অন্যান্যঅর্থনীতিচলতি সংবাদ

বাংলাদেশে আমদানির চাপে কমছে রিজার্ভ

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : বাংলাদেশে একদিকে আমদানির চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে। এর ফলে প্রতিনিয়ত কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য বাড়ছে। এমন অবস্থায় সতর্কতার অংশ হিসেবে সরকারি ব্যয়ে লাগাম টানার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাপী অস্বাভাবিক সময় চলছে। এই সময়ে অহেতুক ব্যয় করতে চাইছে না সরকার। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী মহামারীর মধ্যে অপ্রত্যাশিত উল্লম্ফন হয়েছিল প্রবাসী আয়ে। অর্থনীতির প্রতিটি সূচক বিধ্বস্ত হলেও চাঙ্গা ছিল রেমিট্যান্স প্রবাহ।
জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবাসীরা রেকর্ড ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩৬ শতাংশেরও বেশি। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির রথ থেমে গেছে। উল্টো অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অপ্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ন্যূনতম ২৫ শতাংশ এলসি মার্জিনের নির্দেশনা দিয়েছে। তবে এই নির্দেশনাই যথেষ্ট নয়। আয়ের জন্য ব্যাংকগুলো নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে নির্দেশনা অমান্য করে এলসি খুলছে কিনা দেখতে হবে। আবার আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং এবং রপ্তানিতে আন্ডার ইনভয়েসিং হচ্ছে কিনা দেখতে হবে। আবার ব্যাংকের ডলার ক্রয় ও বিক্রয়ের মধ্যে যেন বড় ব্যবধান না থাকে, তা তদারক করতে হবে। এ ছাড়া বিদেশি পরামর্শকসহ অন্যান্য ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে আমদানি প্রায় ৪৭ শতাংশ বেড়ে পাঁচ হাজার ৪৩৮ কোটি ডলার হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি ৩০ শতাংশ বেড়ে তিন হাজার ২০৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এই দুইয়ের ব্যবধান কমানোর অন্যতম উপাদান রেমিট্যান্স ২০ শতাংশ কমে এক হাজার ৩৪৪ কোটি ডলারে নেমেছে। এতে করে চলতি হিসাবে রেকর্ড এক হাজার ২৮৩ কোটি ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে উদ্বৃত্ত ছিল ৮২ কোটি ডলার। তবে একই সময়ে বিদেশি ঋণ ব্যাপক বেড়েছে। শুধু মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৫৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫৭৪ কোটি ডলার। যে কারণে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনে ঘাটতি ২২২ কোটি ডলারে নেমেছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি সামাল দিতে বিলাসসামগ্রী আমদানি কমানোর ওপর জোর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ১১ এপ্রিল এক নির্দেশনার মাধ্যমে জ্বালানি, অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্য, ওষুধসহ কিছু পণ্য ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে ন্যূনতম এলসি মার্জিন ২৫ শতাংশ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আগে যে কোনো এলসির বিপরীতে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে মার্জিন নির্ধারিত হতো। আবার গত ৪ এপ্রিলের এক
নির্দেশনার মাধ্যমে ডলার বন্ডের সুদ কমিয়ে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সুদহার কমানো হয়েছে। এতে করে সুদ বাবদ খরচ কমবে। নতুন করে বেশি ডলার বিনিয়োগের সুযোগ মিলবে। এর আগে প্রবাসী আয় বাড়াতে গত ১ জানুয়ারি থেকে রেমিট্যান্সে প্রণোদনার হার ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আড়াই শতাংশ করেছে সরকার। এ ছাড়া রপ্তানি বাড়াতে নানা উদ্যোগ চলমান।
রাষ্ট্রীয় মালিকানার অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, সাধারণভাবে ১০ শতাংশ মার্জিনে এলসি খোলা হয়। অতি প্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের বাইরে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ মার্জিনের নির্দেশনার ফলে এখন কিছুটা হলেও আমদানিতে রাশ টানবে। এ ছাড়া এখন এমনিতেও আমদানি কিছুটা কমবে। কেননা রমজানের কারণে খেঁজুর, চিনি, ছোলাসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি বেশি হয়। রপ্তানির সঙ্গে আমদানির ব্যবধান অনেক বৃদ্ধিতে এসব পণ্য কিছুটা ভূমিকা রেখেছে। ফলে আগামীতে হয়তো এমন পরিস্থিতি থাকবে না।
এ দিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য ও জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। তবে সে হারে বৃদ্ধি পায়নি রপ্তানি আয়। ফলে এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বেড়ে গেছে ডলারের দাম। চরম ডলার সংকট দেখা দিয়েছে ব্যাংক খাতে। এলসি মূল্য পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছে কিছু কিছু ব্যাংক।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ডলার সংকট চতুর্থ প্রজšে§র ব্যাংকগুলোয়। বিভিন্ন কারণে এসব ব্যাংকের রপ্তানি বাণিজ্যের অগ্রগতি ঘটেনি। আমদানিতেও অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় তারা পিছিয়ে। ডলার সংকটের কারণে ঋণপত্র খুলতে বিড়ম্বনায় পড়ছে ব্যাংকগুলো। তবে যেসব ব্যাংকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেশি তাদের কাছে পর্যাপ্ত ডলার আছে। এর বিপরীতে পর্যাপ্ত রেমিট্যান্স না আসায় ডলার সংকটে পড়েছে তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে রেমিট্যান্স সংগ্রহে সবচেয়ে এগিয়ে ইসলামী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ও সাউথইস্ট ব্যাংক। অন্যদিকে রেমিট্যান্স সংগ্রহে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন, পদ্মা, এনআরবি, মিডল্যান্ড, মধুমতি, মেঘনা, গ্লোবাল ইসলামী, এনআরবি কমার্শিয়াল ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচাল অ্যান্ড কমার্স।
