অর্থনীতি

পোশাক খাতে বিপুল রপ্তানির হাতছানি

টাইমস ২৪ ডটনেট: করোনা সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত। বাড়ছে রপ্তানি আয়। বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের কারণে চিন্তিত ছিলেন পোশাক মালিকরা। মাঝে সংক্রমণ কমলেও দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ইউরোপের দেশগুলোতে পোশাকের ক্রয়াদেশ থেমে গিয়েছিল। যদিও রপ্তানিতে এর প্রভাব তেমন পড়েনি। বরং এরইমধ্যে শঙ্কা কাটিয়ে উঠেছে দেশের রপ্তানি আয়ের শীর্ষ খাতটি। শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে আগামীতে আরও বিপুল পোশাক রপ্তানির হাতছানি দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশকে তাদের ভালো সোর্সিং হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে আমদানি আরও বাড়ানোর কথা বলছেন। একইসঙ্গে পোশাক রপ্তানি বাজারে চীনের একক আধিপত্যও যখন কমছে, তখন বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার মাধ্যমে ক্রেতাদের বাংলাদেশমুখী করতে গুরুত্ব দিচ্ছেন পোশাক মালিকরা।“চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৩৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৬ শতাংশ।অর্থবছর শেষে আমাদের রপ্তানি ৪১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছি।” তারা মনে করছেন, গত কয়েক বছরে কমপ্লায়েন্সের মানদণ্ডে বাংলাদেশের যে বিপুল অগ্রগতি হয়েছে, সে তথ্য এখনো বিশ্বের পোশাক খাত সংশ্লিষ্টদের কাছে সঠিকভাবে যাচ্ছে না। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি কিংবা তার পূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশের পোশাক খাতের চিত্র এখনো তাদের মনে গেঁথে আছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দরাদরিতে এখনো পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের পোশাক খাতের ইতিবাচক দিক বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে বিশ্বের পোশাক খাতের ব্র্যান্ড, বায়ার, ফ্যাশন জায়ান্টসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে ঢাকায় সপ্তাহব্যাপী বড় আকারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ উইক-২০২২’- আয়োজন করতে যাচ্ছে পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং আন্তর্জাতিক অ্যাপারেল ফেডারেশন (আইএএফ)।
তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে এ ধরনের বিশাল আয়োজন বাংলাদেশে এই প্রথম। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের নভেম্বরে এই আয়োজনের উদ্বোধনের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। আইএএফ পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্য ছাড়াও ৪০টি দেশের পোশাক শিল্প সমিতির নেতা, শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড, রিটেইলার, সরবরাহকারী (সাপ্লায়ার্স) এবং বিশেষজ্ঞরা এতে অংশ নেবেন। পাঁচদিনের ওই অনুষ্ঠানে চার দশকে বাংলাদেশের পোশাক খাতের অগ্রগতির গল্প তুলে ধরা হবে। বিশেষত ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর কীভাবে এ খাত নন-কমপ্লায়েন্ট থেকে বিশ্বের অন্যতম কমপ্লায়েন্ট ও গ্রিন কারখানার হাব হয়ে উঠছে, তা তুলে ধরা হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের ওইসব কারখানা ঘুরে দেখানো হবে। একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে আইএএফ কনভেনশন, বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সপো, ডেনিম এক্সপো, ঢাকা অ্যাপারেল সামিট, ওয়ার্কশপ, সেমিনার, ফ্যাশন শো, এনবিআর ও ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডের মতো আরও অনেক অনুষ্ঠান।
বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি মো. শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, মেড ইন বাংলাদেশ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যান্ডিং করা। এখানে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যায়ের বায়াররা আসবেন। আমাদের খাতের ইতিবাচক দিকগুলো তাদের কাছে তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। এটা করতে পারলে আগামীতে আমাদের রপ্তানি আরও বাড়বে। তিনি বলেন, চায়নার কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে একটা ট্রেড গ্যাপ আছে। তবে আমাদেরও চায়নার সঙ্গে পার্থক্য অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে চায়নার শেয়ার হলো ৩১ শতাংশ, আর আমাদের মাত্র ৭ শতাংশ। অনেক বড় একটা গ্যাপ। এই গ্যাপটা আমরা পূরণ করতে চাই। অবশ্য সারা বিশ্বে চায়নার পরেই বাংলাদেশকে চিন্তা করে। এই দিকটা আমরা আরও ভালোভাবে নিয়ে আসতে চাই। এরসঙ্গে আমাদের আরও কিছু কাজ আছে। যেমন আমাদের অবকাঠামোগুলো বড় করতে হবে। ব্যবসা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামোগুলোও উন্নয়ন করতে হবে। এগুলো করতে পারলে সামনে আমাদের আরও বিপুল