topঅর্থনীতি

১৬.৬৮ শতাংশ বাড়ল বিদ্যুতের দাম

# বিদ্যুতের পাইকারি আগে প্রতি ইউনিট ছিলো ৭ টাকা
# পাইকারি বর্তমানে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৩৯ পয়সা
# বিদ্যুৎ পাইকারি বেড়েছে ১ টাকা ৩৯ পয়সা
# গ্রাহক পর্যায়ে আগে প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ১১ পয়সা ছিলো
# বর্তমানে দাম প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৬৩ পয়সা
# বিদ্যুতের দাম বেড়েছে প্রতি ইউনিট ১ টাকা ৫২ পয়সা
এনামুল হক: পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বিদ্যুতের দাম গ্রাহক পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। যেখানে প্রতি ইউনিটে ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাইকারি পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছে। আর সঞ্চালন চার্জ বাড়ানো হয়েছে ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
গতকাল বুধবার রাজধানীর রমনায় ইন্সটিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) ভবনের ষষ্ঠ তলায় কমিশনের শুনানি কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন এ মূল্য ঘোষণা করে বিইআরসি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে ১৯.৮৫ শতাংশ বেড়েছে এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধি করে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া খুচরো পর্যায়ের ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে গত ২০ ও ২১ মে দুই দিনব্যাপী গণশুনানি আয়োজন করে বিইআরসি। সেখানে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পিডিবি প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির আবেদন করেছিলো। বিইআরসির কারিগরি কমিটি সুপারিশ করেছে, বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিদ্যুতের দাম গড়ে প্রতি ইউনিট ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানো যেতে পারে। এর আগে সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী আদেশে পাইকারি বিদ্যুতের গড় দাম ইউনিট প্রতি ৬ টাকা ৭০ থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছিল।
এর আগে সবশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তখন পাইকারিতে ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছিল।
তবে বিদ্যুতের নতুন দাম নির্ধারণের ফলে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরাও বাড়তি বিলের চাপের মুখে পড়েছেন। ‘লাইফ লাইন’ বা প্রান্তিক গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, ফলে মাসে সর্বোচ্চ ৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী একজন গ্রাহককে প্রায় ৩৭ টাকা বেশি বিল পরিশোধ করতে হবে। লাইফ লাইন শ্রেণিতে শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা অন্তর্ভুক্ত। এরা মূলত নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষ— যাদের জন্য সরকার এতদিন ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছিল। নতুন মূল্যহার অনুযায়ী এই শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশে বর্তমানে লাইফ লাইন গ্রাহকের সংখ্যা ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৮০ জন। এর মধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর আওতায় রয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯১টি সংযোগ, যা মোট লাইফ লাইন গ্রাহকের বড় অংশ।
বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিল কেবল এনার্জি চার্জের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও মিটার ভাড়াও যুক্ত হয়। ফলে নতুন দামে কেবল ইউনিট মূল্য বৃদ্ধি নয়, মোট বিলেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, অধিকাংশ গ্রাহককে আগের তুলনায় প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ বেশি বিল পরিশোধ করতে হতে পারে।
ফলে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের ওপরও নতুন করে আর্থিক চাপ তৈরি হলো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যেসব পরিবার সীমিত আয়ের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় সামাল দেয়, তাদের জন্য বাড়তি বিদ্যুৎ বিল নতুন উদ্বেগ হয়ে দেখা দিলো— যা আবার চলতি জুন থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ভর্তুকির চাপ কমানো এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়েছে। এ কারণে সব শ্রেণির গ্রাহকের মধ্যে লাইফ লাইন গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে কম, প্রায় ১৫ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো হয়েছে। নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের কথা বিবেচনায় নিয়েই এই শ্রেণিতে সীমিত হারে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব পেলেও কমিশন সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমাতে দক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বেশি বিদ্যুৎ গ্রহণ এবং অদক্ষ কেন্দ্রের ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। উৎপাদন ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে বাড়ছে। তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট কমানোর সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহারে সক্ষমতা, উৎপাদন দক্ষতা ও ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণও কমে আসতে পারে।

Related Articles

Back to top button