জাতীয়সারাদেশ

ঢাকার জনজীবন দুর্বিষহ

টাইমস ২৪ ডটনেট: দিনে দিনে প্রাচ্যের নগরী ঢাকা এখন সীমাহীন ভোগান্তির অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন বাসিন্দারা। সমস্যার পাহাড় জমে রীতিমতো নাগরিক দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, পরিবেশের বিপর্যয়, মশার উপদ্রব, খাদ্য ও পণ্যসামগ্রীর ভেজালে ঢাকাবাসীর জীবন শঙ্কিত করে ফেলেছে। তার উপর রয়েছে পথে পথে যানজট, গ্যাস স্বল্পতায় টিমটিম চুলা, বিশুদ্ধ জলের জন্য হাহাকার, ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধময় রাস্তাঘাট, মেরামতের নামে নগরজুড়ে রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি, উন্নয়নের ধকল, জলবদ্ধতা, একদিকে যানবাহন সংকট অন্যদিকে লাখ লাখ রিকশার রাজত্ব, ভাড়া নিয়ে হট্টগোলসহ ঘর থেকে বেরোলেই আরো শতেক জঞ্জাল-যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হয় নগরবাসীকে। সবমিলে দুর্বিসহ হয়ে উঠছে নগরের জন-জীবন।

মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ নগরবাসী: রাজধানীজুড়েই মশার উপদ্রব বাড়ছেই। কীটতত্ত্ববিদদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে মশার ঘনত্ব বেড়ে চারগুণ হতে চলেছে। ফলে কয়েল জ্বালিয়ে কিংবা ওষুধ ছিটিয়ে মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, মশার ঘনত্ব যেভাবে উচ্চহারে বাড়ছে, তাতে মশাবাহিত বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে শিশুরা এসব রোগে বেশি আক্রান্ত হতে পারে। মশক নিয়ন্ত্রণে গতানুগতিক পদ্ধতির বাইরে নতুন কৌশল গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন তারা। এ সময় রাজধানীতে মশা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, শীত থেকে হঠাৎ গরম পড়া শুরু হয়েছে। ফলে বাতাসের আর্দ্রতা কমে গেছে। বৃষ্টির পরিমাণও কম। এতে মশার প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া একই রকম থাকলে চলতি মাসে মশার উপদ্রব আরো বাড়তে পারে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের অভিমত, নালা, ডোবা, পুকুর ও পরিত্যক্ত জলাশয়ের কচুরিপানা পরিষ্কার এবং মশা মারার ওষুধ কেনার জন্য প্রতিবছরে দুই সিটি কর্পোরেশনকে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও দুই সংস্থাই নামকাওয়াস্তে কিছু কাজ করে বাকি টাকা কৌশলে লুটপাট করছে।

সঠিকভাবে ডোবা, জলাধার পরিষ্কার করা হচ্ছে না। মানহীন মশার ওষুধ কেনার কারণে ওই ওষুধে কাজ হচ্ছে না। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মশকনিধন কর্মীরা মানহীন ওই ওষুধও নিয়ম মেনে ছিটায় না। বাইরে এসব ওষুধ বিক্রি করে দেয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং মশকনিবারণী বিভাগ মিলিয়ে রাজধানীতে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে প্রায় এক হাজার মশক নিধন শ্রমিক। নিয়ম অনুযায়ী এসব শ্রমিক সকালে লার্ভা নিধনে ড্রেনে বা জল জমে এমন জায়গায় ওষুধ ছিটাবে এবং বিকালে উড়ন্ত মশা মারতে ফগার মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটাবে। প্রত্যেক এলাকায় প্রতিদিন সকাল-বিকাল এ কার্যক্রম করার কথা থাকলেও কালেভদ্রে চোখে পড়ে মশকনিধন কর্মীদের চেহারা। সবুজবাগের মুগদা এলাকার বাসিন্দারা জানান, সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন শ্রমিকদের সকাল-বিকাল দু’বার মশক ওষুধ ছিটানোর কথা থাকলেও তারা সেটা করেন না। মাসে সর্বোচ্চ দু’বার দেখা মিলে মশকনিধন শ্রমিকদের। একইকথা বলেছেন নগরের বেশিরভাগ মানুষ।

