অর্থনীতি

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার ফরিদপুরের আলাউদ্দিন গ্রুপ

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: ভয়াবহ ক্ষতির মুখে ফরিদপুরের আবাসন, নির্মাণ ও শিল্প খাতের অন্যতম পরিচিত নাম ‘আলাউদ্দিন গ্রুপ’। বিগত সরকারের প্রভাবশালী ও দুর্নীতিবাজ নেতাদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং তৎকালীন প্রশাসনের দমন-পীড়নের শিকার হয়ে পঙ্গু হতে বসেছে গ্রুপটির অঙ্গ প্রতিষ্ঠানসমূহ। দীর্ঘ পাঁচ বছর ব্যবসা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা, একের পর এক মিথ্যা মামলা আর এখন ব্যাংকের একতরফা ও অনৈতিক শর্তের বেড়াজালে পড়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে এই শিল্পগোষ্ঠী।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি-এর নিয়মিত ঋণগ্রহীতা মো. সিদ্দিকুর রহমান সম্প্রতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর এক আবেদনে এই করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। আবেদনে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার ০৭ অনুযায়ী ২ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বৎসরের ঋণ পুনঃতফসিল করন, প্রতিষ্ঠনের কার্যক্রম পুনরায় সচল করা, আর্থিক কাঠামো পুনগঠন করা এবং উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি, নতুন ঋণ সুবিধা প্রদান, পূর্বের আরোপিত/অনারোপিত সকল সুদ মওকুফ, তহবিলের খচর-এর ভিত্তিতে সদহার নির্ধারন, পুন:মূল্যায়নের ভিত্তিতে মাসিক কিস্তি নির্ধারন এবং প্রতিষ্ঠানগুলো সচল করতে নীতি সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০১৯ সালের করোনা মহামারীর ধাক্কার পরপরই ২০২০ সাল থেকে ফরিদপুর আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী মহলের কুনজরে পড়েন আলাউদ্দিন গ্রুপের কর্ণধার ঋণগ্রহীতা মো. সিদ্দিকুর রহমান। তাকে আর্থসামাজিক ও ব্যবসায়িকভাবে নির্মূল করতে তৎকালীন পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে দায়ের করা হয় ২২টি মিথ্যা ও হয়রানীমূলক মামলা। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হুমকির মুখে প্রায় পাঁচ বছর এলাকাছাড়া থাকায় আলাউদ্দিন ট্রেডিং কোং লিঃ, আলাউদ্দিন অটো ব্রিকস লিঃ এবং শ্রাবণী কনস্ট্রাকশন লিঃ-এর ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
আবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে ব্যাংকটি একবার ঋণ পুনঃতফসিল করলেও কার্যকরী মূলধনের অভাবে ব্যবসা সচল করা সম্ভব হয়নি। এলসি, এলটিআর কিংবা ওডির মতো জরুরি সুবিধাগুলো ব্যাংক বন্ধ করে রাখায় উৎপাদন ও আমদানি কার্যক্রম থমকে আছে। বারবার আবেদনের পরও ব্যাংক থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। এমনকি গত আগস্ট মাসে ১ কোটি টাকা জমা দেওয়ার পরও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ এক মিটিংয়ে আলোচনার আমন্ত্রন জানিয়ে কোন আলোচনা ছাড়া একতরফা কতিপয় শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, মহামান্য সুপ্রীমকোর্টের হাইকোট ডিভিশনের রীট পিটিশন নং-৩৪৫/২০২৬, তারিখ: ১২/০১/২০২৬ আদেশ এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র: বিআরপিডি- ১/সিআরএস/৯০২(৪)/২০২৬-১০১২ তারিখ: ০৯/০২/২০২৬ আনুযায়ী বিষয়াদি নিস্পত্তিকরনসহ আলোচ্য রীট পিটিশনটির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য পরামশ প্রদান করা হয়। কিন্তু ব্যাংক কতৃক বিষয়টি নিস্পত্তির ব্যাপারে কোন উদ্যোগ গ্রহন করা হয় নাই। উক্ত বিষয়ের সমাধান করার ব্যাপারে গ্রাহকের সাথে অদ্যবধি কোন প্রকার আলোচনা বা যোগাযোগ করা হয় নাই।
আলাউদ্দিন গ্রুপের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, পূর্বে মওকুফকৃত প্রায় ৭.০৫ (সাত দশমিক শূন্য পাঁচ) কোটি টাকার সুদ পুনরায় বহাল করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, যা তাদের মতে সম্পূর্ণরূপে অনৈতিক এবং গ্রাহকের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টির সামিল।
অপরদিকে, প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, ব্যাংকের নিকট জামানত হিসেবে দাখিলকৃত সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য পূর্ববর্তী মূল্যায়নের তুলনায় প্রায় চার (৪) গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ঋণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করার কথা নির্দেশ করে। এছাড়া, প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ঋণ পুনর্গঠনের স্বার্থে নতুন করে প্রকল্প মূল্যায়ন এবং একজন অভিজ্ঞ প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) নিয়োগের প্রস্তাব প্রদান করা হলেও, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা না করে এড়িয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। উপরোক্ত বিষয়সমূহ দ্রুত ও ন্যায়সংগতভাবে পর্যালোচনা করা হলে একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য সমাধান উদ্ভাবন সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়।
