মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্ত শুরু: ফেঁসে যাচ্ছেন বিআইডব্লিউটিএ-র ‘আলাদিনের চেরাগ’ সালাম ও মাহে আলম

আলিমুজ্জামানঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অন্দরে জেঁকে বসা সেই বহুল আলোচিত দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালক (নৌ-পথ) মো. আব্দুস সালাম এবং তার অন্যতম সহযোগী টাইপিস্ট মো. মাহে আলমের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি লব্ধ উপার্জনে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সিন্ডিকেট ভিত্তিক দুর্নীতির তদন্তে আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দিয়েছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়।
৭ই জুন ২০২৬ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের টিএ শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশের মাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএ-র চেয়ারম্যানকে এই দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে (স্মারক নম্বর: ১৮.০০.০০০০.০০০.০১৯.৯৯.০০২৫.২৫.১২৯)। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ছন্দা পাল স্বাক্ষরিত এই চিঠি ইস্যুর পর সংস্থাটির দুর্নীতিবাজদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিযোগের পাহাড় ও মন্ত্রণালয়ের অ্যাকশন:
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ইংরেজি, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর বিআইডব্লিউটিএ-র এই দুই কর্মকর্তার ভয়াবহ দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট খতিয়ান তুলে ধরে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন একজন সচেতন নাগরিক। উক্ত অভিযোগ ও জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে আজ এই তদন্তের নির্দেশ দিল মন্ত্রণালয়।
অভিযোগের বিবরণী থেকে জানা যায়, সরকারের এলজিইডি, সওজ ও রেলওয়ের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান যখন বিভিন্ন ব্রিজের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নিতে আসে, তখন অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুস সালাম এবং টাইপিস্ট মাহে আলমের সমন্বয়ে গঠিত এই সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে ফাইল আটকে রাখত। নদীর ক্লাসিফিকেশন পরিবর্তনের ভয় দেখিয়ে বা ব্রিজের উচ্চতা জটিলতার অজুহাতে তারা বড় অংকের ঘুষ দাবি করত। তাদের অনৈতিক চাহিদা পূরণ না হলে দিনের পর দিন ঝুলিয়ে রাখা হতো সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ।
টাইপিস্টের হাতে আলাদিনের চেরাগ, আকাশপথে বিলাসিতা:
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাহে আলম সরকারের একজন সামান্য টাইপিস্ট হওয়া সত্ত্বেও তার বেতন মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। কিন্তু এই সামান্য বেতনেই তিনি ঢাকার অভিজাত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই দুই কর্মকর্তা যেন হাতে পেয়েছেন ‘আলাদিনের চেরাগ’।
শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সাইট পরিদর্শনের নামে আবেদনকারী বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের খরচে আকাশপথে ভ্রমণ, ফাইভ স্টার হোটেলে রাত্রিযাপন এবং রাজকীয় বিলাসিতা করা তাদের নিয়মে পরিণত হয়েছিল। অন্যদিকে, সরকারি দপ্তর থেকে ভুয়া টিএ/ডিএ (ভ্রমণ ও দৈনিক ভাতা) বিল উত্তোলন করে ডাবল পকেটে সরকারি কোষাগার লুট করার অকাট্য প্রমাণও মিলেছে তাদের বিরুদ্ধে, যা স্পষ্টত চাকুরীর বিধিমালা পরিপন্থী এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
মহাপতনের পর ও বহাল তবিয়তে:
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এই সিন্ডিকেটটি চরম প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বিআইডব্লিউটিএ-র অনেক রাঘববোয়াল ওএসডি বা বদলি হলেও, রহস্যজনকভাবে এই সালাম-আলম চক্র এতকাল বহাল তবিয়তে ছিল। কোনো কারিগরি জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও টাইপিস্ট মাহে আলম নীতিনির্ধারণী সভায় উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দাবি এখন একটাই – দ্রুত দৃশ্যমান শাস্তি:
মন্ত্রণালয়ের এই তদন্তের নির্দেশ আসায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বিআইডব্লিউটিএ-র সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ভুক্তভোগী ঠিকাদারেরা। তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন, এই তদন্ত কি শুধুই লোকদেখানো আইওয়াশ, নাকি দুর্নীতির মূলোৎপাটনে কঠোর ব্যবস্থা?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মহিউদ্দিন জানান, “কোনো দুর্নীতিবাজকে ছাড় দেওয়া হবে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জনগণ আশা করছে, তদন্ত কমিটি কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করে এই দুই দুর্নীতিবাজের অবৈধ সম্পদের উৎস ও সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়ে ফেলে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে।



