মতামত

ইউটিউব বা ফেসবুক মালিকের কি কোনো জবাবদিহিতা বাংলাদেশে আছে?

অমিও ঘটক পুলক : সংবাদপত্র বা অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোর সংবাদ, বুলেটিন ও টকশো প্রচারে আপত্তি দেওয়ার সময় টেলিভিশন মালিকরা এতটুকুও লজ্জা পেল না? মিডিয়ার লোক হয়ে তারা কিভাবে তাদের প্রতিযোগী অন্য মিডিয়ার উপর বাধা আরোপ করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দেয়? তারা বুঝল না, এটা তাদের নিজেদের দুর্বলতা? তারা দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী সমৃদ্ধ তথ্যপণ্য উৎপাদন করতে পারছেন না – এটা তাদের নিজেদের ব্যর্থতা। তাদেরকে ভাল কিছু করেই প্রতিযোগিতায় টিকতে হবে; অন্যদের উপর বাধা আরোপ করে নয়।
তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদ বলেছেন, “আমরা কোনো তদন্ত ছাড়াই পত্রপত্রিকার অনলাইন ভার্সনগুলোর নিবন্ধন দিয়েছিলাম এই শর্তে যে, পত্রিকায় যে সংবাদ প্রকাশ পায় সেটিই অনলাইনে প্রকাশ পাবে, সেটিও ভিন্ন হওয়ার কথা নয়।”
এটা কেমন শর্ত মাননীয় মন্ত্রী? ইন্টারনেটের যুগে যখন যে ঘটনা ঘটবে তখনই তা পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সুতরাং পত্রিকার ওয়েবসাইটে সারাদিন, সারাক্ষণ সংবাদ ও পর্যালোচনা প্রচার করতে হবে। ২৪ ঘন্টা পর রাতে যে পত্রিকাটি ছাপা হবে, সেখানে শুধু বাছাই করা বিষয়গুলোই থাকবে। এটাই স্বাভাবিক।
সংবাদপত্রগুলোর অনলাইন পাঠকরা শুধু তাদের ছাপা সংস্করণের সংবাদ ছাড়া আর কিছু পাবে না – এরকম ভাবনা আপনারা কিভাবে ভাবেন? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের তথ্য জানার অধিকারকে এবং সংবাদক্ষেত্রের প্রকাশনা সামর্থ্য ও অধিকারকে এভাবে সীমিত করে দেওয়ার কথা কি ভাবা যায়?
মন্ত্রী বলেছেন, “সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (এটকো) নেতৃবৃন্দ আমাদের নজরে এনেছেন যে, কিছু পত্রিকার অনলাইন ভার্সন ও সংবাদ পোর্টাল অনলাইনে ‘টক শো’ এমনকি কেউ কেউ নিউজ বুলেটিনও প্রচার করছে যার কোনো অনুমতি নেই। আমরা দেখেছি যে, অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের দুই, চার ও ছয় উপধারার বিধান অনুসারে তারা এ ধরনের কিছু প্রচার করতে পারে না।”
যদি তাই হয়ে থাকে তবে গণমাধ্যম নীতিমালার ঐ দুটি উপধারা সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার জন্য প্রতিবন্ধক ও অধিকার হরণকারী। উপধারা দুটি সংশোধন করুন। আইনের সীমাবদ্ধতা থাকলে আইন সংশোধন করবেন; অধিকার হরণ করবেন না।
ফেসবুক এবং ইউটিউব দুটোই ওয়েবসাইট। এই দুটি ওয়েবসাইট বাংলাদেশে যত স্বাধীনতা উপভোগ করে, বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যমও কি তা করতে পারে? ইউটিউব বা ফেসবুক মালিকের কি কোনো জবাবদিহিতা বাংলাদেশে আছে? এই দুটি মাধ্যমে প্রকাশিত কোনো কন্টেন্ট যদি প্রলয়ঙ্করী হয়; যদি ফেসবুকের কারণে বাংলাদেশে প্রলয় হয়ে যায়; যদি মানুষকে হত্যা করা হয় অথবা মানুষের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়, তার কারণে কি ফেসবুক বা ইউটিউবের মালিককে ধরে আনতে পারবেন? কখনো ফেসবুক বা ইউটিউবকে কোনো দন্ড দিতে পেরেছেন?
একই কন্টেন্ট যদি বাংলাদেশের কোনো পত্রিকার বা টেলিভিশনের ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশ করা হয় তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে অনেকের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হবে। গ্রেপ্তার হতে হবে। প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে যাবে।
বিদেশী মালিকানাধীন ফেসবুক বা ইউটিউবকে যেমন স্বাধীনতা দিয়েছেন বাংলাদেশের মানুষের নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে সে রকম স্বাধীনতা দেওয়ার কথা কেন ভাবেন না? বাংলাদেশের মিডিয়া জগতের মানুষেরা নিজেরাও তাদের স্বাধীনতার ধারণাটি সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে কেন ভাবে না?
পৃথিবীতে কোটি কোটি ওয়েবসাইট আছে, যা বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রবাহকে অবারিত করেছে। এই ইন্টারনেটের প্রবেশ পথ চিকন না প্রশস্ত? প্রবেশ পথের কনসেপ্টই এখানে অচল। এর কোনো দরজা নেই, জানালা নেই – কোনও দেয়ালই নেই। যারা আইনের অধীশ্বর হয়েছেন, তারা যেন এই জায়গা থেকে তাদের নাগরিকদের অধিকারকে মূল্যায়ন করেন। আইন প্রণেতাদের সাথে দায়িত্বশীল মানুষ সমাজকেও বিষয়গুলো ভাবতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক (লেখাটি লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button