আন্তর্জাতিকলীড

আগ্রাসন

টাইমস ২৪ ডটনেট: চতুর কেজিবি এজেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। প্রেসিডেন্টের মসনদে বসার পর রাশিয়াকে জড়িয়েছেন একাধিক রণাঙ্গনে। এবারও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এক মাস ধরে। সামরিক মহড়ার উছিলায় ইউক্রেন সীমান্তে জড়ো করছিলেন ফৌজ। কিন্তু অস্বীকার করেছেন বার বার। বলেই গেছেন, ইউক্রেনে হামলার কোনো অভিসন্ধি নেই তার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা দুনিয়ার আশঙ্কাই সত্যি হলো। ইউক্রেন সংকট নিয়ে যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠক চলছিল তখনই রাশিয়ান টিভিতে হাজির পুতিন।
ঘোষণা দিলেন যুদ্ধের। শুরু হয়ে যায় আগ্রাসী হামলা। মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কেঁপে ওঠে ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চল। রাজধানী থেকে পালাতে শুরু করে মানুষ। সীমান্ত পথেও এরইমধ্যে প্রবেশ করেছে রাশিয়ান বাহিনী। নিহতের সংখ্যা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি করেছে ইউক্রেন ও রাশিয়া। বিশ্বব্যাপী উঠেছে নিন্দার ঝড়। কিন্তু এ হামলায় সারা দুনিয়াতেই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
মস্কোর সময় গতকাল ভোর ৫টা ৫৫ মিনিট। ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসন চালানোর ঘোষণা দেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেশটির রাজধানী কিয়েভ ও অন্যান্য স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। হামলা হয়েছে বিমানঘাঁটি, বিমানবন্দর এবং সেনা সদরদপ্তরে। বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলার আঘাতে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কির উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এতে কমপক্ষে ৪০ জন ইউক্রেনিয়ান নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার ৫০ সেনা হত্যার দাবি করেছে ইউক্রেন। আগ্রাসন চালানোর আগে পুতিন হুঁশিয়ারি দেন। বলেন, কেউ রাশিয়ার পিছু নেয়ার চেষ্টা করলে জবাব হবে তাৎক্ষণিক। এ সময় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেনের সেনাদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানান তিনি। তাদেরকে অস্ত্র সমর্পণ করে ঘরে ফিরে যেতে বলেন। কিন্তু রাশিয়ার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ বিশ্ব নেতারা। আগ্রাসন চালানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। তারা বলেছে, ইউরোপে যুদ্ধ ফিরিয়ে এনেছেন পুতিন। তাই রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘ম্যাসিভ’ বা বড় আকারে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এই ভয়াবহ সময়ে ইউক্রেনের পাশে থাকার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন ন্যাটোর প্রধান জেন্স স্টোলটেনবার্গ। সব মিত্রকে রক্ষায় সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
পুতিন দাবি করেছেন, আত্মরক্ষার জন্য রাশিয়ার এই আগ্রাসন। কিন্তু তার দেশের বিরুদ্ধে কে হুমকি সৃষ্টি করেছে, কীভাবে করেছে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি। তার সেনাদল এবং ট্যাংকবহর সবদিক থেকে ইউক্রেনে প্রবেশ করেছে। একটি বহর রাজধানী কিয়েভের উত্তরে বেলারুশ সীমান্ত অতিক্রম করে। আরেকটি বহর দক্ষিণে ক্রাইমিয়া থেকে প্রবেশ করেছে। ইউক্রেন দাবি করেছে তারা রাশিয়ার ৫০ সেনাকে হত্যা করেছে। গুলি করে ভূপাতিত করেছে ৬টি যুদ্ধবিমান। তবে মস্কো এ দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। রাশিয়ার হামলার জবাবে সামরিক শাসন ঘোষণা করা হয়েছে ইউক্রেনে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী দমিত্র কুলেবা ‘ধ্বংসাত্মক নিষেধাজ্ঞা’ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা এমন হতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুইফ্‌ট কোড ব্যবহার করতে না পারে রাশিয়া। ওদিকে সাত বছরের মধ্যে প্রথমবার প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ডলার ও ইউরোর বিপরীতে রাশিয়ার মুদ্রা রুবলের দাম সর্বকালের সবচেয়ে নিচে নেমে গেছে।