নগরজুড়ে দখলের রাজত্ব: প্রভাবশালীদের দখলদারিত্বে গোটা রাজধানীজুড়েই তৈরী হয়েছে হাট-বাজার। পুরান ঢাকার নর্থ-সাউথ রোডের অর্ধেকটা অনেক আগেই দখল করে নিয়েছে সংলগ্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। সিদ্দিকবাজার থেকে ইংলিশ রোডের মোড় পর্যন্ত সড়কে রড-সিমেন্ট, আসবাবপত্রের দোকানের মালামাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা। সেখানে মাত্র ৩/৪ হাত সড়ক ফাঁকা রেখে মালামাল লোড- আনলোডের জন্য পাশেই পার্কিং করা থাকে সারি সারি মিনিট্রাক, ঠেলা গাড়ি। রাস্তা দখল করে রাখার জন্য কোনো যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না। কমলাপুর স্টেডিয়াম থেকে মুগদা-বৌদ্ধমন্দির গেট পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যস্ততম বিশ্বরোডে দুই সারিতে গাড়ি রাখা হয়। বিভিন্ন কাউন্টার সার্ভিস বাস, কোচ, ট্রাক, লং ট্রেইলারসহ পণ্যবাহী গাড়িগুলো সারিবদ্ধভাবে পার্কিং করে রাখায় ওই চার কিলোমিটার এলাকা দিনভর ভয়াবহ যানজট লেগে থাকে।

নিউ মার্কেট ও নীলক্ষেত এলাকার ফুটপাত আর ফুটওভারব্রিজ জুড়ে রয়েছে হকারদের আধিপত্য। দোকান বসিয়ে পুরো ব্রিজকেই বাজার বানিয়ে ফেলা হয়েছে। গাউসিয়া মার্কেটের সামনে রাস্তা সারাক্ষণই ময়লা- আবর্জনার স্তূপ পড়ে থাকে। বঙ্গবাজারের সামনে থেকে শুরু করে গুলিস্তান-কাপ্তানবাজার পর্যন্ত রাস্তাটি ডাস্টবিন, বাজার, নাকি টার্মিনাল তা বোঝা মুশকিল। গ্যাস সংকটে নাকাল জন-জীবন: সম্প্রতি কিছু এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও গ্যাস সংকট এখন পুরো নগরজুড়েই। কোনো এলাকায় দুপুরের পর গ্যাস আসে। আবার কোনো কোনো এলাকায় আসে রাতে। যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, মুগদা, বাসাবো, সবুজবাগ এলাকায় বাসিন্দাদের রান্না করতে হয় গভীর রাতে। রাত ছাড়া গ্যাসের দেখা মেলে না।

সবচেয়ে বেশি সমস্যায় আছে বহুতল ভবনের বাসিন্দারা। যারা যত উঁচুতে থাকেন গ্যাস সমস্যা ভুগছেন তারা প্রত্যেকেই। পুরনো ঢাকার রহমতগঞ্জ লেন, নারিন্দা, মুশুরিখোলা, জেলখানা রোড, তাঁতীবাজার, শাখারিবাজার, কাজী আলাউদ্দিন রোডে সারাদিনই গ্যাস সরবরাহ থাকে, কিন্তু চুলা জ্বলে টিমটিম করে। বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্য হঠাৎ করেই রাজধানীতে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাসা-বাড়ি থেকে শুরু সিএনজি স্টেশনে গ্যাস না থাকায় দিনভর দুর্ভোগ আর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে নগরবাসীকে। এতে ক্ষোভও জানিয়েছেন তাঁরা। তবে গত রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের স্বল্প চাপের সৃষ্টি হতে পারে। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা মেরামতের কাজ করে যাচ্ছেন। দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে আশা করা যাচ্ছে।

