবের মধ্যে কিছু অসংগতি রয়েছে। ফলে মূল ব্যাংক দলিল যাচাই ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার অঙ্কগুলোকে চূড়ান্ত ও নির্ভুল হিসাব হিসেবে প্রকাশ করা সমীচীন হবে না।

কাস্টমস, শিপিং ও পরিবহন ব্যয় পরিশোধ: নথিতে বলা হয়েছে, আমদানি করা মেডিকেল যন্ত্রপাতির কাস্টমস ডিউটি, শিপিং বিল, স্থানীয় পরিবহন ব্যয় পরিশোধ এবং এলসি ইস্যুকারী ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগসহ বিভিন্ন কার্যক্রম মেসার্স বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানি সম্পাদন করে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস থেকে পণ্য ছাড় করানোর বিষয়ে এক্সট্রিম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. রফিকুল ইসলাম ভালুকদারের বক্তব্যও নথিতে রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আমদানি করা মেডিকেল যন্ত্রপাতির কাস্টমস ডিউটি ও শিপিং বিলের অর্থ বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানির মাধ্যমে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছিল।

নথিতে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের জিলানগর শাখার মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের পূর্ণাঙ্গ তথ্য, লেনদেনের তারিখ ও অর্থের পরিমাণ মূল দলিল ছাড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

এ ছাড়া বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের বক্তব্য অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট নথিতে উদ্ধৃত হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের দেওয়া অর্থ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কাছে পাঠিয়েছিলেন।

এই বক্তব্যগুলো অর্থের উৎস, স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ: অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট নথিতে দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

১. ডা. কৃষ্ণ কুমার পাল: বয়স আনুমানিক ৫৫ বছর। শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ রয়েছে। নথিতে তাঁর পিতা মৃত কালাচাঁদ পাল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

২. মো. জাহের উদ্দিন সরকার: বয়স আনুমানিক ৪৭ বছর। মেসার্স বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানির স্বত্বাধিকারী। নথিতে তাঁর পিতা মো. আবদুস সাত্তার সরকার বলে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বর্তমান ঠিকানা হিসেবে ফ্ল্যাট নম্বর ৫বি, বাড়ি নম্বর ২৫/১, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ উল্লেখ করা হয়েছে। স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে নন্দীগ্রাম, দিনাজপুর-সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে; তবে ঠিকানাটি মূল নথির সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পারস্পরিক যোগসাজশে ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে কাজ করেছেন। এগুলো অভিযোগ ও অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট বক্তব্য; আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

কোন আইনে মামলা করার সুপারিশ: অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট নথির শেষাংশে ডা. কৃষ্ণ কুমার পাল ও মো. জাহের উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪ ধারায় মামলা রুজুর অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অভিযোগের মূল বিষয় হলো, মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদনের শর্ত, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিবিধান এবং কার্যাদেশের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না; বিদেশি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো অর্থের বিপরীতে চুক্তি অনুযায়ী যন্ত্রপাতি সরবরাহ হয়েছিল কি না; এবং সরকারি অর্থের কোনো অংশ বেআইনিভাবে স্থানান্তর বা আত্মসাৎ করা হয়েছিল কি না।

তবে মামলা করার সুপারিশ, মামলা রুজু, তদন্ত এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণ—এগুলো পৃথক আইনি ধাপ। মূল নথি থেকে মামলার নম্বর, থানার নাম, এজাহার দায়েরের তারিখ ও পরবর্তী তদন্তের অবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না।

স্বচ্ছ তদন্ত ও সরকারি অর্থের হিসাব প্রকাশের দাবি: জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী কল্যাণ ট্রাস্ট, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হংকংয়ের সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা, এলসির বিপরীতে অর্থ ছাড়, আমদানি করা যন্ত্রপাতির অবস্থান এবং প্রকল্প কর্তৃপক্ষের গ্রহণসংক্রান্ত রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, তদন্তের বর্তমান অবস্থা এবং সরকারি অর্থের চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া গেলে তা পাঠকদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রামাণ্য নথি যাচাই-বাছাই করাই হবে জনস্বার্থে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মূল ভিত্তি।