রপ্তানির সুযোগ আছে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের অগ্রগতি, উচ্চ মূল্যের পোশাক তৈরিতে সক্ষমতার চিত্র বিশ্ববাজারে সঠিকভাবে তুলে ধরা গেলে দরের ক্ষেত্রেও আমরা আরও ভালো অবস্থানে থাকতে পারবো। আমরা বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রকৃত চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করতে চাই। এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে জাতি হিসেবে আমাদের অর্জন এবং গত ৪০ বছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরতে আমরা সপ্তাহব্যাপী ‘মেইড ইন বাংলাদেশ উইক’-এর আয়োজন করছি। আশা করছি, এর মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের পোশাক রপ্তানি আরও বাড়াতে সক্ষম হবো। মেইড ইন বাংলাদেশ উইক পোশাক শিল্পের আকর্ষণীয় ইতিবাচক দিকগুলো উপস্থাপন করবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে বিশ্বে একটি নিরাপদ, টেকসই এবং প্রতিযোগিতামূলক শিল্প হিসেবে অবস্থান শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে। বিজিএমইএ সভাপতি জানান, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৩৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৬ শতাংশ। অর্থবছর শেষে আমাদের রপ্তানি ৪১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছি। ফারুক হাসান বলেন, ২০২০ সালে বিশ্ববাজারে আমাদের পোশাকের শেয়ার ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ।
২০২১ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭ শতাংশ। চলতি বছরে (২০২২ সাল) তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অতিক্রম করবে। আর ২০২৫ সাল নাগাদ এই শেয়ার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি। ফারুক হাসান আরও বলেন, আমরা নির্দিষ্ট মাত্রার প্রবৃদ্ধি এবং গতি অর্জন করেছি, তাই এখন আমাদের প্রবৃদ্ধির পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার সময় এসেছে। আমাদের অগ্রগতি এবং সম্ভাবনাগুলো পাশ্চাত্যের কাছে আমাদেরকে অন্যতম সাসটেইনেবল সোর্সিং পার্টনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং এই অবস্থান ধরে রাখতে আমাদেরকে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প: বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্প যাত্রা শুরু করে ষাটের দশকে। তবে সত্তরের দশকের শেষের দিকে রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে এই শিল্পের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিমুখী শিল্পখাত। স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্‌যাপন করেছে বাংলাদেশ। এই সময়কালে বাংলাদেশের পোশাক খাতের সাফল্যের কথা অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বার বার সামনে এসেছে।
বিশ্ববাজারে পোশাক কেনার গতি করোনাকালে কিছুটা স্থবির হলেও পরবর্তীতে এর ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি নতুন নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের ঘুরে দাঁড়ানো এবং রপ্তানি আয়ের উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধির খবর প্রায়ই ফলাও করে ছাপা হচ্ছে পত্রিকায়। সামপ্রতিক সময়ে পোশাক খাতের রপ্তানি আয় বৃদ্ধিকে কেউ বলছেন বড় চমক, কেউ বা বলছেন বিরাট বিস্ময় বা উল্লম্ফন কিংবা এ খাতে বইছে সুবাতাস। যদিও করোনাকালে দুর্দিনে পড়েছিল পোশাক খাত। সেখান থেকে ঘুরে দঁড়ানোর গল্প খুব সহজ ছিল না। এসময় প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছিলেন। বন্ধ হয়েছিল বহু কারখানা। শ্রমিকদের বেতন-বোনাস, লে-অফ, ছাঁটাই, বেতন না পাওয়া ছিল সেই সময়ের বৈশিষ্ট্য। ওই সময় বাতিল হয়েছে ৩ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার। পরিস্থিতি কিছুটা সামলে উঠলে বড় অংশের অর্ডার ফেরতও আসে। কাজহারা শ্রমিকরাও অনেকে ফেরত পান কাজ।
করোনার সময় যখন সরকারি- বেসরকারি কর্মকর্তারা ছুটিতে ছিলেন, তখন শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছেন। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক বর্তমানে পোশাক খাতে নিয়োজিত আছেন। পরোক্ষভাবে যুক্ত আরও ১০ লাখ। এদের পরিবারের সংখ্যা ধরলে মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই এখানে যুক্ত। বাংলাদেশের রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩১.৪৫ বিলিয়ন ডলারের। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। খাত সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, জুন শেষ নাগাদ তা ৪২ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া পোশাকের মূল রপ্তানিকারক চীন ধীরে ধীরে পোশাক রপ্তানি থেকে বেরিয়ে আসায় বাংলাদেশের সামনে আগামী দিনগুলোতে অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সূত্র:মানবজমিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button