বাংলাদেশ

৫০ হাজার পুলিশের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তদন্ত

কাওসার আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার: সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তদন্তে পুলিশের এই অর্ধলক্ষ সদস্যের নিয়োগপ্রক্রিয়া, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, এমনকি স্থায়ী ঠিকানার সত্যতাও যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার ও দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে সরকার।

এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, বিগত ১০ বছরের পুলিশের নিয়োগে বিভিন্ন পর্যায়ে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিষয়গুলো তদন্তে পাঠানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত ৫০ হাজার ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে এক জেলার প্রার্থীকে অন্য জেলার কোটায় নিয়োগ, রাজনৈতিক সুপারিশ থাকা তালিকা ব্যবহার এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের অজুহাতে মেধাবীদের বাদ দিয়ে দলীয় লোকজনকে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আলাদা কক্ষে পরীক্ষার ব্যবস্থা করাসহ বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্তে পুলিশ সদর দপ্তরকে আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, পুলিশ সদর দপ্তর জেলা পুলিশ সুপারদের (এসপি) প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রতিটি কমিটিতে অতিরিক পুলিশ সুপার (প্রশাসন), ডিআইও-১ এবং রিজার্ভ অফিস ইন্সপেক্টর সদস্য হিসেবে রয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা ৬৪ জেলায় পৌঁছানোর পর জেলা পুলিশ নিয়োগের তালিকা ধরে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। জেলা থেকে থানা পর্যায়ে পাঠানো এ-সংক্রান্ত চিঠিতে মূলত চারটি বিষয়ে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—নিয়োগপ্রাপ্ত ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবলরা ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি পেয়েছেন কি না, অন্য জেলার প্রার্থীকে জমি কেনার ভিত্তিতে স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে দেখানো হয়েছে কি না, কিংবা অর্থের বিনিময়ে বিশেষ কক্ষে পরীক্ষা নেওয়ার মতো অনিয়ম হয়েছে কি না। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অযোগ্য ঘোষণা বা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের সিরাজগঞ্জ জেলার এক উপপরিদর্শক (এসআই) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জেলা গোয়েন্দা শাখা থেকে চিঠি পাওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি কাজ শুরু করেছেন। ওই সময়ে তাঁর থানা এলাকার ৩০-৩৫ জন কনস্টেবল নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁদের বাড়িতে গিয়ে স্থায়ী ঠিকানা ও রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে কিছু সমস্যাও হচ্ছে। যেমন—নিয়োগ পরীক্ষায় অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
জেলা থেকে তদন্ত প্রতিবেদন আসতে শুরু করেছে। সব প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হবে। রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড ক্যারিয়ার প্ল্যানিং শাখা বিষয়টি দেখভাল করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে সারা দেশে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কনস্টেবল পদে ৫০ হাজারের বেশি সদস্য নিয়োগ পান। বাকিরা ছিলেন উপপরিদর্শক পদের।
বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার পুলিশ বাহিনীকে দলীয়করণ করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ধরপাকড়, গুম, নির্যাতন ও দমন-পীড়নে পুলিশকে ব্যবহার করতেই দলীয় লোকজনকে বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ তাদের।
বর্তমানে ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) কর্মরত বগুড়ার এক কনস্টেবল নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনিয়ম করে কেউ চাকরি নিলে তদন্ত হওয়া স্বাভাবিক। তবে যাঁরা নিয়ম মেনে চাকরি পেয়েছেন, তাঁরা যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটাও দেখতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের আমলে কনস্টেবলদের মতো উপপরিদর্শক নিয়োগেও জেলা কোটা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও কিশোরগঞ্জের প্রার্থীদের বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী কিংবা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সূত্রটি আরও বলছে, ২০১২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৩৩তম থেকে ৪০তম ব্যাচে অন্তত ১৫ হাজার উপপরিদর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দ্রুত মাঠে নামাতে উপপরিদর্শকদের দুই বছরের প্রশিক্ষণ এক বছরে নামিয়ে আনা হয়েছিল। এমনকি লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মৌখিক পরীক্ষার আগেই পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কনস্টেবল নিয়োগের বিষয়ে অভিযোগের তদন্ত শেষে সন্দেহজনকভাবে নিয়োগ পাওয়া উপপরিদর্শকদের বিষয়েও যাচাই-বাছাই করা হবে। বিশেষ করে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও কিশোরগঞ্জের নিয়োগপ্রাপ্তদের বিষয়ে যাচাইয়ে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, বিভিন্ন সময়েই টিআরসি নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ শোনা যায়। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েন, আবার কেউ সহজে পার হয়ে যান। নিয়োগপ্রক্রিয়াকে মানসম্মত ও স্বচ্ছ করা গেলে ভবিষ্যতে এমন তদন্তের প্রয়োজন পড়বে না। সব সরকারেরই উচিত অন্তত ছোট ছোট নিয়োগেও রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ চাপিয়ে না দেওয়া।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) হিসেবে নিয়োগ পাওয়া অন্তত ৫০ হাজার জনের বিষয়ে তদন্ত চলছে। পুলিশের গোয়েন্দারা তাঁদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তদন্ত করছেন। এসব নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ ও প্রশ্ন ওঠায় বাহিনীতে অভ্যন্তরীণ এই তদন্ত চলছে।

Related Articles

Back to top button