জলের জন্য হাহাকার: ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমে যাওয়া, জলাশয় দখল, ওয়াসা কর্তৃপক্ষ নতুন পাম্প বসানোর জায়গা না পাওয়ায়, বেশিরভাগ স্থানে পানির লাইনগুলো পুরোনো হওয়ায়, পাইপ লাইনে ফাটল, এক জলের লাইনের সঙ্গে স্যুয়ারেজ লাইনের সংযোগ এক হওয়ায় ঢাকার মানুষ প্রতিদিনই জল সংকটে ভুগছে। কোনো কোনো এলাকায় ব্যবহার করতে হচ্ছে দুর্গন্ধ জল। বর্ষাকালের কিছুদিন জল সংকট কম থাকলেও সারাবছরই রাজধানীবাসীকে জল সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এর সাথে কোনো কোনো এলাকায় ড্রেনের জল ওয়াসার লাইনে ঢুকিয়ে দেয়ায় দুর্গন্ধযুক্ত পানি বের হচ্ছে। এ জল ফুটালেও দুর্গন্ধ দূর হয় না। তবে ওয়াসার পাম্প চলে সারাদিন। তবু দিনের বেলা জল পাচ্ছেন না উত্তর বাড্ডারএকটি অংশের বাসিন্দারা।

তারা জল পান শুধুমাত্র রাতের বেলায়। তাই ঘুম বাদ দিয়ে সেই জল জমিয়ে রাখতেই রাত পার করতে হয় এলাকাবাসীকে। যে জল আসে তাতেও থাকে ময়লা, দুর্গন্ধ। খাবার জল আনতে হয় কোন গভীর নলকূপ থেকে। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলছেন, মানুষের ভোগান্তি কমাতে রমজানে জরুরি সেবা চালু রাখবে ওয়াসা। ওয়াসার লাইন থাকলেও,সেই লাইনে জল থাকে না। গেলো এক মাস ধরে এই সমস্যায় ভুগছেন উত্তর বাড্ডার একটি অংশের বাসিন্দারা। জল না পেলেও ঠিকই মাস শেষে ওয়াসাকে বিল দিতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।এ কারণেই ক্ষুব্ধ এলাকাবাসি। তারা বলছেন, জলের দাম বাড়ালেও তাদের সংকট কাটেনি। বাড্ডার সেই এলাকার এক গৃহিনী ফরিদা বেগম। ক্ষোভের সঙ্গেই জানালেন,জল না পেলেও মাস গুণে বিল শোধ করতেই হচ্ছে। এ যেন শাখের করাত।

তার মতো ক্ষুব্ধ এলাকাবাসি বলছেন, পাশেই ওয়াসার জলের পাম্প থাকার পরও দিনের বেলা তারা জল পান না। কি কারণে পাওয়া যায় না, তার উত্তর নেই কারো কাছে। তাই, রাতে জল আসার পর মটর দিয়ে সেই জল টাঙ্কিতে তোলেন এলাকাবাসি।যাদের ট্যাংকি নেই, তারা নানা উপায়ে জল জমিয়ে রাখেন। কিন্তু পাম্প থাকার পরও কেন দিনের বেলা তারা জল পাচ্ছেন না এর কোনো উত্তর মিলছে না। পাম্পের দুটি মেশিন থেকে প্রতি মিনিটে ২,৮০০ লিটার জল সরবরাহের কথা বলছেন দ্বায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা। সারাদিন জলের পাম্পও চালু থাকে। কিন্তু জল পায় না সাধারণ মানুষ। কেবল বাড্ডাই নয়। গরম শুরুর পর এমন সমস্যা চলছে অনেক এলাকায়। এমন অবস্থায় রমজানে সমস্যা কবলিত এলাকাগুলোতে জরুরি সেবার দেয়ার কথা বলছে ওয়াসা।

কোথাও জল সংকটহলে ওয়াসার হট লাইনে ফোন দিলে মিলবে জল সেবা। নিজের বাড়ির জলেও গন্ধ বললেন তাকসিম: ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান বলেছেন, নয়াপল্টনে আমার নিজের বাসার জলেও গন্ধ আছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাব আবদুস সালাম হলে ‘নগরবাসীর চাহিদা-ঢাকা ওয়াসার সক্ষমতা’ শীর্ষক ‘ডুরা সংলাপে’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, আমাদের ৫ থেকে ১০ শতাংশ জায়গার মধ্যে পাইপ ফাটা থাকে। যখনই অভিযোগ পাই সঙ্গে সঙ্গে আমরা তা ঠিক করে দেই। তারপরও কিছু জায়গায় সমস্যা হয়। এ সময় তিনি নগরবাসীকে জল ফুটিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেন।

