বাংলাদেশ

বিআইডব্লিউটিএ’র তদন্তে নজিরবিহীন কারসাজি: সাবেক চেয়ারম্যানের ভগ্নিপতিকে বাঁচাতে বলির পাঁঠা দুই সৎ কর্মকর্তা!

টাইমস ২৪ ডটনেট : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-র একটি তদন্ত প্রতিবেদন ঘিরে নজিরবিহীন জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান কমোডর আরিফ আহমেদ মোস্তফার প্রভাব খাটিয়ে তার আপন ভগ্নিপতিসহ প্রভাবশালী ঠিকাদার চক্রকে পার পাইয়ে দিতে একই তারিখে একই তদন্ত কমিটির দুটি ভিন্ন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশ পালন করতে গিয়ে ফেঁসে গেছেন দুই নিরীহ ও সৎ কর্মকর্তা—অতিরিক্ত পরিচালক (মেরিন) জনাব মোঃ আব্দুর রহিম এবং উপ-পরিচালক জনাব মোঃ ওবায়দুল করিম খান। মূল অপরাধী ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও, চেয়ারম্যানের ভগ্নিপতিকে বাঁচাতে তদন্ত প্রতিবেদন বদলে দিয়ে উল্টো এই দুই কর্মকর্তার ওপর শাস্তির খড়্গ নামিয়ে আনা হয়েছে, যা নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ-র সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
পর্দার আড়ালে ঠিকাদারদের বিরোধ ও উর্ধ্বতনদের নির্দেশঃ
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগে জ্বালানী তেল সরবরাহকারী দুই ঠিকাদার—সদ্য সাবেক চেয়ারম্যানের ভগ্নিপতি ও ‘রিলায়েবল সিএনজি এন্ড ফিলিংস লিমিটেড’ এর স্বত্ত্বাধিকারী মোঃ আবু ইউসুফ বীনা এবং ‘এম/এস পটুয়াখালী এজেন্সী’র স্বত্ত্বাধিকারী মুশফিকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিরোধ চলছিল। নৌ-পথে উদ্ধার কার্যক্রমের মতো স্পর্শকাতর ও রাষ্ট্রীয় জরুরি সেবা যেন এই ঠিকাদারদের বিরোধের কারণে ব্যাহত না হয়, সেই স্বার্থে বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক (নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন) তার দুই অধস্তন কর্মকর্তা জনাব মোঃ আব্দুর রহিম এবং জনাব মোঃ ওবায়দুল করিম খানকে মৌখিক নির্দেশনা দেন বিষয়টি মিমাংসা করার জন্য। চাকুরীর বিধিমালা অনুযায়ী উর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ পালন করতে গিয়ে গত ২৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে তারা নিজ কক্ষে দুই ঠিকাদারকে নিয়ে বসেন।
সুপার এডিটেড ভিডিও ও ষড়যন্ত্রের ফাঁদঃ
বৈঠকে আলোচনার একপর্যায়ে ঠিকাদার মুশফিক অপর ঠিকাদার বীনাকে কিছু টাকা দেন। কিন্তু পুরো বিষয়টি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। মুশফিক গোপনে সেই টাকা লেনদেনের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেন এবং পরবর্তীতে একাধিক সময়ের ভিডিও জোড়াতালি দিয়ে (সুপার এডিট করে) একটি বিভ্রান্তিকর ফুটেজ তৈরি করেন। ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর, গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে একটি বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলে সেই এডিটেড ভিডিও প্রচার করা হলে পরদিনই (১০ সেপ্টেম্বর) কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
একই দিনে দুই তদন্ত প্রতিবেদন: এক অদৃশ্য হাতের জাদুঃ
ঘটনা তদন্তে বিআইডব্লিউটিএ’র প্রধান প্রকৌশলী (মেরিন) জনাব রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিআইডব্লিউটিএ। কমিটি ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তাদের প্রথম প্রতিবেদন দাখিল করে।
