ইরানজুড়ে ‘বিদেশি মদদপুষ্ট’ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশাল সমাবেশ

টাইমস ২৪ ডটনেট: ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন প্রদেশে সরকারপন্থী লক্ষাধিক মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে। এসব সমাবেশে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি তারা অটল সমর্থনের বার্তা দেন। সোমবার (১২ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় দুপুর ২টা থেকে তেহরানসহ অধিকাংশ প্রদেশে সমাবেশ শুরু হয়। তবে কিছু প্রদেশে সকাল ৯টা ও ১১টা থেকেই কর্মসূচি শুরু হয়।ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ছবিতে দেখা যায়, রাজধানীর এঙ্গেলাব স্কয়ারের দিকে জনস্রোত এগিয়ে যাচ্ছে। সমাবেশে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীরা ‘মৃত্যু আমেরিকার’, ‘মৃত্যু ইসরাইলের’ স্লোগান দেয়। পাশাপাশি অনেককে ‘আল্লাহর শত্রুদের মৃত্যু হোক’ বলেও স্লোগান দিতে শোনা যায়।

লাইভ ফুটেজে সেমনান প্রদেশের শাহরুদ শহরে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজা ও শোক মিছিলেও বিপুল জনসমাগম দেখা গেছে। একই সঙ্গে কেরমান, জাহেদান ও বিরজান্দসহ বিভিন্ন শহরে সরকারপন্থী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, যা সাম্প্রতিক ‘সন্ত্রাসী ঘটনার নিন্দা’ জানাতে আয়োজন করা হয়েছে বলে জানানো হয়।রাষ্ট্রীয় ও সরকারঘনিষ্ঠ সম্প্রচারমাধ্যমগুলো এই সমাবেশগুলোকে ‘আমেরিকান-জায়নবাদী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ইরানি গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।কর্মকর্তারা জানান, দেশব্যাপী এই সমাবেশ শত্রুপক্ষের ষড়যন্ত্র, ভাড়াটে ও সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে অস্থিরতা ও বিভাজন সৃষ্টির প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির অকাট্য প্রমাণ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে অর্থনৈতিক ইস্যুতে কয়েকটি শহরে কিছু দোকানদার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সরকারের কয়েকজন ব্যক্তির প্রকাশ্য বক্তব্যের পর পরিস্থিতি সহিংসতার দিকে মোড় নেয়। ইসরাইল সমর্থিত ফারসি ভাষার গণমাধ্যমে সেই বক্তব্যগুলো জোরালোভাবে প্রচার করা হয়, যা ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলায় উৎসাহ জুগিয়েছে বলে অভিযোগ।কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক অভিযোগগুলোর বৈধতা স্বীকার করে তা সমাধানের অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেছে যে, বিদেশি মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো জনগণের জীবনযাত্রা সংক্রান্ত উদ্বেগকে কাজে লাগাচ্ছে—যা মূলত ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তেল রপ্তানি লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, অস্থিরতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সরকারের সমর্থন রয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাঙ্গাকারীদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে হুঁশিয়ারি দেন—তার ভাষায় ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের’ ক্ষতি হলে ওয়াশিংটন ইরানে হামলা চালাতে পারে। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওও বক্তব্য দিয়ে মোসাদের সম্পৃক্ততা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিয়েছেন।শুক্রবার দেওয়া বক্তব্যে ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনি বলেন, দেশ ‘ভাঙচুরকারীদের কাছে মাথানত করবে না’। তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।রোবার টেলিভিশন সাক্ষাতকারে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেন, দেশবাসীকে দাঙ্গাকারীদের নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া যাবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রতিবাদ আর দাঙ্গা এক বিষয় নয়। পেজেশকিয়ান বলেন, বেসামরিক নাগরিক হত্যা ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দাঙ্গাকারীদের প্রশিক্ষণ ও সমর্থন দিচ্ছে।একই সুরে সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, ইরান শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করে, তবে সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেবে।ইরানের বিচার বিভাগ বিদেশি মদদপুষ্ট দাঙ্গাকারী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে এবং রক্তপাত ও ভাঙচুরে জড়িতদের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে।সোমবারের সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও ইসলামি বিপ্লবের নেতার পাশে আছেন এবং শত্রুপক্ষকে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ দেবেন না।

তেহরানের এক সমাবেশে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারী মোহাম্মদ আলি আব্বাসি প্রেস টিভিকে বলেন, ‘আমি আজ এখানে আমাদের শহীদদের রক্তের প্রতি সম্মান জানাতে এবং আমাদের নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে বলতে এসেছি—আমরা আমেরিকান ও জায়নবাদীদের নোংরা যুদ্ধকে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে সফল হতে দেব না।’অনেক অংশগ্রহণকারী বলেন, অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বৈধ। তবে তারা জোর দিয়ে বলেন, সমাধান আসতে হবে দেশের ভেতর থেকেই—যাদের হাতে হাজারো ইরানির রক্ত, তাদের কাছ থেকে নয়।

আরেক বিক্ষোভকারী ফাতেমেহ বলেন, ‘আমরা যেকোনো বাহ্যিক হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করি। আমাদের অর্থনৈতিক কষ্ট রয়েছে এবং আমরা আমাদের দাবি তুলতে থাকব, কিন্তু বাইরে থেকে কেউ এসে আমাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেবে—তা আমরা মেনে নেব না।’

সূত্র: প্রেস টিভি।