ব্যবসায়ী মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান যে, যথাযথ বিনিয়োগ ও প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সহায়তা প্রাপ্ত হলে আলাউদ্দিন গ্রুপের বিভিন্ন খাত থেকে উল্লেখযোগ্য আয় অর্জন সম্ভব। তার মতে, অটো ব্রিকস খাত থেকে মাসিক প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা, রেডিমিক্স ও কনস্ট্রাকশন সেক্টর থেকে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা এবং পাথর ব্যবসা থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা আয় করা যেতে পারে। এছাড়া, তাদের নতুন উদ্যোগ ‘আলাউদ্দিন অক্সিজেন প্ল্যান্ট’ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের চিকিৎসা ও শিল্প খাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। বিশেষ করে লিকুইড অক্সিজেন উৎপাদন ব্যবস্থা এবং অন-গ্রিড সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করা গেলে তা শুধু প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতাই বৃদ্ধি করবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। সর্বোপরি, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে আলাউদ্দিন গ্রুপ একটি টেকসই, লাভজনক এবং কর্মসংস্থানমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।
আলাউদ্দিন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মো. সিদ্দিকুর রহমান প্রতিবেদককে জানান, আমরা ব্যাংকের নিকট দায়বদ্ধতা স্বীকার করে ঋণ পরিশোধে সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে দুঃখজনকভাবে, যদি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আলোচনার পথ রুদ্ধ করে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় এবং চলমান মামলা সংক্রান্ত হয়রানি থেকে আমাদের মুক্তি প্রদান না করে, তাহলে আমাদের প্রতিষ্ঠিত শিল্পসমূহ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধ্বংসের মুখে পড়বে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাসঙ্গিক সার্কুলার-০৭ অনুযায়ী ১০ (দশ) বছরের পুনঃতফসিল সুবিধা, ন্যূনতম ২ (দুই) বছর গ্রেস পিরিয়ড এবং ব্যবসা সচল রাখার জন্য একটি সহনীয় ও কার্যকর পরিবেশ প্রত্যাশা করছি, যাতে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট সকলের জীবিকা রক্ষা পায়।
এ বিষয়ে ইউসিবি, পিএলসি-এর ফরিদপুরের সংশ্লিষ্ট অফিসের শাখা ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আলাউদ্দিন গ্রুপ নিয়ম মেনে কিস্তি জমা করেননি। উনার কিস্তি আসে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। উনি জমা করেছেন ১ কোটি টাকা। তাছাড়া আবেদনকারীর আগে একবার পুনঃতফসিল করা হয়েছে। উল্লেখ্য তিনি ঋণ পুনঃতফসিল ও নীতি সহায়তার আবেদন জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার অনুযায়ী ১% টাকা জমা দিয়াছে। এ বিষয়ে সঠিক তথ্য জানতে হলে আপনাদেরকে আমাদের হেড অফিসে কথা বলতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান মুঠোফোনে প্রতিবেদককে জানান, মূলত বিষয়টি ব্যাংক ও গ্রাহকের পারস্পরিক সম্পর্কের আওতাভুক্ত। উভয় পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতেই এ সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা। তবে উল্লেখ্য যে, তফসিলি ব্যাংকসমূহ বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারিকৃত সকল সার্কুলার ও নীতিমালা মেনে চলতে বাধ্য।এছাড়া, কোনো সেবাগ্রহীতা যদি ব্যাংকের কার্যক্রমে সংক্ষুব্ধ হন, তাহলে তিনি আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক উভয় উপায়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকট প্রতিকার প্রার্থনা করতে পারেন।
এদিকে দেশের সচেতন ব্যবসায়ী মহল গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, প্রতিহিংসার শিকার হয়ে একজন সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা আজ চরম সংকটের মুখে পতিত হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, উক্ত উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠানটির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত, যাদের জীবিকা সম্পূর্ণরূপে এই প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং শত শত পরিবারের জীবনে মারাত্মক অনিশ্চয়তা নেমে আসবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
অতএব, মানবিক বিবেচনা ও বৃহত্তর স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি অনুরোধ জানানো যাচ্ছে যে, বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে একটি সহানুভূতিশীল ও বাস্তবসম্মত সমাধান গ্রহণ করা হোক, যাতে উদ্যোক্তা, কর্মচারী এবং তাদের নির্ভরশীল পরিবারসমূহ অনিশ্চয়তার করালগ্রাস থেকে মুক্তি পেতে পারে।
আলাউদ্দিন গ্রুপের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান আশা প্রকাশ করেছেন যে, তার ঋনের পুনঃতফসিলের বিষয়ে হাইকোর্টের রায় কার্যকর করতে ও আমার বিরুদ্ধে করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করতে ইউসিবিএল কতৃপক্ষ অনতিবিলম্বে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করবেন।

Related Articles

Back to top button