চলতি সংবাদজাতীয়

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে আইভীর হ্যাটট্রিক

টাইমস২৪ ডটনেট, ঢাকা: টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে জয়ের হ্যাটট্রিক করলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। প্রায় প্রায় দ্বিগুণ ভোটের ব্যবধানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে পরাজিত করেছেন তিনি। এ নিয়ে টানা তৃতীয়বার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হলেন আইভী। রোববার ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর এগিয়ে থাকার খবর আসতে থাকে। গতকাল রাতের দিকে ডিসি অফিসের সামনে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তা যখন ফল ঘোষণা করছিলেন, তখন রাস্তায় উচ্ছ্বসিত হাজারো মানুষ ‘আইভী’ আর ‘নৌকা নৌকা’ বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন। একের পর এক কেন্দ্রের ফল ঘোষণা হচ্ছিল আর প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে আইভীর ব্যবধান বাড়ছিল। বাড়ছিল জনতার উচ্ছ্বাস। বেসরকারীভাবে ১৯২টি ভোট কেন্দ্রের প্রাপ্তা ফলাফল হচ্ছে নৌকা প্রতিকে আইভী রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৬১ হাজার ২শ’ ৭৩ ভোট ও হাতি মার্কা তৈমুর আলম খন্দকার পেয়েছেন ৯২ হাজার ১শ’৭১ ভোট।
তৃতীয় নাসিক নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয় সকাল আটটায় শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে চলে আর ভোটগ্রহণ শেষ হয় বিকাল চারটায়। এদিকে লাইনে ভোটার থাকায় কিছু কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের পরেও চলে ভোটগ্রহণ কয়েকটি কেন্দ্রে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত শেষ হয়।
এবার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে মোট ভোটারের মধ্যে নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান। মোট ৫ লাখ ১৭ হাজার ৩৬১ জনের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৪৬ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫১১ জন এবং হিজরা ৪ জন। এর আগে ২০১৬ সালের নাসিক নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। সে অনুযায়ী নতুন ভোটার ৪২ হাজার ৯৩০ জন। বড় কোন অনিয়মের অভিযোগ ছাড়াই শেষ হল নারাায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হয়। এই প্রথম এই নাসিক নির্বাচনে সম্পূর্ণ ইভিএম এর মাধ্যমে ভোট অনুষ্ঠিত সম্পর্ণ হয়।
কোভিড পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ, আঙ্গুলের ছাপ না মেলা এবং বয়স্কদের ইভিএম বুঝতে অসুবিধা হওয়ায় নির্বাচনে কোথাও কোথাও ভোট নিতে বিলম্ব হয়েছে। তাতেও ভোটারদের লাইনে অপেক্ষার প্রহরও দীর্ঘ সময় চলে।
শিশুবাগ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী। ভোটের পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ভোটদানে ধীর গতির খবর পাওয়ার কথা বলেছেন তিনি। আইভী বলেন, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে কদমতলিতে একটি ভোটকেন্দ্রে ইভিএম মেশিন নষ্ট হওয়ার খবর পেয়েছি।পরে তারা জানিয়েছে, ঠিক করছে। সকালে নিজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে স্বতন্ত্র মেয়র পদপ্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি কোথাও কোথাও ভোটারের উপস্থিতি কম দেখে গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করেন, ইভিএম-ভীতির কারণে’ হয়ত মানুষ কম।
দুপুর ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শনের পর তিনি সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। জেলা প্রশাসক বলেন, সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে ভোট হচ্ছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীদের এজেন্ট আছে। নারী ভোটারদের উপস্থিতি বেশি। আমাদের প্রত্যেক সুশৃঙ্খলভাবে এসে ভোট দিতে পারবে এবং ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত এই শান্তিপূর্ণ অবস্থানটি বজায় থাকবে।
ইভিএমে ধীরগতিতে ভোট হচ্ছে বলে অনেকের অভিযোগের প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, বৃদ্ধ এবং স্বল্প শিক্ষিতদের ক্ষেত্রে ইভিএমে ভোট নিতে কিছুটা ধীরগতি হচ্ছে। যারা ইভিএম সম্পর্কে জানেন এবং কিছুটা আইসিটি জ্ঞান আছে তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত ভোট নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে সব কিছু মিলিয়ে আমরা বড় ধরনের কোনো সমস্যা পাইনি। মেয়র পদে সাতজন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নারায়ণগঞ্জ সিটির তৃতীয় এই নির্বাচনে৷ তাতে প্রত্যেক ভোটারকে তিনটি ভোট দিতে হয়েছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে (নাসিক) নৌকার প্রার্থী হারবে না, যদি বলে কোন কথা নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। নাসিক নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হেরে গেলে- প্রার্থী হারবে না প্রতীক হারবে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে জবাবে এসব কথা বলেন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান।
শেষ মুহূর্তে নাসিক নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর এজন্য ধন্যবাদ দিবো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। তবে এই এগিয়ে যাওয়া রুখতে দেশে-বিদেশে যড়যন্ত্র হচ্ছে। শামীম ওসমান বলেন, জনগণ সন্তুষ্ট। তারা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট প্রদান করেছেন।
সকালে নগরীর বিভিন্ন ঘুরে দেখা যায়, নির্ধারিত সময়ে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। শীতের কুয়াশা উপেক্ষা করে ভোটাররা নিজ নিজ কেন্দ্রে গিয়ে উপস্থিত হন। কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভোট দিতে পেরেছেন বলে জানান বেশ কয়েকজন ভোটার।
২০১৬ সালে নাসিকে মোট ভোটার ছিল চার লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। সে অনুযায়ী নতুন ভোটার ৪২ হাজার ৯৩০ জন। নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রের এক হাজার ৩৩৩ ভোটকক্ষে চলবে ভোটগ্রহণ। এ জন্য নারায়ণগঞ্জে দুই হাজার ৯১২টি ইভিএম মেশিন আনা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে প্রয়োজনের তুলনায় দেড়গুণ ইভিএম রাখা হবে বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তার।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ১৯২টি কেন্দ্রের ৩০টি কেন্দ্র অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ছাড়া ২৭টি ওয়ার্ডের আটটি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সার্বিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, সব কেন্দ্রকেই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় রেখে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে‘ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন পরিচালনা করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত।
এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে পাঁচজন অংশগ্রহণ করেছেন। তারা হলেন- নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াৎ আইভী, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাসুম বিল্লাহ, দেয়ালঘড়ি প্রতীকে খেলাফত মজলিশের এবিএম সিরাজুল মামুন, বটগাছ প্রতীকে খেলাফত আন্দোলনের জসিম উদ্দিন, হাতঘড়ি প্রতীকে কল্যাণ পার্টির রাশেদ ফেরদৌস। বাকি দু’জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তাদের মধ্যে বিএনপি থেকে অব্যাহতি পাওয়া তৈমূর আলম খন্দকার লড়ছেন হাতি প্রতীকে। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল ইসলাম বাবু লড়ছেন ঘোড়া প্রতীকে।
সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে লড়ছেন ৩৪ জন। কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন, বাসদ, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশগ্রহণ করেছেন। মোট ১৮৯ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে একজন মেয়র, ৯ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর এবং ২৭টি ওয়ার্ডের জন্য একজন করে সাধারণ কাউন্সিলর বেছে নেবেন ভোটাররা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button