topবাংলাদেশ

নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে নগরবাসী

ঈদযাত্রায় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি

টাইমস ২৪ ডটনেট: পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছে ঘরমুখো মানুষ। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে। তবে ঈদ সামনে রেখে সড়ক, রেল ও নৌপথে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রথমদিনে কমলাপুরসহ সর্বত্রই যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। এদিন ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীতে বিআরটিসির ‘ঈদ স্পেশাল সার্ভিস’ চালু হয়েছে। এদিন সদরঘাট থেকেও নির্ধারিত সময়ে দেশের বিভিন্ন রুটে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। ভোর ৬টায় ঢাকা থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রেলযাত্রা শুরু হয়। এরপর একে একে আরও বেশ কয়েকটি ট্রেন বিভিন্ন জেলায় যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছেড়ে গেছে। প্রত্যেকটি ট্রেন ছেড়ে যেতে সর্বনিম্ন ১৫ মিনিট থেকে ৩০ মিনিট বা তার বেশি সময় দেরি হচ্ছে। তবে যানজটের কারণে কোনো কোনো পরিবহনের বাস দেরিতে পৌঁছায় রাজধানীর গাবতলী ও সায়দাবাদ টার্মিনালে,তাই দেরি করে ছেড়ে যায় গন্তব্যে। গতকাল শনিবার সরেজমিন যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে ভোর থেকেই স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ভিড় বেশি ছিল যাত্রীদের। এদিন ভোর হতেই কমলাপুর রেলস্টেশনে লক্ষ করা গেছে যাত্রীদের ভিড়। কারণ ঈদের ছুটি শুরু, যেতে হবে আপনজনের কাছে। কাঙ্খিত ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে ছুটছেন যাত্রীরা। তীব্র গরমে কাঁধে ব্যাগ, সন্তানসহ ঘরমুখো যাত্রীরা ট্রেনে উঠতে ব্যস্ততা। তবুও শিশুদের চোখেমুখে আনন্দ। বাড়ির পথে রওনা দিয়ে বড়দের মনেও স্বস্তি। যাত্রীরা জানান, শেষ মুহূর্তের ভোগান্তি এড়াতে আগেভাগেই বাড়ির দিকে রওনা হয়েছেন তারা। তাদের অভিযোগ, অনলাইনে টিকিট পেতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, অনলাইনে টিকিট প্রাপ্তিতে বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের। এদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রেলস্টেশনে কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম ঘুরে যাত্রীদের সমস্যার কথা শুনেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেন। এ সময় তিনি যাত্রীদের কাছে জানতে চান অনলাইনে টিকিট কাটতে কোনো সমস্যা হয় কিনা। জবাবে যাত্রীরা জানান, এখন পর্যন্ত খুব বেশি চাপ না থাকায় তাদের টিকিটে নির্ধারিত সিট পেতে সমস্যা হচ্ছে না।
কমলাপুর স্টেশন এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। পুলিশের পাশাপাশি আরএনবি, র‌্যাব ও আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। টিকিট ছাড়া কাউকে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে না দেওয়ার বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ ট্রেন পরিচালনা ও অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে। কথা হয় ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. আনোয়ার হোসেন এর সঙ্গে। তিনি বলেন, যাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে রেল কর্তৃপক্ষ সচেষ্ট রয়েছে। স্টেশনে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বে রয়েছেন। আশা করছি এবার সুন্দর ঈদযাত্রা উপভোগ করবে সবাই।
ঈদুল আজহা ঘিরে রাজধানীর সায়েদাবাদ-কল্যাণপুর ও গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে ঘরমুখো মানুষের চাপ। ছুটির আগের শেষ কর্মদিবস ঘনিয়ে আসায় যাত্রীদের উপস্থিতিও বাড়ছে। কাল সোমবার শেষ কর্মদিবস হওয়ায় আজ রোববার বিকেলের পর থেকে এই ভিড় আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গতকাল রাজধানীর শনিবার রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাসস্ট্যান্ড ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া যায়। এদিন প্রতিটি বাস কাউন্টারের সামনে যাত্রীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষনীয়। কেউ কাউন্টারের ভেতরে বসে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন, কেউবা বাইরে বসে অপেক্ষা করছেন। আবার কেউ পাশের দোকানে দাঁড়িয়ে চা পান করছেন। অন্যদিকে কাউন্টারগুলোতে যাত্রী থাকলেও কেউ টিকিটের জন্য আসেননি। সবাই নিজেদের নির্ধারিত সময়ের বাস আসার