ভোর ৫টার সামান্য পরে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে প্রথম বিস্ফোরণ হয়েছে। চার থেকে পাঁচটি বিস্ফোরণ হয় সেখানে। তবে তা ছিল বিচ্ছিন্ন এবং দূরবর্তী। এরপরই দ্রুততার সঙ্গে আরও বিস্ফোরণ ঘটে। বিবিসি’র কূটনৈতিক প্রতিবেদক পল এডামস বলেন, রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে একটি হামলা হয়েছে কিয়েভের বিমানবন্দরে। বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এমন একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, বিমান ঘাঁটি এবং সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তরে হামলা হয়েছে। এ ছাড়া হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে ইউক্রেনের বিভিন্ন অংশ থেকে। বিশেষ করে পূর্বে ক্রামাটোরস্ক থেকে। এই অংশটি রাশিয়াপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এলাকার কাছাকাছি।
রাজধানী কিয়েভে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেন সরকারের একজন কর্মকর্তা বিবিসি’র সাংবাদিক জেম্‌স ওয়াটার হাউজকে এ তথ্য দিয়েছেন। এ ছাড়া রাশিয়ার সেনারা যেসব হামলা চালিয়েছে তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। ওই কর্মকর্তা বলেছেন, বৃহস্পতিবার খুব সকালে কিয়েভের ওপর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। এ ছাড়া দেশটির দক্ষিণে ওডেসা’য় সেনা মুভমেন্ট হয়েছে। তারা সীমান্ত অতিক্রম করে খারকিভের ভেতর প্রবেশ করেছে। এই এলাকাটি রাশিয়া সীমান্ত থেকে ইউক্রেনের প্রায় ২৫ কিলোমিটার ভেতরে। বিবিসি’র সাংবাদিক বলছেন, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সরকারি কর্মকর্তারা যে তথ্য দিচ্ছেন, তাতে এটা স্পষ্ট যে, এই হামলা ব্যাপক আকারে হয়েছে। ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে স্থানীয় মিডিয়ায় অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে কয়েকটি ইউক্রেন সেনাবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র কমান্ড সেন্টার ও কিয়েভে সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তরে আঘাত করেছে। তবে ইউক্রেনের শহরগুলোতে হামলার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা বলেছে, তারা সামরিক অবকাঠামো, বিমান প্রতিরক্ষা এবং বিমানবাহিনীকে ‘উচ্চ মাত্রায় নির্ভুল অস্ত্র’ দিয়ে টার্গেট করেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে যোগ দিয়েছে বেলারুশের সেনারা: ইউক্রেন হামলায় রাশিয়ার সঙ্গে যোগ দিয়েছে বেলারুশের সেনারা। ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বহু রিপোর্টে এ কথা বলা হয়েছে। তাতে বলা হচ্ছে, রাশিয়ার সেনাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বেলারুশের সেনারা। এর অর্থ হলো- ইউক্রেনের বিরুদ্ধে এই হামলা এখন শুধু পূর্বদিক থেকেই হচ্ছে এমন নয়। হামলা হচ্ছে উত্তরে বেলারুশের দিক থেকেও। এ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার মিত্র। বিশ্লেষকরা বেলারুশ নামের ছোট্ট রাষ্ট্রটিকে রাশিয়ার ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বলে অভিহিত করেন। রাশিয়ার সেনারা পূর্বদিক দিয়ে ইউক্রেনে আক্রমণ চালিয়েছে। দক্ষিণে ওডেশার দিকে অগ্রসর হচ্ছে সেনারা। তার সঙ্গে উত্তরে বেলারুশ যোগ দিয়েছে।