ডায়রিয়া পরিস্থিতি অবনতি: রাজধানীতে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েই চলেছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো প্রতিদিনই রেকর্ড ভাঙছে ডায়রিয়া রোগী ভর্তির সংখ্যা। বেশিরভাগ রোগীই খুব খারাপ অবস্থায় জল শূন্যতা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন। হাসপাতালের শয্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১,২০০ রোগী ডায়রিয়া নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসছে।কলেরা ও রোটা ভাইরাসসহ মিশ্র ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েই হাসপাতালে আসছেন বেশিরভাগ ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীরা। নবজাতক থেকে সব বয়সী রোগীর অবস্থায় খারাপ। তবে ১৮ বছর বয়সী রোগীর সংখ্যাই বেশী। আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) প্রধান ডা. বাহারুল আলম জানিয়েছেন, করোনা মহামারির আগের বছরগুলোর প্রবণতা বিবেচনা করে আমরা বলতে পারি যে ডায়রিয়া পরিস্থিতি আগামী ৩-৪ সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে। ময়লা-আবর্জনায় দুর্গন্ধময় পরিবেশ: নগরীর প্রধান প্রধান রাস্তার উপরে যেন সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে রীতিমত ময়লা-আবর্জনার হাটবাজার বসানো হয়েছে। একেকটি স্থানে ৭/৮টি করে কন্টেইনার টার্মিনাল বসিয়ে অলিগরি, বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা তুলে এনে সেসব কন্টেইনার ডাস্টবিনে রাখা হচ্ছে। এ যেনো ঘরের ময়লা রাস্তায় প্রদর্শনের মতো।

কুড়িল, মালিবাগ, প্রগতি সরণি, বারিধারা ও মধ্যবাড্ডা এলাকায় এ ধরনের ময়লার বাজার আছে ঠিক রাস্তার মধ্যখানেই।যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নীচে ধুলা-বালু ও ময়লা-আবর্জনাযুক্ত নোংরা পরিবেশ। রাস্তাগুলোও চলাচলের অযোগ্য। এ যেনো আলোর নীচে অন্ধকার। অলিতে গলিতে মাদকের হাট: নগরীর প্রতিটি এলাকার অলিতে গলিতে এখন মাদকের হাট বসে। দিনে রাতে সমানে চলে উঠতি বয়সী সন্ত্রাসীদের আড্ডা। স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত তাদের ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে। অথচ এদের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই বিপদ। প্রতিটি এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদেরকে প্রশয় দেয় প্রভাবশালী রাজনীতিকরা। এ কারণে মানুষ মুখ বুঝে সব কিছু সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে। পুলিশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে বলে ভুক্তভোগিদের অভিযোগ। খাদ্য ও পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল: পবিত্র রমজানেও নগরীর কোন খাদ্যজাতদ্রব্যটি ভেজালমুক্ত তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। চাল, ডাল, তেল, সাবান, আটা থেকে শুরু করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল। এ ছাড়া ব্যবহার্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও নকল হচ্ছে। টাকা দিয়ে কিনতে গিয়ে আসল নকলের বিভ্রান্তিতে ভুগছে মানুষ। ফরমালিনযুক্ত মাছ আর কার্বইডযুক্ত ফল খেতে খেতে নগরবাসী যেনো অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এখন শীতের মৌসুমে গুড়েও ভেজাল দেয়া হচ্ছে।

