বাংলাদেশ

৯০৬ প্লটের অপেক্ষায় নিঃস্ব ১ লাখের বেশি পরিবার, ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা

৪০ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি ভাষানটেক বেনারসী তাঁত পল্লী

মাখদুয় সামি কল্লোল: বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বেনারসী তাঁত শিল্প আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। মিরপুরের ভাষানটেক এলাকায় বেনারসী তাঁতীদের পুনর্বাসনের জন্য নেওয়া সরকারি প্রকল্পটি অনুমোদনের চার দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ৯০৬টি প্লট বরাদ্দ না পাওয়ায় মিরপুর ১০, ১১ ও ১২ নম্বর এলাকার হাজারো তাঁতী পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেনারসী তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ১৯৯৫ সালের ২৩ মার্চ DPEC অনুমোদনের মাধ্যমে মিরপুর ভাষানটেকে প্রায় ৪০ একর জমিতে ‘বেনারসী তাঁত পল্লী’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রকল্পের জন্য ২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ, মাটি ভরাটে সাড়ে ৮ কোটি টাকা এবং জমির মূল্য বাবদ ১১ কোটি ৩২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা পরিশোধ করা হলেও প্রকল্পটি আজও কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে।

২০১৫ ও ২০১৮ সালে সরকার পর্যায়ক্রমে ৩ একর ও ৩৭ একর জমি রেজিস্ট্রি করে দিলেও বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড এখনো পুরো জমির দখল বুঝে পায়নি। ফলে ৯০৬ জন যাচাইকৃত বেনারসী তাঁতী প্লট বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। তাঁতীদের অভিযোগ, বোর্ডের কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তা ও সদস্যের অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্পটি ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

বেনারসী তাঁতীরা জানান, তারা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতবর্ষের উত্তর প্রদেশের বেনারস এলাকা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় আবারও বাস্তুচ্যুত হন। স্বাধীনতার পর মিরপুর এলাকায় বস্তি ও ক্যাম্পে বসবাস করেই তারা এই শিল্প টিকিয়ে রাখেন। একসময় এই শিল্পের সুনাম দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকরা বেনারসী শাড়ির জন্য মিরপুরে আসতেন।

কিন্তু গত এক দশকে অবাধে ভারতীয় শাড়ি বাজারে প্রবেশ, সরকারি নজরদারির অভাব এবং নীতিগত সহায়তা না থাকায় দেশীয় বেনারসী শিল্প প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে অনেক তাঁতী রিকশা চালানো, ঠেলা টানা, দিনমজুরি, ভ্যান চালানো কিংবা ক্ষুদ্র পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। অনেকে পরিবার নিয়ে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন।

তাঁতী নেতারা দাবি করেন, এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পরিবার জড়িত। ভাষানটেক বেনারসী তাঁত পল্লী প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দুই লক্ষাধিক পরিবারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।

এ অবস্থায় বেনারসী তাঁতীরা ৬ দফা ও ৪ দফা দাবিতে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—৯০৬টি প্লট দ্রুত বরাদ্দ, তাঁতীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বয়স্ক ভাতা ও রেশন কার্ড চালু, স্বাস্থ্য কার্ড ও বীমা সুবিধা প্রদান,
বিতর্কিত কর্মকর্তা অপসারণ এবং ৪০ বছর ধরে ঝুলে থাকা ভাষানটেক প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন।

তাঁতীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত না এলে বেনারসী তাঁত শিল্পও মসলিনের মতো ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে।

Related Articles

Back to top button