জাতীয়

অবৈধ আয়ে নামে-বেনামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়

ফ্যাসিষ্ট সরকারের দোসর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান

স্টাফ রিপোর্টার: সামান্য অফিস ক্লার্ক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং সরকারি পদ ব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের করেছেন। চল্লিশ হাজার টাকা বেতনে চাকুরী করে নামে-বেনামে তিনি গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, মিজানুর রহমান ২০০০ সালে অফিস সহকারী পদে কর্মজীবন শুরু করেন। গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের নাম ভাঙ্গিয়ে অবৈধ পন্থায় কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। ইতিমধ্যে এ নিয়ে অভিযোগ দেয়া হয়েছে দূর্নীতি দমন কমিশন দুদকে। দীর্ঘ ২৬ বছর মিজানুর রহমান যেই উপজেলায় কাজ করেছেন সেই মীরসরাই উপজেলার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করার শর্তে জানিয়েছেন, গেল সতর বছর ফ্যাসিষ্ট হাসিনা সরকারের ছায়াতলে ছিলেন মিজানুর রহমান। আওয়ামী লীগের কর্মীদের দোহাই দিয়ে তাদের উপর ভর করে অনিয়ম দূর্নীতির মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে অর্থ কামিয়েয়েছেন। তার টেবিলে যেই ফাইলই গিয়েছে তা ছাড়াতে গুনতে হয়েছে তার দেওয়া নির্দিষ্ট হারে চাঁদা। এক কথায় চাঁদা ছাড়া ফাইল ছাড়তেনই না মিজানুর রহমান। একইকথা জানিয়েছেন আবুল কালাম নামে এক ভূক্তভোগী। তিনি জানান, উপ-প্রকৌশলী মিজানুর রহমান টাকা ছাড়া কোন কিছুই বুঝেন না। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নাম ভাঙ্গিয়ে তিনি তার আখের গুছিয়েছেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রচুর ধন সম্পদের মালিক বনে গেছেন। এক জন সামান্য সরকারি কর্মচারী হয়ে তিনি কিভাবে এত টাকার মালিক বনে গেছেন তার সঠিক খোজখবর নিলে বেরিয়ে আসবে মিজানুর রহমানের দূর্নীতির চিত্র। মীরসরাইয়ে কর্মরত অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে একবার চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন মিজানুর রহমান। পরে রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হন। সুচতুর মিজান যখন যাকে প্রয়োজন স্বার্থের জন্য তাকেই ব্যবহার করেছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাকে ভোলার মনপুরায় বদলি করা হলেও পরে অদৃশ্য শক্তির ইশারায় নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় বদলি হয়ে আসেন সুচতুর মিজানুর রহমান। এখানে এসেও ঘুষ, দূর্ণীতিতে জড়িয়ে পড়েনে মিজানুর রহমান। তবে এসব অভিযোগ অশিকার করেছেন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান। তিনি জানান, পারিবারিক রোষানলের কারণে আমাকে জড়িয়ে নানাধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সম্পদ যা আছে,তা নিজের উপার্জিত টাকায় করেছেন বলে জানান। তবে কিভাবে সামান্য টাকা বেতনের কর্মচারী এত টাকার মালিক বনে গেলেন তার কোন সঠিক উত্তর তিনি দিতে পারেন নি।
সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকুরীরত মিজানুর রহমান নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেলেও এক সময় অবাব-অনটনে জীবন-যাপন করেছেন। কোটি টাকা তো দূরের কথা সংসার চালানোই রীতিমতো হিমসীম খেতে হতো। তবে ক্লাকের চাকুরীর মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরুর দিকে সবকিছুই ছিল তার অজানা। পরবর্তীতে টাকার নেশায় সরকারি পদ আর রাজনীতিকে ব্যবহার করে ঘুষ, দূর্ণীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। ২০০০ সালের মিজানুর রহমান চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলায় অফিস ক্লার্ক হিসেবে যোগদান করেন। পরে দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকায় কর্মরত ছিলেন। ওই সময় তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন অবৈধ পন্থায় টাকা কামিয়েছেন। শুধু তাই সাবেক এই প্রভাবশালী মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ২৪ বছর তিনি একই জায়গায় চাকুরী করেছেন। দীর্ঘ সময়ে যতই বদলীয় অর্ডার এসেছে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নাম ব্যবহার করে বদলির আদেশ বাতিল করেছেন। ফ্যাসিষ্ট সরকারের দোসর হয়ে অবৈধভাবে কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক হয়েছেন মিজানুর রহমান। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাজধানী ডেমরার রসুলনগর (পশ্চিম টেংরা) এলাকায় মিজানুর রহমানের রয়েছে পাঁচতলা বহুতল ভবন, যার আনুমানিক মূল্য সাড়ে ছয় কোটি টাকা। মিজানুর রহমানের স্ত্রীর নামে ঢাকায় প্রায় ৮০ লাখ টাকা মূল্যের ১ হাজার ৭৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। একটি শপিং কমপ্লেক্সে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার শেয়ার। মিজানুর রহমানের গ্রামের বাড়ি ফেনীর পরশুরাম উপজেলার উত্তর ধনীকুন্ডা গ্রামে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিনতলা বাড়ি। একই এলাকায় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের একটি মার্কেট। প্রায় ৪৫০ শতাংশ কৃষিজমি, যার বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া নামে-বেনামে আরও প্রায় কয়েক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তার। একজন সামান্য কার্ক থেকে চল্লিশ হাজার টাকা বেতনের কর্মচারি মিজানুর রহমান প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার মালিক কিভাবে বনে গেছেন এই চিন্তা করলেই ওই এলাকার যে কারোই চোখ চরক গাছে উঠে যায়। টেলিফোনে কথা হয় বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শিবানী সরকারের সঙ্গে। তিনি জানান, উপজেলায় কাজ করছেন এমন কোন সরকারি কর্মকর্তা অবৈধভাবে সম্পদ উপার্জন করে থাকেন তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রায়হান কবীরের কোনো বক্তব্যে পাওয়া যায়নি।

Related Articles

Back to top button