৭ বছরের মধ্যে তেলের দাম সর্বোচ্চ, প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে: ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সামরিক হামলার ফলে সাত বছরেরও বেশি সময় পরে প্রথমবারের মতো তেলের মূল্য প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। ওদিকে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে ট্রেড কমে গেছে শতকরা ২ থেকে ৩ ভাগ। ইউক্রেন ইস্যুতে উত্তেজনা দেখা দেয়ায় কয়েকদিন ধরে শেয়ারবাজারে উত্থান-পতন দেখা দেয়। কয়েকদিন আগে প্রেসিডেন্ট পুতিন শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে ইউক্রেনের রাশিয়াপন্থি বিদ্রোহীদের দখলে থাকা দোনেৎস্ক এবং লুহানস্কে সেনা পাঠানোর ঘোষণা দেন। ফলে তেলের মূল্য প্রতি ব্যারেল ৯৮ ডলার পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। সেই তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম এখন ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুদ্ধ শুরুর ফলে তেলের সবরাহ বিঘ্নিত হবে, এই আশঙ্কায় সবাই ঝুঁকছেন তেলের দিকে। ফলে মূল্য স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাচ্ছে। বিবিসি’র এশিয়া বিজনেস বিষয়ক প্রতিনিধি মারিকো ওই বলেছেন, বিনিয়োগকারীরা সতর্ক। কোন সম্পদ নিরাপদ তা বিবেচনা করছেন তারা। সেই অনুযায়ী কেনাবেচা চলছে। এক বছরের মধ্যে স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন ডলার এবং জাপানি ইয়েনও শক্তিশালী হচ্ছে।
পুতিনের রক্ত-নেশার জন্য চরম মূল্য দিতে হবে রাশিয়ানদের: ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক হামলায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট সিলেক্ট কমিটি অন ইন্টেলিজেন্সের চেয়ারম্যান মার্ক ওয়ার্নার। তিনি বলেছেন, এই হামলা শুরুর পর এখন রাশিয়ার ‘বেদনা বাড়ার’- সময় এসে গেছে। ওয়ার্নার আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দুই রাজনৈতিক দলের আইনপ্রণেতাদের উচিত রাজনৈতিকভাবে একত্রিত হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। এর মধ্য দিয়ে পুতিনকে এটাই শিক্ষা দিতে হবে যে, এই আগ্রাসনকে ‘আনপানিশড’ ছেড়ে দেয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, রাশিয়ানদের জন্য যেমন, তেমনি ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের জন্য এই সামরিক হামলা একটি ট্র্যাজেডি। পুতিনের বেপরোয়া রক্তের নেশার জন্য চরম মূল্য দিতে হবে রাশিয়ানদের এবং একই সঙ্গে এতে চরম অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে।
ইউক্রেন হামলায় বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া, নিন্দা: ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন’-এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বের বহু দেশ। কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের জন্য এ সপ্তাহে জরুরি ভিত্তিতে দ্বিতীয়বার বৈঠকে বসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। ঠিক তখনই ওই সামরিক আগ্রাসনের অনুমোদন দেন পুতিন। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দমিত্র কুলেবা বলেছেন, ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরু করেছেন পুতিন। শান্তিপূর্ণ শহরগুলো আক্রান্ত হয়েছে। এটা হলো আগ্রাসনের যুদ্ধ। আত্মরক্ষা করবে ইউক্রেন এবং তাতে বিজয়ী হবে। পুতিনকে থামাতে পারে বিশ্ব এবং তা পারতেই হবে। এখনই ব্যবস্থা নেয়ার সময়।
যুক্তরাষ্ট্র: বিনা উস্কানিতে অন্যায়ভাবে ইউক্রেনে হামলার কড়া নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তার দেশ এবং মিত্ররা মিলে রাশিয়াকে জবাবদিহিতায় আনবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। বাইডেন বলেন, পূর্ব-পরিকল্পিত একটি যুদ্ধ বেছে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। এর ফলে ব্যাপক প্রাণহানি এবং মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। এই হামলায় যারা মারা যাবেন এবং যে ধ্বংসলীলা চালানো হবে তার জন্য দায়ী থাকবে শুধু রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্ররা এবং অংশীদাররা ঐক্যবদ্ধভাবে এবং সুচিন্তিত জবাব দেবে। রাশিয়াকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে বিশ্ব।