প্রথম প্রতিবেদনের সত্যতাঃ
প্রথম প্রতিবেদনে পরিষ্কার উল্লেখ ছিল যে, সরকারী কাজ সচল রাখার স্বার্থে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কর্মকর্তারা এই বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং কোনো কর্মকর্তা টাকা স্পর্শ বা গ্রহণ করেননি। ঘটনার সম্পূর্ণ দায় ছিল দুই ঠিকাদারের। ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ইংরেজি তারিখে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে দুই ঠিকাদারসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানকে চিঠিও পাঠানো হয় (স্মারক নং-৫৫৭)।
দ্বিতীয় প্রতিবেদনের কারসাজিঃ
কিন্তু এর পরেই ঘটে অলৌকিক ঘটনা। অদৃশ্য কোনো ক্ষমতার চাপে বা সদ্য সাবেক চেয়ারম্যানের সরাসরি হস্তক্ষেপে একই দিনে মূল প্রতিবেদনটি গায়েব করে দিয়ে আরেকটি সংশোধিত ও পরিবর্তিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সেখানে প্রথম প্রতিবেদনের ৭ নং ক্রমিকে থাকা পর্যবেক্ষণের ৭.২, ৭.৫, ৭.৭, এবং ৭.৯ পয়েন্টগুলো সম্পূর্ণ বদলে ফেলা হয়। ২য় প্রতিবেদনে অত্যন্ত অযৌক্তিকভাবে দাবি করা হয় যে, কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এবং বক্তব্য ‘প্রশাসনিকভাবে অগ্রহণযোগ্য চর্চা’।
অপরাধী খালাস, বলির পাঁঠা নিরপরাধ কর্মকর্তাঃ
মন্ত্রণালয়ের লিখিত নির্দেশ ছিল অপরাধী ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু ক্ষমতার জোরে সাবেক চেয়ারম্যানের ভগ্নিপতি আবু ইউসুফ বীনা ও ষড়যন্ত্রকারী মুশফিককে স্পর্শও করা হয়নি। অথচ, যারা কোনো টাকা নেননি, কোনো অন্যায়ের সাথে জড়িত ছিলেন না এবং শুধু চাকুরীর নিয়ম মেনে বড় কর্তার আদেশ পালন করেছিলেন—সেই দুই সৎ কর্মকর্তাকে বলির পাঁঠা বানিয়ে বিভাগীয় শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এটি সম্পূর্ণ সাজানো এবং স্বজনপ্রীতির নিকৃষ্টতম উদাহরণ। চেয়ারম্যানের ভগ্নিপতিকে বাঁচাতে তদন্ত রিপোর্ট বিকৃত করা হয়েছে। যে কর্মকর্তারা কোনো টাকা স্পর্শ করেননি, তাদের শাস্তি দেওয়া চরম অন্যায়।”
তদন্ত প্রতিবেদনের কারসাজি বিষয়ে তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য রফিকুল ইসলাম উপ-পরিচালক (উন্নয়ন) মুঠোফোনে প্রতিবেদককে বলেন, “বিষয়টি আমার মনে নেই। এবং এ বিষয়ে আমার কাছে কোন কাগজপত্র বা তথ্য নেই। আপনি তদন্ত কমিটির আহবায়ক রবিউল ইসলামের সাথে কথা বললে সব জানতে পারবেন। তদন্ত কমিটির আহবায়ক, প্রধান প্রকৌশলী (উন্নয়ন) রবিউল ইসলামকে তার মুঠোফোনে একাধিক বার কল করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। পরিচয় দিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি তার কোন উত্তর দেননি।
ফুঁসে উঠছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরাঃ
সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এভাবে জালিয়াতির শিকার হওয়ায় বিআইডব্লিউটিএ’র সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অবিলম্বে এই সাজানো ও পরিবর্তিত তদন্ত প্রতিবেদন বাতিল করে সৎ দুই কর্মকর্তার ওপর আরোপিত অন্যায় দণ্ড প্রত্যাহার এবং মূল অপরাধী ও তদন্ত প্রতিবেদন জালিয়াতির সাথে যুক্ত চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন সর্বস্তরের কর্মচারীরা।

Related Articles

Back to top button