মতামত

রাজনীতিতে শিষ্টাচার, শিষ্টাচারের রাজনীতির

মীর নেওয়াজ আলী :আজকাল যা দেখছি তাতে অনেকেইা হতাশ হচ্ছি। রাজনীতিতে যে সকল অশ্লিষ শ্লোগান দেয়া হচ্ছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাতে করে রাজনীীততে শিষ্টাচার ক্রমান্বয়ে লোপ পাচ্ছে বলেই অনেকের বন্ধমূল ধারনা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে “টিনের চালে কাউয়া ………………. আমার ……………….” শ্লোগান শুনে ভেবে হতাশ হই আমাদের মেধাবীরা ভবিষ্যতে কোন বাংলাদেশ উপহার দিতে চায়। যে কোন বিষয়ে প্রতিবাদ করাই যায় তাই বলে মেধাবীর মুখে অশ্লিল ভাষা এটা হতাশ করে। ওরা কি একবারও ভাবে না এই ধরনের শ্লোগান কতটা মানান সই। এর ফলে নিজের পরিবারের সদস্যরা কতটা লজ্জা পেল। কোন অশ্লীল শব্দ প্রতিবাদের শ্লোগান হতে পারে না, প্রতিবাদের শ্লোগান হবে সালিন ভাষায় জ্বালাময়ী।

রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমশ কলুষিত, প্রতিহিংসা ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মতো ঘৃণ্যতম ঘটনা বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে প্রতিপক্ষের নেতাদের লক্ষ্য করে অশোভন ভাষার ব্যবহারও। অথচ রাজনীতি বিদদের কাছ থেকে কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে দেশের সাধারণ মানুষ এ ধরনের কাদা ছোড়াছুড়ি আশা করে না। এ ধরনের কর্মকান্ড কখনো দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। অনুরূপ সাংবাদিক নামধারী দলকানাদের কর্মকান্ডও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভেদণ্ডবিভাজন ও সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। নিকট অতীতে এ ধরনের ঘটনার বহু নজির রয়েছে।

‘ফকিন্নির বাচ্চা’ শব্দটা নিয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে যখন টকশোতে প্রশ্ন করা হয়েছে, তাতে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন—এটা একটা মাইন্ডসেট। এর মানে এই নয় যে আপনি গরিব ঘর থেকে এসেছেন বা আপনার টাকা-পয়সা নেই। রুমিন তার ফেইসবুকে এনসিপির এক নেতাকে উদ্দেশ্য করে এই শব্দ লিখেছিলেন। আমারও মতামত প্রায় কাছাকাছি। আমি মনে করি ‘ফকিন্নির বাচ্চা’, ‘বান্দির পোলা’ এগুলো আক্ষরিক অর্থে গালি নয়; আমি এগুলোকে বলি ‘কনসেপ্ট’। এখন প্রশ্ন হলো তার এই ব্যাখা কতটুকু গ্রহনযোগ্য ?
সম্প্রতি আকেটি নতুন একটা গালি শুনা যাচ্ছে ‘কেসকি বান্দির পোলা’। বিএনপি নেতা এডভোকেট ফজলুর রহমানকে একটি টিভি টকশোতে এটা বলতে শোনা গেছে। এর অর্থ কি তা আজও আমার মত অনেকেরই জানা হয় নাই। অন্যদিকে তাকে ‘কাউয়ার সাথে সা*য়া ‘ ছন্দ মিলিয়ে তার বাড়ির সামনে যেই তরুণীটি গালি দিল, প্ল্যাকার্ডে ওই বাণী লিখে রাখল- এরই বা কি অর্থ দাড়ালো ? তিনি কি বুঝাতে চেয়েছেন ? তার ওই অঙ্গের মতো ‘দামি’ নাকি ‘অত্যন্ত সস্তা’ কিছু? নাকি অন্য কিছু বোজাতে চেয়েছেন ? মনে রাখা দরকার, রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ থাকবেই। তাদের সার্বিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করাও দোষের কিছু নয়। কিন্তু এর একটা সীমা-পরিসীমা থাকা উচিত। আজকের রাজনৈতিক অঙ্গনের দুরবস্থা দেখে মনে হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে কি মানুষ তৈরী হচ্ছে না ? রাজনীতিবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে এবং থাকবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এমন কোন শব্ধ কি একজন ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনীতিবিদের ক্ষেত্রে কি ব্যবহার করা উচেত ?