পুরান ঢাকার শত শত ভেজাল কারখানায় তৈরী হচ্ছে লাইট, ফ্যান, মশার কোয়েল, ঘি, পানের জর্দ্দা, সেমাই, নুডুলসসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী। আর ভেজাল মিনারেল ওয়াটার কারখানা তো নগরীজুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তিন বছর আগেও ভেজালবিরোধী অভিযান জোড়ালোভাবে পরিচালিত হলেও এখন মাঝে মধ্যে পরিচালিত হয়। এতে করে ভেজালকারবারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অসহনীয় যানজটে নাখাল নগরবাসি: কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না রাজধানীর অসহনীয় যানজট। এজন্য সড়কের চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। উন্নয়ন কাজে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, রাস্তা আটকে বাসে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা, এলোমেলো ভাবে গাড়ি চালানো, রাস্তা দখল করে গাড়ি পার্কিং করায় পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ট্রাফিক বিভাগ আরও কিছু কারণের কথা জানিয়েছে। এসব মধ্যে রয়েছে সকালে একই সময়ে স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও অফিসগামী মানুষ গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা করায় গাড়ির চাপ বাড়ছে। সিএনজি স্টেশনগুলো সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সিএনজি নেওয়ার জন্য দিনের বেলাতেই গাড়িগুলো রাস্তায় বের হচ্ছে। এ ছাড়া রাজধানীর প্রধান প্রধান কয়েকটি রাস্তায় উন্নয়নমূলক কাজ চলার কারণেও যানজট বেড়েছে বলে মনে করছেন তারা। ট্রাফিক বিভাব বলছে, এই মুহূর্তে পরিস্থিতি সহনীয় করতে হলে বাসের চালক ও সহকারীদের সচেতন করতে হবে। শুধু আইন দিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। এর নেপথ্যে রাস্তা আটকে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত গণপরিবহনের চালক ও সহকারীরা। আর পেছনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। আটকে আছে সব গাড়ি। বাসগুলোর এমন স্বেচ্ছাচারিতার কারণে যানজট ছড়িয়ে পড়েছে শ্যামলী থেকে কল্যাণপুর পর্যন্ত। শুধু এমন চিত্র শ্যামলী-যাত্রাবাড়িতেই নয়, রাজধানীর সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টেই যাত্রীবাহী বাসের অযৌক্তিক প্রতিযোগিতার কারণে মোড়ে মোড়ে তৈরি হচ্ছে বিশাল জট।

একই দৃশ্যপট দেখা গেলো মীরপুরের শেওড়া পাড়া এলাকায়। মেট্রোরেল নির্মাণ কাজের কারণে যানজট সেখানে প্রতি মুহূর্তের ঘটনা। সড়কের পশ্চিম পাশটি বন্ধ প্রায় আট ন’মাস ধরে বন্ধ। বাকি এক পাশে চলছে দুইমুখী গাড়ি চলাচল। সেখানেও শীর্ণ রাস্তা আটকে চলে বাসগুলোর যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা।এসব চিত্রই বলে দেয় যানজটের অন্যতম কারণ ট্রাফিক আইন না মানা এবং আইন অমান্য করা ব্যক্তিদের কোন শাস্তি না হওয়া। তবে যদিও ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আইন অমান্যকারীদের জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু চালক ও সহকারীরা সচেতন না হলে শুধু আইন দিয়ে রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি চালালে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে। কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে যানজট। নিয়ন্ত্রণহীন নিত্যপণ্যের বাজার: সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ার অজুহাতে রোজার প্রথম দিন থেকে গতকাল মঙ্গলবার তৃতীয় দিনেও পাইকারি বাজারে ৫০ টাকার বেগুন বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। মরিচের দামও কেজিতে বাড়লো ৩০ টাকা। পাইকারি বাজারের এই লাফঝাঁপের প্রভাবে খুচরা বাজার হয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন। গেল সপ্তাহে ৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া শসা বিক্রি হয়েছে ১৮০ টাকা কেজি পর্যন্ত। শসার পাশাপাশি বেড়েছে ছোলা, চিনি, চাল, ভোজ্যতেল, খেজুর, মাছ, মুরগি এবং গরু-খাসির মাংসের দাম। বাঙালির ভাজাপোড়া ইফতার আয়োজনের অন্যতম অনুসঙ্গ মুখরোচক বেগুনি। এ কারণে রোজা এলেই বেগুনের কদর বেড়ে যায় অনেক। প্রতি বছর ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগ নিতে ভুলেন না। রমজানে বেগুন নিয়ে নানান কারসাজি নতুন কিছু নয়। এবার তার ব্যতিক্রম হয়নি। চাহিদা বুঝেই মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে পাইকারি ও খুচরা বাজারে বেগুনের দাম দ্বিগুন হয়েছে। খুচরা বিক্রেতারা প্রতি কেজি বেগুন ১০০-১১০ টাকায় বিক্রি করছেন। দুদিন আগেও বেগুন বিক্রিহয়েছে ৬০-৭০ টাকায়। আর এক সপ্তাহ আগে ছিল ৫০ টাকা। বেগুনের এই আঁচ লেগেছে মরিচেও। এক রাতের ব্যবধানেই ৬০ থেকে ৭০টাকার মরিচ বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজিতে। তবে ব্যবসায়ীদেরসেই পুরনো অজুহাত।