জার্মানি: ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের ভয়াবহ লঙ্ঘন বলে এর নিন্দা জানিয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শুলজ। তিনি এই হামলার পক্ষে দাঁড়ানো যায় না বলে মন্তব্য করেছেন।
জাতিসংঘ: রাশিয়ার হামলার নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরাঁ। যুদ্ধাবস্থা থেকে সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করে নিতে পুতিনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গুতেরাঁ বলেছেন, মানবতার জন্য আমরা ইউরোপে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হোক- এমনটা হতে দিতে চাই না। এই যুদ্ধ হবে এই শতাব্দীর শুরুতে সবচেয়ে ভয়াবহ। এতে শুধু রাশিয়ান ফেডারেশনে ট্র্যাজেডি বয়ে আনবে এমন নয়। এর পরিণতি হবে ইউক্রেনের জন্যও ভয়াবহ। এর প্রভাব হবে এমন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
বৃটেন: ইউক্রেনে ভয়াবহ এই হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি পরবর্তী করণীয় নিয়ে ফোনে কথা বলেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে। জনসন বলেন, পুতিন রক্তপাতের পথ বেছে নিয়েছেন। বিনা উস্কানিতে তিনি ইউক্রেনে ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছেন। বরিস জনসন সুচিন্তিত জবাব দেয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন।
ইইউ: রাশিয়ার সামরিক হামলার ত্বরিত নিন্দা জানিয়েছে ইউরোপিয়ান দেশগুলো। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কিকে ফোন করে তার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন এসব দেশের নেতা। জার্মান সরকারের মুখপাত্র বলেছেন, চ্যান্সেলর ওলাফ শুলজ ফোনে কথা বলেছেন জেলেনস্কির সঙ্গে। দেশটির অর্থমন্ত্রী রবার্ট হ্যাবেক বিবৃতিতে বলেছেন, ইউরোপে স্থলযুদ্ধ শুরু হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম এই বিষয়টি শুধু ইতিহাসের বইয়েই থাকবে। কিন্তু এই যুদ্ধের মাধ্যমে ভয়াবহভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন হামলার কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। বলেছেন, এই যুদ্ধ শেষ করতে মিত্রদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করবে ফ্রান্স। টুইটারে ম্যাক্রন লিখেছেন, অবিলম্বে এই সামরিক হামলা বন্ধ করতে হবে রাশিয়াকে। ইউক্রেনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ফ্রান্স। যুদ্ধ বন্ধে অংশীদার ও মিত্রদের সঙ্গেও কাজ করছে তার দেশ। হামলাকে অন্যায় এবং অনুপযুক্ত বলে মন্তব্য করেছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী মারিও দ্রাঘি। তিনি বলেছেন, অবিলম্বে এর জবাব দিতে ঐক্যবদ্ধ হতে এবং সিদ্ধান্ত ঠিক করতে ইউরোপিয়ান এবং ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে আমরা কাজ করছি। পোল্যান্ড সরকারের মুখপাত্র পাইওত্র মুলার বলেছেন, এখনই পূর্বমুখে ন্যাটো বাহিনী সম্প্রসারণ করার সময়। আশা করি এমনই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাতেউজ মোরাউইকি রাশিয়ার আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যত দ্রুত সম্ভব সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পক্ষে তিনি। টুইটে লিখেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার ক্রিমিনাল আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক জবাব দিতেই হবে। পুতিনকে অবশ্যই থামিয়ে দিতে ইউরোপ এবং মুক্ত বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ইউক্রেনে হামলাকে বর্বর আগ্রাসন বলে উল্লেখ করেছেন চেক প্রজাতন্ত্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যান লিপাভস্কি। মিত্রদের সঙ্গে একত্রিতভাবে তার দেশ এর জবাব দেবে। তিনি টুইটারে লিখেছেন, বিনা উস্কানিতে ক্রেমলিনের একটি পরিপূর্ণ হামলার সিদ্ধান্ত অগ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওদিকে হাঙ্গেরির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার সিজ্জারতো বলেছেন, যুদ্ধ হলো এক ভয়াবহ বিষয়। সব সময়ের মতো এখনো হাঙ্গেরির মানুষজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিয়েভে অবস্থিত আমাদের দূতাবাস কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইউক্রেনে অবস্থানকারী হাঙ্গেরিয়ানকে সহায়তা করতে প্রস্তুত তারা। নিন্দা জানিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। কী জবাব দেয়া যায় তা নিয়ে তিনি ন্যাটোর মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করছেন।