রাজনীতিতে মহানুভবতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। এতে দূরদর্শিতার ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন পাওয়া যায়। রাজনীতি করতে গেলে অথবা দেশ পরিচালনা করতে হলে বড় মনের দরকার হয়। একটি সংকীর্ণ মন ও মানসিকতা এবং আঠার কোটি মানুষের বিশাল একটি দেশ একসাথে চলতে পারে না। বর্তমানে আমরা অনেক সমৃদ্ধ। শিক্ষা-দীক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সবক্ষেত্রে আমরা ব্যাপক পরিবর্তন ও অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছি। কিন্তু শিক্ষাঙ্গন ও ছাত্র রাজনীতিতে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে ? আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন।

আমাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বার বার হুমকির মুখে পড়ছে। সীমান্তে মানুষ মারা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীরা বলতেন, সীমান্ত হত্যায় তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। বর্তমান উপদেষ্টারাও কি ব্যতিক্রম ? প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বাতলানো জঙ্গী লিঙ্ক খুঁজতে আমাদের ছেলেদেরই শুধু নয়, বোরখাপরা মেয়েদেরও গ্রেফতার করে নির্বিচারে নির্যতান করা হয়েছে বিগত সরকারের আমলে। বর্তমানে মব সৃষ্টিার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা চলছে একের পর এক। যীশু খ্রীষ্টের জন্মের ৩০০ বছরেরও পূর্বে আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেছিলেন এবং তার হাতে রাজা পুরু পরাজিত হয়ে বন্দী হিসেবে তার সামনে এসেছিলেন। আলেকজান্ডার তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি আমার কাছ থেকে কি ধরনের আচরণ আশা করো? পুরুর সাদাসিধে জবাব ছিল, ‘রাজার মতো।’ বলাবাহুল্য, বন্দী পুরুকে আলেকজান্ডার স্বাভাবিক অবস্থাতেই তার সামনে হাজির করেছিলেন, ডান্ডাবেড়ি বা কয়েদীর পোশাক পরিয়ে নয়। এখন ভাবুন তারা সভ্য ছিলেন না আমরা?

কিছু বষয়ে আমাদের দেশের মানুষকে পরিষ্কার থাকতে হবে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা বিদেশিরা ঠিক করে দিয়েছে, এমন নজির নেই। যতটুকু গণতন্ত্র আমরা পেয়েছি, তা আমাদের দেশের জনগনের লড়াই-সংগ্রামের ফসল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, ২৪এর আগস্ট গণঅভ্যুত্থান এদেশের শ্রমজীবী মানুষ আর ছাত্রদের আন্দোলনের ফল। যারা রাজনীতি করছেন, তাদের উচিত জনগণের ওপর ভরসা রাখা। জনগণের মনের ভাষা ও অধিকার রাজনীতিকদের বুঝতে হবে। দেশের রাজনীতি দেশে চলবে। বিদেশিদের নাক গলানোর সুযোগ করে দিয়ে দেশের রাজনীতিকে কলুষিত করার তৎপরতাকে জনগণ ভালোভাবে দেখে না। জনগণ সচেতন এবং তারা রাজনৈতিক সব কূটচাল বুঝতে পারে। দেশ আমার, রাজনীতিও আমাদের জন্য। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র দেশের জনগণ এনেছে। তারাই সিদ্ধান্ত নেবে এ বিষয়ে কী করতে হবে।

বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাজনীতির শিষ্টাচার কিংবা শিষ্টাচারের রাজনীতি এই দুটাই যেন নির্বাসন যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ২৪এর জুলাইয়ের রক্তাক্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধে সমাজের বৈষম্যের সকল স্তরে সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল; আশা ছিল শিষ্টাচারে, ভাষায় ও নীতিতে আসবে পরিমার্জন। কিন্তু জাতি হতাশ হচ্ছে। শিষ্টাচারের অভাব এখন নতুন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষত চিহ্ন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, উৎকৃষ্ট শিক্ষার প্রকৃত মানদণ্ড—শিষ্টাচার। তা যদি অশালীনতা ও ঔদ্ধত্যে পর্যবসিত হয়, তবে আমরা কী ধরনের সমাজ নির্মাণ করতে চলেছি? ভাবনার বিষয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধারা, গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৈনিরা যদি অশোভন ভাষা ও অহংকারকে শিষ্টাচারের মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চালিয়ে যান, তবে বহুমাত্রিক গণতন্ত্র কেবল স্বপ্নই থেকে যেতে পারে। ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা নয়, যদি প্রতিহিংসাই হয়ে ওঠে নতুন নীতি—তবে শালীনতা ও ভদ্রতার ভাষা এক সময় প্রতিশোধের আগুনে রূপ নিতেই বাধ্য। ভদ্রতা যদি দুর্বলতা মনে করা হয়, তবে কঠিন প্রতিউত্তরই ভবিতব্য।

