খেলা

আজমপুর শাস্তি পেলে পোয়াবারো নোফেলের!

বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশীপ লিগ ২০২২

স্পোর্টস রিপোর্টার : বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশীপ লিগ বা বিসিএলে পয়েন্ট তালিকায় ৩য় স্থানে আছে গতবারের প্রিমিয়ার লীগ থেকে অবনমন হয়ে খেলতে আসা নোফেল স্পোর্টিং ক্লাব। বাইলজ অনুযায়ি প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে থাকা ফর্টিজ ফুটবল ক্লাব ও উত্তরার আজমপুর ফুটবল ক্লাবের প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত হওয়ার কথা। কিন্তু চ্যাম্পিয়নরা ট্রফির সাথে সাথে প্রিমিয়ার নিশ্চিত করলেও ফিক্সিং অভিযোগে ঝুলে আছে আজমপুরের ট্রফি আর প্রিমিয়ারে উন্নীত হওয়ার ধাপ। আর তাই আজমপুরের শাস্তির দিকে তাকিয়ে আছে নোফেল। কেননা আজমপুরের বিরুদ্ধে পাতানো ম্যাচ খেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে এবং দলটিকে বড় ধরনের শাস্তি দেওয়া হলে কপাল খুলে যেতে পারে নোফেল স্পোর্টিং ক্লাবের। কারণ তারা আছে পয়েন্ট টেবিলের তৃতীয় স্থানে। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ থেকে দুটি দল উঠবে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে।

পেশাদার ফুটবলের জন্য ২০১২ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশীপ লিগ বা বিসিএল এর চলতি ২০২২ সালের আসর শেষ হয়েছে। গত ১৩ জুন শেষ ম্যাচ খেলেছে ফরাশগঞ্জ ও বাফুফে এলিট ফুটবল একাডেমি। এরই মধ্যে ৪৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থেকে লীগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ফর্টিস ফুটবল ক্লাব। কিন্তু পয়েন্ট তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থেকে লীগ শেষ করলেও ট্রফি পায়নি আজমপুর ফুটবল ক্লাব উত্তরা।

ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগ তোলা হয়েছে আজমপুরের বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে নিজেদের মতো করে দলকে ব্যবহার করতে না পেরে দলটির সাবেক কোচ সাইফুর রহমান মনি ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ করে গেছেন। তবে পুরো লিগে দলটি ১১টি ম্যাচে জয়, ৯টি ড্র এবং ২টি খেলায় হেরেছে। ৪২ পয়েন্ট নিয়ে তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থেকে লিগ শেষ করা কোন দলের বিরুদ্ধে সাধারণত এমন অভিযোগ দেখা যায়না।

ক্লাব সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা বলছেন, সাধারণত যেসব দল গড়াপেটায় যুক্ত থাকে তাদের অবস্থান হয় শেষ দিকে। কেনা বা বিক্রি যাই হোক না কেন সেটি যারা ভাল খেলতে চায় তাদের দ্বারা সম্ভব হয় না। তাই আজমপুরের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সেটির ভিত্তি একটু নড়বড়ে। তবে যেহেতু অভিযোগটি আমলে নিয়ে এরই মধ্যে বাফুফের এ সংক্রান্ত কমিটি তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে সেহেতু বিষয়টি তাদের দ্বারাই নিষ্ক্রান্ত হতে হবে।

এছাড়া ফুটবল অঙ্গণে একটা প্রশ্ন তীব্র যে, গেল বছর এপ্রিলে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ যখন তীব্র, তখন ওয়ারী ক্লাবের গোলরক্ষক সুজন চৌধুরী নিজের দলের বিপক্ষে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ তুললেও তদন্তের জন্য ডাকা হয়নি ওই ক্লাবের কাউকে। তাছাড়া না ডাকার কোন ব্যাখ্যাও দেয়নি বাফুফে। অপরদিকে আজমপুর ফুটবল ক্লাবকে ম্যাচ পাতানোর জন্য অভিযোগ করা দলটির কোচ সাইফুর রহমান ৮ ম্যাচ খেলেই পদত্যাগ করেছিলেন। তখন দলটির পয়েন্ট ছিল ১৩। শেষ ১৪ ম্যাচ খেলে দলটি পয়েন্ট তুলেছে ৪২। ফিক্সিংয়ে অভিযুক্ত আর কোন দলই এমন পারফর্ম করতে পারেনি।

আজমপুর ফুটবল ক্লাবের সভাপতি সাইদুর রহমান মানিক এ বিষয়ে বলেন, আমার প্লেয়ার এবং টিম ফেয়ার আছে। আমরা এসব অভিযোগে বিন্দুমাত্র বিচলিত নই। আমরা এখন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ  (বিপিএল) এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এটা ঠিক যে, তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থেকে লিগ শেষ করেও এখনো পর্যন্ত ট্রফি পাইনি এটা আক্ষেপের। তবে আমরা মনে করি অপেক্ষার ফল সুমিষ্ট হয়।

ক্লাবের ম্যানেজার ও ডিএনসিসি ৫০ নং ওয়ার্ড কাউন্সিল ডিএম শামিম বলেন, আমরা এই টিম নিয়েই কিন্তু ডিএনসিসি মেয়র কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। আমরা আসলে জেতার জন্যই খেলি। ফিক্সিং করতে চাইলে খেলতে আসতাম না। আমি আমার ক্লাব নিয়ে আগামীতে এএফসি কাপ পর্যায় পর্যন্ত খেলতে চাই। এছাড়া আমাদের দলের মনোবল চাঙা রাখতে আমরা আরো ভারতীয় লিগে খেলার উদ্যোগ নিচ্ছি।