ন্যাটো: ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার কড়া নিন্দা জানিয়েছেন ন্যাটো মহাসচিব জেন্স স্টোলটেনবার্গ। এরমধ্য দিয়ে রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইন ভয়াবহভাবে লঙ্ঘন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। একইসঙ্গে একে রাশিয়ার ‘বেপরোয়া হামলা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন জেন্স স্টোলটেনবার্গ। টুইটে তিনি বলেন, এর ফলে অগণিত বেসামরিক মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে দেয়া হয়েছে। ইউরো-আটলান্টিক নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ এক হুমকিও এই হামলা। তিনি আরও বলেছেন, রাশিয়ার নতুন করে এই আগ্রাসনের জবাব কীভাবে দেয়া যাবে, তা নিয়ে মিটিং করবে ন্যাটো মিত্ররা।
চীন: চীনা দূতাবাস ইউক্রেনে অবস্থানরত নাগরিকদের পূর্ব সতর্কতা হিসেবে নিজেদের বাসভবনের ভেতরেই থাকার অনুরোধ করেছে। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে বোমা হামলার পর এই সতর্কতা দেয়া হয়।
অস্ট্রেলিয়া: প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শুক্রবারই আইনে পরিণত হবে। মার্চের শেষ পর্যন্ত তা বহাল থাকবে। উস্কানি ছাড়া, বেআইনিভাবে, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এবং অন্যায়ভাবে এই হামলা ও হুমকি, ভয়ভীতির মূল্য দিতে হবে।
কানাডা: প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো রাশিয়ার হামলাকে বিনা উস্কানিতে এবং ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন। সম্মিলিত জবাব দিতে গ্রুপ অব সেভেনের অংশীদারদের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করবেন। এ সপ্তাহের শুরুতে আরও বড় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হতে পারে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। এই বেপরোয়া এবং বিপজ্জনক হামলাকে শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দেয়া যায় না।
ইরান: ইউক্রেনের ভেতরে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের অবিলম্বে ইউক্রেন ছাড়তে আহ্বান জানিয়েছে ইরান। বর্তমানে ইউক্রেনের আকাশসীমা বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য বিশেষ বিমানের ফ্লাইট পরিচালনা করতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করছে ইরান।
রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার আহ্বান ইউক্রেনের: রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবশ্যই অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দমিত্র কুলেবা। এই হামলার কী জবাব দেয়া যায়, তার একটি তালিকা করে তিনি টুইট করেছেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে। তিনি বলেছেন, বিশ্বকে অবশ্যই অবিলম্বে জবাব দিতে হবে। ইউরোপ এবং বিশ্বের ভবিষ্যৎ এখন সংকটাপন্ন। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবিলম্বে ‘ধ্বংসাত্মক নিষেধাজ্ঞা’ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এরমধ্যে আন্তর্জাতিক অর্থ বিনিময় ব্যবস্থা ‘সুইফ্‌ট’ ব্যবহারে রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়াকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ইউক্রেনকে অস্ত্র, সরঞ্জাম, আর্থিক ও মানবিক সহায়তা দিয়ে সামনে এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কুলেবা।

সূত্র: মানবজমিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button