এক ট্রাস্টি নিয়ে তুলকালাম
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি করাপশন মুক্ত করতে চান বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান

দীপক চৌধুরী : দেশের অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ‘নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি’তে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগ, পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা প্রদান; নারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ এবং যৌন হয়রানি বিষয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের এক সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ঘিরে দেশের অন্যতম এ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চাপা উত্তেজনা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
অভিযুক্ত ওই সদস্যকে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে প্রবেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এরপর ওই ঘটনার জের ধরে চেয়ারম্যানসহ অন্য সদস্যদের হুমকি-ধমকি দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিন তদন্তকালে এসব বিষয় জানা গেছে।
‘বোর্ড অব ট্রাস্টিজকে দ্রুততম সময়ে অভিযোগের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে ইউজিসি। বোর্ড সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিশ দিয়েছে’, বলে জানান বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ট্রাস্টি বোর্ডের যে সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তার নাম মোহাম্মদ শাহজাহান। একজন অভিভাবক বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) লিখিত অভিযোগ করেন যে চাকরি, পদোন্নতি ও আর্থিক সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং ভর্তি-বাণিজ্যে জড়িত থাকার মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছেন মোহাম্মদ শাহজাহান। অভিযোগ পাওয়ার পর ১৪ মে ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
উল্লেখিত নোটিশে শাহজাহানের বিরুদ্ধে কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগ, পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা প্রদান; নারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ এবং যৌন হয়রানি।
শাহজাহানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঃ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইউজিসির নির্দেশনার পর ১৮ মে জরুরি সভা করে ট্রাস্টি বোর্ড। সভায় মোহাম্মদ শাহজাহান ছাড়া বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সব সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোহাম্মদ শাহজাহানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে সাময়িকভাবে ক্যাম্পাসে প্রবেশ, সভায় অংশগ্রহণসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আগামী ৪ জুন বনানী ক্লাবে অনুষ্ঠেয় বোর্ডের পরবর্তী বৈঠকে তাকে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তিনি তার বক্তব্য জমা দিতে ব্যর্থ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টের ধারা অনুযায়ী, তাকে ট্রাস্ট ও ট্রাস্ট বোর্ড থেকে অপসারণসহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
নোটিশে যেসব অভিযোগ উল্লেখ করা হয় ঃ নোটিশে শাহজাহানের বিরুদ্ধে কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগ, পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা প্রদান নারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ এবং যৌন হয়রানি। এ ছাড়া আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ক্যাম্পাসের উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব খাটানো, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের মতো অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও সম্মানের চরম ক্ষতি সাধন করতে পারে বলে নোটিশে বলা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য শাহজাহানের বিরুদ্ধে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক নারী কর্মী এবং ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ার চেষ্টার বিষয়টি ক্যাম্পাসে সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। তার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী কর্মীর সঙ্গে ক্যাম্পাসে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। একাধিক নারী কর্মী ও ছাত্রীর সঙ্গে মুঠোফোনে মোহাম্মদ শাহজাহানের অনৈতিক বার্তা আদান- প্রদানের (চ্যাট) স্ক্রিনশট সরকারের বিভিন্ন সংস্থাসহ নানাজনের হাতে ঘুরছে। বিষয়টি নিয়ে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
মোহাম্মদ শাহজাহানের বিরুদ্ধে আনয়ন করা সকল অভিযোগ অস্বীকার কওে তিনি বলেন, এসব স্ক্রিনশট জোড়া দিয়ে ফটোস্ট্যাট করে তৈরি করা হয়েছে। কারিগরি কৌশলে স্ক্রিনশট দিয়ে বিভ্রান্ত করা যাবে না। এগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা হওয়া উচিত। মূলত যাতে আমাকে ফাঁসানো যায় এসব তৈরি করে এটাই মূলকথা। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই থেকে আমার ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার কথা। আমি যাতে চেয়ারম্যান হতে না পারি, সে জন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এসব করা হচ্ছে। মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, প্রতিটি বিষয়ের জবাব রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে আমাকে ফাঁসানোর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে না।
ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহান বিরুদ্ধে পুরান অভিযোগ ঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই নর্থ সাউথে অনিয়ম, স্বজনপ্রতি ও নারীঘটিত নানা অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শাহজাহান। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নথি জালিয়াতির ঘটনাও তার বিরুদ্ধে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি। ওই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পৃথক মামলা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি কেনায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের এক মামলায় অন্য ট্রাস্টিদের সঙ্গে মোহাম্মদ শাহজাহান কারাগারেও ছিলেন। সূত্রমতে, মামলার তথ্য অনুযায়ী, আগের সরকার আমলে (২০২০) নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান এম এনামুল হক, বুয়েটের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুর রউফ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) সাবেক কোষাধ্যক্ষ এম আবদুস সালাম আজাদের নাম প্রস্তাব করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সারসংক্ষেপ পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নথিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ওই পদের জন্য অধ্যাপক এনামুল হকের নামের পাশে টিক চিহ্ন দেন।
সূত্রমতে, পরে ফাতেমা বেগম নামের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন অফিস সহকারী একজন ছাত্রলীগ নেতার কাছে নথিটি তুলে দেন বলে সূত্র জানায়। জালিয়াতির মাধ্যমে এনামুল হকের নামের পাশে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া টিক চিহ্নটি ‘টেম্পারিং’ (কারসাজি) করে ক্রসচিহ্ন করে দেওয়া হয়। এম আবদুস সালাম আজাদের নামের পাশে টিক চিহ্ন বসিয়ে দেওয়া হয়। পরে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই নিয়োগের আদেশ বাতিল করে। অবশ্য অতীতের সকল অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেন মোহাম্মদ শাহজাহান। এসব অনিয়ম, দুর্নীতিসহ ইউজিসির সাম্প্রতিক চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। শাহজাহান মনে করেন, ইউজিসি এ ধরনের অভিযোগ গ্রহণ করতে পারে না এবং এ ধরনের নির্দেশনা দিতে পারে কি না এ প্রশ্ন করেন। তার মতে এধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ‘কমিশন (ইউজিসি) বলেছে তদন্ত করে নিষ্পত্তি করতে। কিন্তু তারা আমাকে ক্যাম্পাসে প্রবেশসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এটা শতভাগ বেআইনি এবং শত্রুতামূলক। এটা তারা কখনো পারে না। কাজটি যে পরিকল্পিত তা বোঝা যায় ।’
দেশের এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে নানারকম দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়ম চলেছে। ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে ঠাণ্ডা লড়াই চলেছে। নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ বিষয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য আবদুল হান্নান চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘এটা ট্রাস্টিদের ব্যাপার, তাদের বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না বা কিছু বলব না।’
বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার ঃ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের বর্তমান চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার বলেছেন, ইউজিসি বোর্ড অব ট্রাস্টিজকে অতি দ্রুত অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে। বোর্ড সবার সম্মতিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিশ দিয়েছে। খ্যাতনামা ও সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব আজিজ আল কায়সার বলেন, ‘ওনার বিরুদ্ধে তো আমরা কোনো অ্যাকশনে যাইনি। তিনি (শাহজাহান) চেয়ারম্যান হবেন কি না, সেটা তো পরের বিষয়। কেবল আমাদের নিয়ন্ত্রণ সংস্থার চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ওনাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি। এটা না করলে তো আমরা ( বোর্ড অব ট্রাস্টিজ) সমস্যায় পড়ব।’ চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার বলেন, ‘নোটিশে তার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলোর জবাব না দিয়ে উল্টাপাল্টা দায়িত্বহীন কথা বলে চলেছেন। তিনি(শাহজাহান) যদি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাহলে তো আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি করাপশন মুক্ত করতে চাই।’ একজন ট্রাস্টির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নিয়ে ইউজিসির পাঠানো চিঠির বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করা হয়। নর্থ সাউথের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার বলেন, ‘চিঠিতে বোর্ড অব ট্রাস্টিজকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভিযোগের তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে ইউজিসি। বোর্ড অব ট্রাস্টিজ সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিশ দিয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে কী; দুর্ভাগ্যজনক কথাটা হলো, নোটিশের পর থেকে তিনি (শাহজাহান) ফোনে, মেসেজে যাচ্ছেতাই হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।’ অপর আরেক প্রশ্নের জবাবে আজিজ আল কায়সার পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘এর বাইরে আমাদের আর কী করার ছিল বলুন তো?’
