top

খুলনা এখন মৃত্যুপুরী

টাইমস২৪ ডটনেট, ঢাকা : একসময়ের শান্তির নগরী বলে খ্যাত বাংলাদেশের খুলনা এখন রূপ নিয়েছে মৃত্যুপুরীতে। হত্যাকান্ড এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিনত হয়েছে। শুধু রাতের অন্ধকারেই নয়, আদালত চত্বরের মতো সুরক্ষিত স্থানেও দিনের আলোয় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। সন্ত্রাসীদের মধ্যে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করার প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে। যা কোনভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। প্রতি সপ্তাহে ১-২টি হত্যাকান্ড ঘটেই চলেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমের জেলা খুলনা মহানগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। একের পর এক গুলি, কুপিয়ে জখম এবং খুনের ঘটনার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা এখন নিজেদের অনিরাপদ মনে করছেন।

বাংলাদেশের খুলনায় মাত্র তিন ঘন্টার ব্যবধানে মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) ও নাজমুল (১৮) নামের দুই যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গত বুধবার সন্ধ্যায় নগরীর লবণচরা থানাধীন আশিবিঘা কালভার্ট সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতের মধ্যে মঞ্জুরুল ইসলামকে (১৮) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সে আশিবিঘা কালভার্ট এলাকার খোকন সানার ছেলে ও সেন্টারিং মিস্ত্রির কাজ করতো।
এক সময় খুলনাকে ডাকা হতো শান্তির নগরী বলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই শান্তিতে অশান্তির ঝড় তুলেছে সন্ত্রাসীরা। অস্ত্রের ঝনঝনানি, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি আর আধিপত্য বিস্তারের জেরে খুলনা এখন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এরই মধ্যে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ সন্ত্রাসীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। তবে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা কেউই তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী নয়। অধিকাংশই মাদকসেবী ও মাদকের খুচরা বিক্রেতা। ফলে আসল রাঘব-বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় বিভিন্ন চক্রের মধ্যে এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এই অশান্তির অন্যতম বড় কারণ। নগরীতে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও এর ভাগাভাগি নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম রূপ নিয়েছে। অনেক ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীরা বা মূল সন্ত্রাসীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা অপরাধ প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যার পর বা গভীর রাতে সাধারণ মানুষ জরুরি প্রয়োজনেও বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। ঘের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্থানীয় সাধারণ ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকিতে ভুগছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন তৎপরতা থাকলেও, সন্ত্রাসী কর্মকা- দৃশ্যমানভাবে না কমায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
খুলনাবাসী ও বিশ্লেষকদের মতে, আগে খুলনায় রাতে হাঁটতে ভয় ছিল না। এখন সন্ধ্যার পরই আতঙ্ক ঘিরে ধরে। গেল ৪৮ ঘণ্টায় দুটি হত্যাকান্ডে ও একজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে স্থানীয়রা। প্রকৃত সন্ত্রাসীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। শহরটিকে আবার আগের মতো শান্ত ও নিরাপদ করতে হলে শুধু সাধারণ অপরাধী গ্রেপ্তার নয়, বরং অপরাধের মূল উৎস বন্ধ করা এবং যৌথ বাহিনীর জোরালো ও সাঁড়াশি অভিযান চালানো অত্যন্ত জরুরি।
পুলিশ সূত্র জানায়, মহানগরীর ৮ থানায় ১৮১ জন সন্ত্রাসী, ৫৮৪ জন মাদক বিক্রেতা ও ৬৯ জন চাঁদাবাজের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। থানাভিত্তিক তালিকায় সবচেয়ে বেশি ৪৫ জন সন্ত্রাসী রয়েছে লবণচরা থানায়। দ্বিতীয় অবস্থানে খালিশপুর থানায় ৩৬ জন এবং দৌলতপুর থানায় ৩১ জন। এছাড়া সদর থানায় ২৭ জন, সোনাডাঙ্গায় ২০ জন, আড়ংঘাটায় ১৫ জন, হরিণটানায় চারজন এবং খানজাহান আলী থানায় দুজন সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে। তালিকায় হত্যাসহ নানা গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নগরীর ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, অভিযানের সংবাদ প্রকাশ্যে আসার পর অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। ফলে মাঠপর্যায়ে যাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে তাদের অধিকাংশই সহযোগী বা নিস্তরের কর্মী।
পুলিশের তথ্য মতে, খুলনা মহানগরী এবং এর আশপাশের উপজেলাগুলোতে ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপ তৎপর রয়েছে। এগুলো হলো-রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর ‘বি-কোম্পানি’, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ ও নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ। এসব সন্ত্রাসী চক্রের মধ্যে গ্রেনেড বাবু নিজেকে ভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় নিয়ে গেছেন।
কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ৩১টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। আর চলতি বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে হত্যা মামলা দুটি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে একটি করে, এপ্রিলে দুটি, মে মাসে হয়েছে পাঁচটি, জুনে তিনটি, জুলাইয়ে দুটি এবং আগস্ট মাসে এ পর্যন্ত হত্যার শিকার হয়েছেন দুজন। চলতি বছরে নগরীর আটটি থানার মধ্যে খুলনা সদর ও সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় জানুয়ারিতে প্রথম হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। মে মাসে সবচেয়ে বেশি খুন হয় খুলনা মহানগরে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) খন্দকার হোসেন আহমদ বলেন, খুলনাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা টহল বাড়িয়েছি, বিশেষ চেকপোস্ট দিয়েছি শহরের বিভিন্ন জায়গায়। এ ছাড়া যে খুনগুলো হচ্ছে, এগুলোর বেশির ভাগই টার্গেট কিলিং। আমরা প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রেপ্তার করেছি। তিনি আরও বলেন, আমরাও বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছি। আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। সম্প্রতি শহরে দুটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় পুলিশের একাধিক টিম তদন্ত করছে। খুব শিগগির আসামিরা গ্রেপ্তার হবে বলে আশা প্রকাশ করছি।

Related Articles

Back to top button