আন্তর্জাতিকলীড

রাশিয়া অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: রাশিয়ার সর্বাত্মক হামলার মুখে মাত্র একমাসেই বদলে গেছে ছবির মতো দেশ ইউক্রেনের চেহারা। কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে পূর্ব ইউরোপের এই দেশটির অনেক শহর। রুশ বিমানের নিক্ষেপ করা বোমা আঘাত হেনেছে রাজধানী কিয়েভেও। তবে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস বলেছেন, ইউক্রেনের মানুষ এখন নরক যন্ত্রণায় বাস করছে। কারণ দেশটির বহু শহরে এখনো চলছে গোলাবর্ষণ। এই যুদ্ধ জয়যোগ্য নয় উল্লেখ করে তিনি বলেছে, সহসাই এই যুদ্ধ শেষ হচ্ছে না। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, রাশিয়ান বাহিনী এক জায়গাতেই আটকে আছে। তবে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মারিউপোলে তীব্র লড়াই হচ্ছে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট বলছেন যে, রাশিয়ান হামলার পর সেখানে কার্যত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এবার কী তবে ইউক্রেনে পরমাণু হামলা চালাবে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী? তবে অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে রাশিয়া।
এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারি বাসভবন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রাশিয়া তখনই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে যদি তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যে ইউক্রেনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না এ বিষয়ে তিনি (পেসকভ) ‘প্রত্যয়ী বা আত্মবিশ্বাসী’ কি না, মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন’র ক্রিশ্চিয়ান আমানপুরের এমন প্রশ্নের উত্তরে দিমিত্রি পেসকভ একথা বলেন।
ইউক্রেনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি প্রেসিডেন্ট পুতিন বিবেচনা করছেন কি না, সিএনএন’র এই প্রশ্নের জবাবে দিমিত্রি পেসকভ বলেন, আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার একটি নিয়ম আছে এবং এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার সকল কারণ আপনি সেখানে পড়তে পারেন। তিনি আরো বলেন, সুতরাং এটি (অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা) যদি আমাদের দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়, তবে এটি (পারমাণবিক অস্ত্র) আমাদের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারি।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইউক্রেনে হামলা শুরু করে রাশিয়ান সৈন্যরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে ইউক্রেনে এই হামলা শুরু করে। একসঙ্গে তিন দিক দিয়ে হওয়া এই হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে বৃষ্টির মতো। সর্বাত্মক হামলা শুরুর পর এক সপ্তাহের মধ্যেই পূর্ব ইউরোপের এই দেশটির বহু শহর কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। এছাড়া হামলার শুরুর মাত্র চারদিনের মাথায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার পরমাণু প্রতিরোধ বাহিনীকে বিশেষ সতর্কতায় থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন পুতিন। পুতিনের এই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই বিশ্বজুড়ে সেসময়ই দেখা দিয়েছিল শঙ্কা। রুশ প্রেসিডেন্টের তীব্র সমালোচনা করে সেসময় হোয়াইট হাউস জানায়, পরমাণু হামলা চালানোর হুমকি দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন।
জানা গেছে, কৃষি শহর ভজনেসেনস্ক এবং এর একটি সেতুকে ঘিরে দু’দিন ধরে ব্যাপক লড়াই হয়েছে। এখানে জয়ের মাধ্যমেই রাশিয়ান বাহিনী দ্রুত কৃষ্ণসাগরের বড় বন্দর ওডেসা এবং একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হতে পারবে। তবে ইউক্রেনের সেনারা তীব্র প্রতিরোধ তৈরি করেছে এবং তারা একটি ব্রিজ উড়িয়ে দেয়ায় রাশিয়ানদের পিছু হটতে হয়েছে প্রায় একশ কিলোমিটার পর্যন্ত। ওই লড়াইয়ের তিন সপ্তাহ পর ভজনেসেনস্কের মেয়র আবারো রাশিয়ান হামলা হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন। কারণ শহরটির যোদ্ধাদের হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র নেই। তিনি বলেন, শত্রুদের প্রতিরোধ করার মতো ভারী অস্ত্র তাদের হাতে আর নেই।
রাশিয়ান ধনকূবের রোমান আব্রামোভিচের সঙ্গে যোগসূত্র আছে এমন দুটি সুপার ইয়াট তুরস্কের ডকে। এগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার বাইরে। কিন্তু এগুলো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বড্রামে একটি সুপার ইয়ট থামানোর চেষ্টা করেছিলো একদল ইউক্রেনীয় তরুণ। আরেকটি ইয়ট আছে মারমারিসে।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, এসব সুপার ইয়াট এখন তাদের টার্গেট এবং এ পর্যন্ত অন্তত আটটি তারা জব্দ করেছে। তবে অন্যগুলো এখন তাদের নাগালের বাইরে। কারণ মালদ্বীপের নিষেধাজ্ঞা থেকে নিরাপদ কিছু জায়গায় সেগুলো আছে। ইউক্রেনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়া শরণার্থীদের জন্য বিশেষ কিছু পরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। খুব শিগগিরই এ ঘোষণা আসতে পারে এবং এ পরিকল্পনার আওতায় ইউক্রেনের অধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও সমকামী সম্প্রদায়ের মানুষজন থাকবেন। এর ফলে এসব মানুষেরা দ্রুততম সময়ে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন।