জয় দিয়ে লিগ শেষ করে পয়েন্ট তালিকায় দ্বিতীয় স্থানই ক্লাবের পক্ষ থেকে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতি বড় প্রতিবাদ বলে মন্তব্য করেছেন সেক্রেটারি শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, ফিক্সিংয়ের মতো অভিযোগ নিয়ে আজমপুরের মতো পারফরমেন্স করা সম্ভব না এটি ফুটবল বোদ্ধারা একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন। তাই আমার দাবি আমার খেলোয়াড় ও ক্লাবকে আমাদের ট্রফি দিয়ে মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়া হোক। ইনশাআল্লাহ আমরা বিপিএল খেলতে পারলে সেখানেও অর্জন দিয়েই ষড়যন্ত্রকারীদের উত্তর দেব।

ফিক্সিংয়ের বিষয়টি জেনে ট্রফি হাতে না পেয়ে খেলোয়াড়রা হতাশ হলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন বাফুফের উচিত সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দেয়া। যাতে করে ভবিষ্যতে আর কেউ  কোন ক্লাব বা ফুটবল নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে।

শনিবার চ্যাম্পিয়ন ফর্টিস ফুটবল ক্লাবকে ট্রফি প্রদান করে বাফুফের সিনিয়র সহসভাপতি ও প্রফেশনাল লিগ কমিটির চেয়ারম্যান আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেছেন, ‘ক্লাবটির বিপক্ষে পাতানো খেলার যে অভিযোগ উঠেছে, তার তদন্ত চলছে। তদন্ত চলমান অবস্থায় তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না। আশা করি, এ মাসের মধ্যেই পাতানো ম্যাচ সনাক্তকরণ কমিটি একটা রিপোর্ট দেবে। সেই রিপোর্টের পরই আমরা রানার্সআপ দল ঘোষণা করবো।’

মিডিয়ার রিপোর্টে ফর্টিজের এক কর্মকর্তা তার খেলোয়াড়রা ম্যাচের আগে ফলাফল জানে বলে মন্তব্য করেছিলেন। বাফুফে সেই কর্মকর্তা এবং ফর্টিজের কোনো ফুটবলারকে তদন্তের আওতায় না আনায় ফুটবলাঙ্গনে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে নোফেল স্পোটিং ক্লাব পয়েন্ট তালিকায় পিছিয়ে পড়ে মিডিয়াকে ব্যবহার করে ষড়যন্ত্র করে আজমপুরের বিরুদ্ধে ফিক্সিং ইস্যুকে রং চড়িয়েছে তারা। নোফেলের পক্ষে কাজ করছেন বিএনপির ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রার্থি তাবিথ আউয়াল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রভাব খাটিয়ে তিনি আজমপুরকে সরিয়ে নোফেলকে পুনরায় বিপিএলএ উন্নীত করতে কলকাঠি নাড়ছেন। উল্লেখ্য, গত বিপিএল থেকে অবনমন হয়ে দ্বিতীয় স্তর তথা বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশীপ লিগ বা বিসিএল-এ নেমে আসে এবারের লিগে পয়েন্ট তালিকায় ৩য় স্থানে থাকা নোফেল ।  দলটির বিরুদ্ধে বিপিএল-এ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ ছিলো।

বাইলজ অনুযায়ী চ্যাম্পিয়নশীপ লিগের সর্বনিম্ন দুই দল সিনিয়র ডিভিশনে অবনমিত হবে। কাওরান বাজার অনেক আগেই রেলিগেশনে পড়েছে। ফরাশগঞ্জের সুযোগ ছিল এড়ানোর কিন্তু ওয়ারীর হারে আরেক ধাপ নিচে নেমে যেতে হচ্ছে পুরান ঢাকার ক্লাবটির।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ২০০৭ সালে দেশের প্রথম পেশাদার ফুটবল লিগ চালু করে। ২০০৭-২০১০ পর্যন্ত দেশের একমাত্র পেশাদার লিগে অবনমনের নিয়ম না থাকায় নতুন ক্লাবের আগমন হচ্ছিল না; লিগটির মান নিম্নমুখী হচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে ২০১১ সালে পেশাদার ফুটবল লিগের দ্বিতীয় স্তর আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় বাফুফে। ফলাফল সরূপ মার্চ, ২০১২ হতে প্রিমিয়ার লিগের সাথে সাত দল নিয়ে ২য় স্তরের এই পেশাদার লিগ প্রথম বারের মত চালু করা হয়। কক্স সিটি স্পোর্টিং ক্লাব প্রথম মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন হয়। বাফুফের অন্তর্ভুক্তিমুলক নীতির কারণে পরবর্তী মৌসুম গুলিতে দলের সংখ্যা বাড়তে থাকে।  ২০১৮-১৯ মৌসুমে এগারোটি দল অংশগ্রহণ করে। এবার ছিল ১২টি দল। এর মধ্যে প্রথমবারের মতো খেলেছে আজমপুর ফুটবল ক্লাব উত্তরা। দল গঠনে চমক দেখিয়ে প্রথমবারই তারা জায়গা করে নিতে চলেছে বিপিএল এর আসরে।

২০১২ মৌসুমে শুধু চ্যাম্পিয়ন দলকে বিপিএল-এ উন্নীত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়, পরবর্তী মৌসুম হতে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স-আপ দলকে বিপিএল-এ উন্নীত হওয়ার নিয়ম করা হয়। ২০১২ ও ২০১৫ মৌসুমে কোন দল অবনমিত হয়নি, বাদবাকী মৌসুমগুলিতে পয়েন্ট তালিকার সর্বশেষ এক বা দুই দলকে নিচের স্তরের লিগে অবনমনের নিয়ম চালু রয়েছে। বাফুফে-এর অন্তর্ভুক্তিমুলক নীতির কারণে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা এখনো নির্দিষ্ট নয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button