ডলারের প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের শরণাপন্ন হচ্ছে অনেক ব্যাংক। তাতেও সংকট কাটছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনছে কিছু ব্যাংক। কিন্তু আবেদন করেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অনেক ব্যাংক ডলার পাচ্ছে না, এমন অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি অবহিত করার জন্য গভর্নরের কাছে চিঠিও পাঠিয়েছে একটি ব্যাংক।
জানা গেছে, গত অর্থবছর বিভিন্ন ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত ডলার থাকায় তাদের কাছ থেকে রেকর্ড ৭৯৪ কোটি ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে একের পর এক রেকর্ড হতে থাকে। গত বছরের জানুয়ারিতে ৪২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার থেকে আগস্টে রিজার্ভ দাঁড়ায় ৪৮ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলারে। অথচ এখন তা ৪১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমেছে। গত মঙ্গলবার এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে (আকু) ২২৪ কোটি ডলারের দায় পরিশোধের পর রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ব্যাংকিং চ্যানেলে গত ২২ মার্চ প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৬ টাকা। এরপর কয়েক দফায় দাম বাড়ানো হয়। আর গত সোমবার তা বাড়িয়ে ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। তবে ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের থেকে প্রতি ডলারের বিপরীতে ৯২-৯৩ টাকা আদায় করছে। ৯৫ টাকা নেয়ার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ, যদিও ব্যাংকগুলোর ঘোষিত দামে তা উল্লেখ নেই।
গত মঙ্গলবার অর্থনৈতিক বিষয়ক ও ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিশ্বব্যাপী অস্বাভাবিক সময় চলছে। এই সময়ে অহেতুক ব্যয় করতে চাইছে না সরকার। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ে সরকার সতর্ক। এজন্য বিলাসী পণ্যের আমদানিও যাতে কম হয় সে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বেড়ে গেছে বলে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন বিশেষ কোনো প্রয়োজন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে অনুমতি দেয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সরকারি কর্মকর্তাদের এখন থেকে বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি দেয়া হবে না। তবে বিশেষ কোনো প্রয়োজন হলে অনুমতি সাপেক্ষে বিদেশ যেতে পারবেন। এখন যারা বিদেশ যাচ্ছেন তাদেরকে আগেই অনুমতি দেয়া হয়েছিল জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, নতুন করে কাউকে অনুমতি দেয়া হচ্ছে না।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগাম সতর্কতা : কম গুরুত্বপূর্ণ আমদানি নির্ভর প্রকল্পের বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। বলেন, সময়ে সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমরা এতদিন যেভাবে চলছিলাম, সারা বিশ্বের যে অবস্থা, তাতে লাগাম টেনে ধরতে হচ্ছে। বিশ্বের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করতে হবে। বিশ্বের যে সামগ্রিক অবস্থা, তা বিবেচনায় নিয়ে এসব সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
ব্যয়ের লাগাম টানছে সরকার : আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় চাপের মুখে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। বাণিজ্য ঘাটতি ২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ঘাটতি ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে ডলারের দাম বেড়েই চলেছে। মঙ্গলবারও যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের বিপরীতে টাকার মান ২৫ পয়সা কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারেই এখন এক ডলারের জন্য ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা খরচ করতে হচ্ছে। ওদিকে দেশের ব্যাংকগুলো ডলার বিক্রি করছে ৯২ থেকে সাড়ে ৯২ টাকায়। খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৯৩ টাকায়।
বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে সতর্কতা: সারা বিশ্বে করোনা পরিস্থিতির উন্নতিতে অর্থনীতির চাকা সচল হওয়ার পর বাংলাদেশের রপ্তানি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে আমদানি। রপ্তানির চেয়ে আমদানি ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি। এতে চাপ পড়ছে রিজার্ভে। আর ডলার সংকটে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এই মুদ্রার দাম যাচ্ছে বেড়ে। এতে খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ দেশে আনার ক্ষেত্রে খরচ বাড়ছে। এটিও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির একটি কারণ।

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button