জাতীয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সংস্থায় প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
আদালতে মামলা চলমান থাকার মধ্যেই অফিসে প্রবেশ ও তালা কাটার অভিযোগ, বিপাকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

টাইমস ২৪ ডটনেট : দেশের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অধিকার, পুনর্বাসন ও কল্যাণে কাজ করা জাতীয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সংস্থা (NFVI)-কে ঘিরে নতুন করে দেখা দিয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া, আদালতে চলমান মামলা এবং পরবর্তীতে সংস্থার কার্যালয়ে প্রবেশ করে তালা পরিবর্তনের ঘটনায় গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় রাজধানীর বকশীবাজারের ৬, অরফানেজ রোডে। সংস্থাটির দেওয়া নথি অনুযায়ী, এটি ১৯৬৪ সালে নিবন্ধিত একটি স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংগঠন এবং এর নিবন্ধন নম্বর ১৫৫৮/৬৪। নথিতে বলা হয়েছে, সংগঠনটির কার্যক্রম বাংলাদেশব্যাপী বিস্তৃত এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর শাখা ও কার্যক্রম রয়েছে।
আদালতে মামলা চলমান, এরপরও প্রশাসক নিয়োগ—প্রশ্ন সংস্থার
সংস্থাটির পক্ষ থেকে দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তাদের সম্পত্তি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক বিরোধ ও মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে সংস্থার নামে বরাদ্দকৃত বকশীবাজারের ভবন নিয়ে জেলা প্রশাসনের একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করা হয়েছিল বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়, আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সংস্থাটিতে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়।
এখানেই প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি—কোন বিধান, কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং কার নির্দেশের ভিত্তিতে প্রশাসক নিয়োগ করা হলো?
তবে প্রশাসক নিয়োগের আইনগত বৈধতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়। তাই এ বিষয়ে অভিযোগপত্রের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতিতে অফিসে প্রবেশের অভিযোগ
সংস্থাটির দেওয়া নথিতে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কার্যালয়ে প্রবেশ ও তালা পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতিতে কয়েকজন ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কার্যালয়ে প্রবেশ করা হয়। পরে মূল ফটকসহ অফিসের বিভিন্ন কক্ষের তালা কেটে নতুন তালা লাগিয়ে চাবি নিয়ে চলে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
সংস্থাটির দাবি, এর ফলে তাদের নিয়মিত প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পরিচালিত বিভিন্ন সেবা কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগে যেসব ব্যক্তির নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বক্তব্যের বিষয়ে তাদের বক্তব্য বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাধীন তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
৪৯টি জেলা শাখার কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ
সংস্থাটির দ্বিতীয় নথিতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের কার্যক্রম ও শাখা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব মাঠপর্যায়ের সেবাতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশেষ করে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন, অধিকার আদায় এবং বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
সরকারি সম্পত্তি বরাদ্দ নিয়েও পুরোনো বিরোধ
নথিতে সংস্থার নামে বকশীবাজারের অরফানেজ রোডের বাড়িটি বরাদ্দের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ভবনটি তাদের নামে বরাদ্দ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই সম্পত্তির দখল ও বরাদ্দ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয় এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এ সংক্রান্ত একটি রিট মামলায় হাইকোর্টের আদেশও রয়েছে। ফলে সম্পত্তি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে নতুন করে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আদালতের আদেশ ও সংশ্লিষ্ট আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছে।
শুধু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নয়, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়েও দাবি
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর স্বার্থে সংস্থাটির নথিতে কয়েকটি দাবিও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
– বকশীবাজারের অরফানেজ রোডের বাড়িটি জাতীয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সংস্থার নামে বিনামূল্যে স্থায়ীভাবে বরাদ্দের ব্যবস্থা;
– দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের মাসিক ভাতা বৃদ্ধি;
– যোগ্যতা অনুযায়ী দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি;
– সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালগুলোতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা;
– সরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা।
প্রশ্ন এখন একটাই—প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বৈধতা কোথায়?
জাতীয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সংস্থাকে ঘিরে বর্তমান বিরোধটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অফিস দখল বা প্রশাসক নিয়োগের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার, তাদের জন্য পরিচালিত সেবা কার্যক্রম, একটি নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বাধীনতা এবং সরকারি সম্পত্তির ব্যবহার ও বরাদ্দের বিষয়।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এখন সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে প্রত্যাশা—প্রশাসক নিয়োগের আইনগত ভিত্তি কী, আদালতে চলমান মামলার অবস্থান কী, কার অনুমোদনে সংস্থার কার্যালয়ে প্রবেশ ও তালা পরিবর্তন করা হয়েছে এবং এর ফলে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবা প্রত্যাশী দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কি না—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ ও নথিভিত্তিক জবাব দেওয়া।
কারণ, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠনকে ঘিরে প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের কারণে যদি তাদের সেবাই বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হবে সেই মানুষগুলোর—যাদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব।