অপেক্ষায় আছেন। শ্যামলী এনআর পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার কিশোর কুমার বলেন, বর্তমানে যাত্রীদের চাপ আছে। তবে পুরোপুরি চাপ এখনো শুরু হয়নি। রোববার অফিস শেষে আরও বাড়বে। একপ্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যানজটের আশঙ্কা তো আছেই। গরুর হাটের কারণে তীব্র যানজট হতে পারে শেষের দুই-একদিন। এসআর পরিবহনের টিকিট মাস্টার জানান, গত দুই দিনের তুলনায় যাত্রীর উপস্থিতি একটু বেশি। কাল-পরশু থেকে আরও বাড়বে। স্ত্রী ও সন্তানদের গ্রামে পাঠানোর জন্য কাউন্টারে এসেছেন রহিম আলী। তিনি বলেন, আমি সোমবার বাড়ি যাব। কিন্তু ছুটি শুরু হলে রাস্তায় যানজট হবে, তা আমি সহ্য করতে পারলেও আমার ৪ বছরের বাচ্চা সহ্য করতে পারবে না। এজন্য তাদের আগে থেকেই পাঠিয়ে দিচ্ছি। নাটোরে যাওয়ার জন্য কল্যাণপুরে অপেক্ষায় আছেন হাবিব। রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা হাবিব বলেন, আমার ক্লাস বন্ধ। কেনাকাটাও শেষ। তাহলে ঢাকায় থেকে তো কোনো লাভ নেই। এজন্য আগেই চলে যাচ্ছি। এছাড়া যানজটের মধ্যে পড়ারও একটা আশঙ্কা আছে। তবে সড়ক পথে যাত্রীদের হাসি থাকলেও অস্বস্তি পরিণত হচ্ছে ভয়াবহ আতঙ্কে। নির্বিচারে ওভারটেকিং, বেপরোয়া গতি, এবং অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ঘরমুখো মানুষের আনন্দ যেন মুহূর্তেই বিষাদে রূপ নেয়। তবে সড়ক পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বাস টার্মিনালে বিআরটিএ কর্মকর্তাদের তৎপরতা দেখা গেছে। এ দিন ভিজিলেন্স টিম টিকিট কাউন্টারে গিয়ে রুট অনুযায়ী নির্ধারিত ভাড়ার স্টিকার ঝুলিয়ে দেয়। ভ্যাপসা গরম, যানজট ও ভাড়া নিয়ে অভিযোগ থাকলেও হাসিমুখে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করতে যাচ্ছেন নগরবাসী। ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি কমাতে শনিবার সকাল থেকে বিআরটিসির ‘ঈদ স্পেশাল সার্ভিস’ চালু হয়েছে।
ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে সড়কপথে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে আগামী ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত মহাসড়কে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। তবে পশুবাহী যানবাহন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য,পচনশীল দ্রব্য, তৈরি পোশাক, ওষুধ, সার ও জ্বালানি বহনকারী যানবাহন এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে কোনো যানবাহন পার্কিং না করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে সমিতি থেকে। পাশাপাশি পণ্য ও পশুবাহী যানবাহনে, বিশেষ করে ফিরতি পথে, যাত্রী পরিবহন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ঈদ সামনে রেখে দেশের সাতটি প্রধান মহাসড়কে যানজটপ্রবণ ৯৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এসব এলাকায় ঈদের আগে ও পরে নিবিড় মনিটরিং করা হবে। তবে হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি ২৫টি করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২১টি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে ৮টি, ঢাকা-আরিচায় ৭টি, ঢাকা-ময়মনসিংহে ৭টি এবং ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে একটি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে আগাম পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের নৌপথে ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে। নৌ-নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবা নিশ্চিতে সদরঘাটসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরগুলোতে বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদুল আজহা সামনে রেখে নৌপথে যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ নির্দেশনা ও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। নিরাপত্তা জোরদারে চলন্ত বা নোঙর করা লঞ্চে ট্রলার বা নৌকা থেকে সরাসরি যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে মন্ত্রণালয়। শুধু বিআইডব্লিউটিএ নির্ধারিত টার্মিনাল পন্টুন ব্যবহার করেই যাত্রী ওঠানামা করা যাবে। সদরঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাটে সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়ম ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট লঞ্চের যাত্রা বাতিল ও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

Related Articles

Back to top button