অপরদিকে, ইউক্রেনের চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্রের বাইরে বিশাল এক্সক্লুসন জোনের লাগোয়া এলাকায় দাউদাউ করে জ্বলছে গাছপালা, বনবাদাড়। দাবানলের শিখা আকাশে এত উঁচুতে উঠেছে যে তা মহাকাশ থেকেও দেখা যাচ্ছে। যা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (এসা)-র উপগ্রহের চোখে ধরা পড়েছে। চেরনোবিল পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাগোয়া এলাকায় এমন ভয়াবহ সাতটি দাবানলের ছবি তুলে পাঠিয়েছে ইউরোপীয় উপগ্রহ। ইউক্রেনের পার্লামেন্টের এক বিবৃতিতে এই খবর দেওয়া হয়েছে। সেই বিবৃতিতে এও দাবি করা হয়েছে, রাশিয়ার সেনাবাহিনী চেরনোবিল পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তার লাগোয়া এলাকার পুরোপুরি দখল নেওয়ায় দাবানল রোধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে, চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্র ও তার লাগোয়া এলাকাগুলির বিপদ উত্তরোত্তর বাড়ছে।
ইউক্রেনের পার্লামেন্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই দাবানগুলির সূত্রপাত হয়েছে সম্ভবত রুশ সেনাদের জন্যই। তবে রুশ সেনাদের ছোড়া গুলিগোলা, মর্টার, ক্ষেপণাস্ত্র, কামানের গোলা আছড়ে পড়ার জন্যই ওই সব দাবানল নাকি অন্য কোনও কারণে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পরমাণু কেন্দ্রের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে এমন ভয়াবহ একের পর এক দাবানল খুব বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে গোটা এলাকার পক্ষে। দাবি করা হয়েছে, পরমাণু কেন্দ্র ও তার লাগোয়া এলাকা পুরোপুরি রুশ সেনাদের দখলে চলে যাওয়ায় সেই দাবানলগুলি নিয়ন্ত্রণের কোনও ব্যবস্থা ইউক্রেন সরকারের পক্ষে নেওয়া সম্ভব হয়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই চেরনোবিল পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দখল করে ফেলে রুশ সেনারা। লাগোয়া প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকারও দখল রুশ সেনারা নিয়ে নেয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই।
১৯৮৬ সালে এক বিধ্বংসী বিস্ফোরণ হয় চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্রে। তাতে কেন্দ্রের দুটি পরমাণু চুল্লি উড়ে গিয়ে অত্যন্ত ক্ষতিকারক তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে প্রায় গোটা ইউরোপেই। তার পরেই পরমাণু কেন্দ্রে যাবতীয় উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই এলাকায় তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য এখনও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। যার জন্য কেন্দ্র লাগোয়া ১০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা থেকে পরে সব বসতি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই এলাকায় তেজস্ক্রিয়তা আরও ২৬ হাজার বছর থাকতে পারে বলে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পরমাণু চুল্লিগুলির নীচে এখনও প্রায় ২০০ টন পরমাণু জ্বালানি রয়েছে। যা কোনও প্রকোষ্ঠের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘেরা নেই। তা ছাড়া রয়েছে বিশাল এলাকা জুড়ে প্রচুর পরিমাণে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যও। রুশ গুলিগোলা বা দাবানলে সে সব থেকে ফের ভয়াবহ বিস্ফোরণ হতে পারে। আরও দূরে ছড়িয়ে পড়তে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য। ইউক্রেনের রাষ্ট্রায়ত্ত পরমাণু শক্তি সংস্থা ‘এনার্গোঅ্যাটম’-এর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরমাণু কেন্দ্র ও তার লাগোয়া এলাকায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা এখন কতটা রুশ আগ্রাসনের পর সেটা মাপাও সম্ভব হয়নি। সেই মাত্রা অস্বাভাবিক হয়ে গেলে তা ইউক্রেন তো বটেই, ইউরোপের কয়েকটি দেশের পক্ষেও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ’৮৬ সালের বিস্ফোরণেই চেরনোবিলের আশপাশের বনগুলিতে ভয়াবহ দাবানল হয়েছিল। তাতে বহু গাছ পুড়ে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে শুকনো কাঠ জমা করেছে চেরনোবিলের লাগোয়া এলাকায়। ২০২০ সালে তারই সুবাদে দাবানল হয়েছিল চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্র লাগোয়া এলাকায়। তাতে লাগোয়া এলাকায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১৬ গুণ বেড়ে গিয়েছিল। সেই ঘটনা ঘটেছিল উষ্ণায়নের জন্য। ২০১৫ সালে একটি আন্তর্জাতিক স্তরের গবেষণার হুঁশিয়ারি ছিল, উষ্ণায়নের জন্য চেরনোবিলের লাগোয়া এলাকায় দাবানলের সংখ্যা ও তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। তার থেকে ফের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ইউক্রেন-সহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button