চাহিদা বেশি, তাই দামও বেশি বেশি। যদিও বাজার ঘুরে সরবরাহের কোনই ঘাটতি দেখা গেল না। এক বিক্রেতাই জানালেন, রমজানে বেগুনের চাহিদা বেশি থাকে, তাই দামও বেশি পায়। বেগুনের সেঞ্চুরি পর পাইকারি বাজরে দামের লাফঝাঁপে সুবিধা হয়েছে খুচরা বিক্রেতারও। দাম হাঁকছেন ইচ্ছে মতো। সেই দামও বাজারভেদে উঠানামা করছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে হাইব্রিড শশা ৬০ টাকা, হাতিরপুল বাজারে সেটির দাম ৮০। আবার মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে শশা এক দোকানে ১১০ টাকা, তো পাশেই ১৮০টাকা। দামের হেরফে লেবুতেও। শরবত খাওয়ার উপযোগী লেবু প্রতিটির দাম ৩০ টাকা। এই দামে সাধারণ লেবু মিলছে এক হালি। তবে লেবু বেধে ৫০টাকা হালিও বিক্রি হচ্ছে কোথাও কোথাও। এদিকে দ্রব্যমূল্য নিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের কঠোর সমালোচনা ও ক্ষোভের মুখে পড়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। বিরোধী সাংসদেরা বলেছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী হয়েও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, তিনি ব্যবসায়ী এটি বেশি করে বলা হয়। কিন্তু তিনি ব্যবসা করছেন ৪০ বছর ধরে, আর রাজনীতি করছেন গত ৫৬ বছর ধরে। তিনি প্রশ্ন রাখেন ব্যবসায়ী হওয়া কি তাঁর অপরাধ? গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ‘বাণিজ্য সংগঠন বিল-২০২২’ পাসের আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সাংসদেরা। বিল পাসের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সাংসদ হারুনুর রশীদ বলেন, গ্যাসের অভাবে ঢাকায় হাহাকার চলছে। গ্যাসের দাম, তেলের দাম সব বাড়ানো হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগ সরকার নিয়েছে। কিন্তু সেখানে স্বচ্ছতার অভাব আছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা জনপ্রতিনিধি হয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ক্ষমতার বলয়ে থেকে সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারেক রহমান লন্ডন থেকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করছেন, বিএনপির কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, এসব অপ্রাসঙ্গিক কথা না বলে সরকারকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।

দ্রুত সবকিছু স্বাভাবিক হবে আওয়ামী লীগ: পবিত্র রমজান মাসে সরকারের পক্ষ থেকে টিসিবির মাধ্যমে চাল-ডাল-তৈলসহ নিত্যপণ্য সামগ্রী স্বল্পমূলে বিক্রি করা হচ্ছে। শিগগিরই সকল পণ্যের দাম স্বাভাবিক হবে বলে আশাবাদ ব্যাক্ত করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। তবে তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। সরকারি দলটির শীর্ষপর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, আমরা প্রতিবছর বিভিন্ন পণ্যের বার্ষিক চাহিদা, উৎপাদন ও ঘাটতি নিরূপণ করি। এরপর ঘাটতি অনুযায়ী সেই পণ্য আমদানি করি। বাজারে জিনিসপত্রে নাম বাড়লেও অতিদ্রুত স্বাভাবিক হবে বলেও জানান দলটির নেতারা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button