জাতীয়সারাদেশ

বেইলি রোডে বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৪ জন গ্রেফতার

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে গত বৃহস্পতিবার রাতে অগ্নিকাণ্ডে প্রায় অর্ধশত প্রাণহানির ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হলেন-ভবনটির নিচতলার চা-কফির দোকান ‘চুমুক’র দুই মালিক আনোয়ারুল হক ও শফিকুর রহমান রিমন, বিরিয়ানি রেস্তোরাঁ ‘কাচ্চি ভাই’র বেইলি রোড শাখার ম্যানেজার জয়নুদ্দিন জিসান এবং গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের ম্যানেজার হামিমুল হক বিপুল। এছাড়াও অগ্নিকাণ্ডের তথ্য জানতে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে আরও কয়েকজনকে। এ ঘটনায় অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে রমনা থানায় মামলা দায়ের করেছে। মামলা নং-০১। তবে মামলায় কোনো সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। মামলায় অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডসহ আরও কিছু আইনের ধারা উল্লেখ রয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে রমনা থানার পরিদর্শক আবু আনসার। শনিবার রাজধানীর বেইলি রোডের বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় কাচ্চি ভাইয়ের ম্যানেজার ও চা চুমুকের দুই মালিকসহ চারজনকে দু’দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তাদেরকে রিমাণ্ডে নিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
এদিকে ঢাকার বেইলি রোডের বহুতল ভবন গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যু কাণ্ডে শোকপ্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা চিঠিতে তিনি শোক প্রকাশ করেন। এ দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত সুস্থতাও কামনা করেছেন মোদি। চিঠিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, এই দুঃখের সময়ে ভারত বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। একইসঙ্গে তার চিন্তাভাবনা, প্রার্থনাও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ জনগণের প্রতি থাকবে।
জানা গেছে, রাজধানীর বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে লাগা আগুনের ঘটনায় ভবনের ম্যানেজার বিপুলকে গ্রেফতার করেছে রমনা থানা পুলিশ। শনিবার অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর ভবনের ম্যানেজারকে ভবনের বিভিন্ন ত্রুটির বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উৎপল বড়ুয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, তাকে গতকাল শনিবার গ্রেফতার করা হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তবে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আটতলা গ্রিন কোজি কটেজের নিচতলার চা-কফির দোকান ‘চুমুক’ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। তারা স্থানীয়দের কাছ থেকে সংগৃহীত একটি ভিডিওকে তদন্তের বড় আলামত হিসেবে দেখছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনছার মিলটন বলেন, রাজধানীর বেইলি রোডের বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় কাচ্চি ভাইয়ের ম্যানেজার ও চা চুমুকের দুই মালিকসহ ৪ জনকে দু’দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শনিবার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাদের রিমান্ডের আবেদন করলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ নুরুল হুদা চৌধুরীর দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডকৃতরা হলেন-কাচ্চি ভাইয়ের ম্যানেজার জিসান, চা চুমুকের মালিক আনোয়ারুল হক ও শাকিল আহমেদ রিমন এবং গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের ম্যানেজার হামিমুল হক বিপুল।
উল্লেখ্য, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে গ্রিন কোজি ভবনে লাগা আগুনে এ পর্যন্ত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে এখনো অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
এদেক, রাজধানীর বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নারী সাংবাদিক অভিশ্রুতি শাস্ত্রীর মরদেহ এখনও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে তার নাম জানা যায় বৃষ্টি খাতুন।