রাজনীতি কেবল দল বা ক্ষমতার লড়াই নয়। এটি আচরণ, শিষ্টাচার এবং নৈতিকতার প্রতিফলন। রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে মানুষ এগুলো দেখকে চায়। প্রকৃত অর্থে তারা মূলত চায় সততা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা। বাংলাদেশের দুই শীর্ষ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক আচরণ যদি এই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে ভিন্ন দুই ধারা চোখে পড়ে। বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে দীর্ঘ পথ হাঁটছেন। অসংখ্যবার তিনি নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তবুও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অশালীন ভাষা বা শব্ধ ব্যবহার করেননি। গত বছরের ৫ আগস্ট মুক্তির পরও শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ না করে, রাজনৈতিক সৌজন্য বজায় রেখেছেন। তার শিষ্টাচার, ধৈর্য ও সহনশীলতা অনেকের কাছে এখনো রাজনৈতিক শালীনতার উদাহরণ। অন্যদিকে, পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রায়ই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা একজন রাষ্ট্রনায়কের কাছ থেকে অনাকাক্ষিত।

অতিতেও এমন অনেক নেতাই ছিলে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মূর্ত প্রতীক। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, খান এ সবুর, আনোয়ার জাহিদ, অদ্যাপক গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামী, আবদুল মান্নান ভুইয়া এমন বহু উদাহরন দেয়া যাবে। বর্তমান কালে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও সমিহের সাথে উচ্চারন করেন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কারণে বা শিষ্টাচারের রাজনীতির কারনে। সৈয়দ আশরাফ হোসেনকে তার প্রতিপক্ষরা রাজনৈতিক শিষ্টারের কারণে সমিহ করতে দ্বিধা করত না। কথায় কথায় প্রতিপক্ষকে নিম্নমানের শব্দ-বাক্যে তাচ্ছিল্য করে ওবায়দুল কাদের, হাছান মাহমুদ, হাসানুল হক ইনু, মাহাবুল হক হানিফরা নিজেরা একটা পর্যায়ে চূড়ান্তভাবে ক্লাউনে পরিণত হয়েছেন।

আজকের তরুণদের সামনে দুটি পথ একটি সংযম, শিষ্টাচার ও উদারতার; অন্যটি অহংকার, প্রতিহিংসা ও তাচ্ছিল্যের। তারা যাকে অনুসরণ করবে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ তেমনই হবে। নেতৃত্ব যদি প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করে, তবে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু নেতৃত্ব যদি সমঝোতার ভাষা চেনে, তবে জাতি এগিয়ে যায়। জাতির কাছে সেই নেতৃত্বই কাম্য, যারা মতবিরোধ সত্ত্বেও সম্মান দেখাতে পারেন। যেখানে অহংকার নয়, থাকতে হবে বিনয়। কোনো প্রতিহিংসা নয়, সহমর্মিতা প্রকাশ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অতিতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর ২০২৪ এর আন্দোলনের পরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক হবে না।

শিষ্টাচারহীনতা, ভাষাগত বিকারগ্রস্ততার করুণ পরিণতি তো মাত্র অল্প সময়ের পূর্বের ঘটনা। সেই সকল ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহন না করে গজবের মতো রাজনৈতিক শিষ্টারচার বর্হিভূত শব্ধের নতুন চাষাবাদ চলছে। তাও আবার এক সময়ের সেই মার্জিত-সাহসীদের মুখে-আচরণেও। স্কুলশিক্ষার্থীদের রাষ্ট্র মেরামত আন্দোলনের স্লোগান কী মার্জিত-রুচিসম্মত-সৃজনশীলই না ছিল । ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমিই বাংলাদেশ’। যা মানুষের চিন্তা জগতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্লোগানও ছিল বুদ্ধিদীপ্ত। ‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে, হয়ে গেলাম রাজাকার’। ‘আমার খায়, আমার পরে, আমার বুকেই গুলি করে’, ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’। ‘বন্দুকের নলের সাথে ঝাঁজালো বুকের সংলাপ হয় না’।

ইদানিং বাংলাদেশে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দকে বিভিন্ন বক্তৃতায় টকশোতে পরনিন্দা চর্যায় মেতে উঠতে দেখা যায়। একে অপরকে আক্রমণ করে যাচ্ছেন, শব্ধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে শালিনতাকে পরিহার করছেন। ফলে রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারণ মানুষের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হচ্ছে। তৃতীয়পক্ষ ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছে। রাজনীতিতে মতভেদ থাকবে, মতপার্থক্যও থাকবে, তবে শত্রুতা নয়। আক্রমণ নয় বরং ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে হবে। রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ধারক ও বাহক হয়ে উঠতে পারলে রাজনীতিবিদরা বাস করতে পারবেন মানুষের মনিকোঠায়। হয়ে উঠতে পারবেন অবিসংবাদিত নেতা। সমালোচনা হতে হবে শালীনতা বজায় রেখে।

Related Articles

Back to top button