অন্যদিকে, তিনি তার নাম ব্যবহার করতেন অভিশ্রুতি শাস্ত্রী। নামের এই জটিলতার কারণে তার পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। এতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের পরই পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। আগুনে পুড়ে মেয়ের নিহতের খবর পেয়ে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় ছুটে আসেন নারী সাংবাদিক বৃষ্টি ওরফে অভিশ্রুতির বাবা শাবলুল আলম সবুজ শেখ। এদিকে, নিহত নারী সাংবাদিকের মরদেহ হাসপাতালে সহকর্মীদের শনাক্ত করা নাম ও বাবা সবুজের দাবি করা নামের মধ্যে অমিল রয়েছে। এতে বৃষ্টি খাতুন ও অভিশ্রুতি শাস্ত্রী দুটি নামই দুটি ধর্মের হয়ে যায়। মূলত, এই জটিলতা সৃষ্টির কারণেই তার মরদেহ হস্তান্তর করেনি প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শাবলুল আলম সবুজের তিন মেয়ের মধ্যে বড় ছিলেন বৃষ্টি খাতুন। বৃষ্টি ইডেন মহিলা কলেজের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। একটা সময়ে ইডেন ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরে অনলাইন পত্রিকা দ্য রিপোর্টের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। এ বছরের ১ মার্চ অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে (নতুন চাকরি) যোগ দেওয়ার কথা ছিল তার। বৃষ্টি খাতুন পারিবারিকভাবে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হলেও ঢাকায় এসে সনাতন ধর্মাবলম্বী হয়ে যান। নাম পরিবর্তন করে হন অভিশ্রুতি শাস্ত্রী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এবং তার চাকরিক্ষেত্রে অভিশ্রুতি শাস্ত্রী নামে পরিচিত ছিলেন তিনি।
এদিকে, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের একটি সূত্র জানায়, মরদেহটিকে রমনা কালি মন্দিরের পুরোহিত অভিশ্রুতির মরদেহের দাবি করেন। তিনি জানান, আট মাস ধরে রমনা কালী মন্দিরে হিন্দু ধর্মের অনুসারী হিসেবে যাতায়াত ও প্রার্থনা করতেন অভিশ্রুতি। এমন কি মন্দিরে নিজেকে সনাতন ধর্মের পরিচয় দিয়ে অভিশ্রুতি জানিয়েছেন তার পারিবার ভারতে বানারাস থাকে।
রমনা থানার একটি সূত্র জানায়, কুষ্টিয়া থেকে আসা শাবলুল আলম সবুজ শেখ অভিশ্রুতি শাস্ত্রীর মরদেহ বৃষ্টি খাতুন বলে দাবি করেন এবং মরদেহ নিতে চেয়েছিলেন। নিহত নারী সাংবাদিক অভিশ্রুতি শাস্ত্রীর শিক্ষা সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রে বৃষ্টি খাতুন নাম উল্লেখ রয়েছে। মরদেহ হস্তান্তরের সময় নিহত নারী সাংবাদিকের নাম অভিশ্রুতি শাস্ত্রী এবং তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বী বলে হস্তান্তর প্রক্রিয়া আটকে দেয় রমনা কালী মন্দির কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে ঢাকার রমনা কালী মন্দিরের সভাপতি উৎপল সাহা বলেন, মন্দিরের পক্ষ থেকে রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং জেলা প্রশাসক বরাবর অভিশ্রুতি শাস্ত্রীর পরিচয় নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তার সমাধানে ডিএনএ টেস্টের আবেদন করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, নিহত নারী সাংবাদিকের নাম ও ধর্মীয় পরিচয়ের জটিলতার কারণে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়নি। মরদেহ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত জানতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে পুলিশ।
এ বিষয়ে রমনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাবিবুর রহমান বলেন, আমাদের কিছুই আর করার নেই। আমরা আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। বাবা পরিচয়ে কুষ্টিয়ার সবুজ শেখ মরদেহ নিতে চেয়েছেন। এদিকে, রমনা কালী মন্দির কর্তৃপক্ষও মরদেহটি দাবি করেছে। তাই এই সিদ্ধান্ত এখন আদালতের মাধ্যমে নিতে হবে। কেউ যদি মরদেহ নিতে চায় তাহলে আদালতে আবেদন করতে হবে। এখন আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন মরদেহ কার কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তবে বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জানানো হয়েছে। এ কমিটি ৭ কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দেবেন বলেও জানানো হয়। গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সব কথা জানানো হয়েছে। কমিটির সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুলের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এমপি, সামছুল হক দুদু, মো. ছানোয়ার হোসেন এবং মো. সাদ্দাম হোসেন (পাভেল) অংশগ্রহণ করেন।
এ বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে জানানো হয় যে, বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট প্রদানের জন্য ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং কমিটির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বৈঠকে ‘আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) (সংশোধন) বিল, ২০২৩’ এর উপর বিস্তারিত আলোচনা করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জনপূর্বক বিলটি অবিলম্বে সংসদে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।বৈঠকে জন নিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Related Articles

Back to top button