সারাদেশ

পুরান ঢাকায় সাকরাইন উৎসব উদযাপন

মো. রফিক, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: পৌষ সংক্রান্তিতে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর পুরান ঢাকার বাসিন্দারা উদযাপন করেছেন সাকরাইন উৎসব। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাসার ছাদে সাউন্ড-সিস্টেম, আলোকসজ্জা ও লাইটিং, ঘুড়ি ওড়ানো, আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে এ উৎসব উদযাপিত হয়েছে। এবারের উৎসবে ডিএমপি’র ফানুস ও আতশবাজি নির্দেশনা অমান্য করেই উদযাপিত করেছে ঢাকাবাসী। শুক্রবার সকালে সূর্যোদয়ের পর থেকেই বাসাবাড়ির ছাদে চলে ঘুড়ি ওড়ানো। ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য সুতা-মাঞ্জা দেওয়া থেকে শুরু করে গান-বাজনাসহ পিঠা উৎসবেরও আয়োজন চলে। বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যে ছোটবড় সবাই মেতে উঠেছেন এ উৎসবে। দিনের শুরু থেকেই পুরান ঢাকার বাড়িতে বাড়িতে চলে পিঠা বানানোর ধুম। এছাড়াও এসব এলাকার আকাশে উড়েছে রঙ বেরঙের ঘুড়ি।
জানা গেছে, যুগযুগ ধরে সনাতনধর্মে এই পৌষ সংক্রান্তি উৎসব করে আসছে। মুলত প্রতি বছর জানুয়ারী মাসের ১৪ তারিখে মাঘ মাসের ১তারিখ অর্থাৎ পহেলা মাঘ পৌষ সংক্রাতি উৎসবটি সারাদিন ব্যাপি বাসা বাড়ির ছাদে ঘুড়ি উড়িয়ে একজন আর একজনের সাথে ঘুড়ি কাটা কাটি করে চিৎকার করে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে। আর সারাদিন গুড় ,নারিকেল, আতপ চালের পিঠাপুলি, পায়েশ, লুচি, পোলাও,বার্বিকিউ, গ্রিল,এ সব ধরনের খাবার খেয়ে সাথে ডিজে পার্টি সহ এই কাটা কাটি পর্ব চলে সন্ধ্যার আজান পর্যন্ত। পুরান ঢাকাবাসীরাই মুলত এ ধরনের আয়োজন করে থাকে। এক কথায় বলা যায় পিঠা পুলি উৎসবের সাথে ডিজে পার্টি সহ পৌষ সংক্রান্তির আয়োজন। সারাদিন ব্যাপি বিভিন্ন বাসা বাড়ির ছাদে প্রচুর লোকের সমাগম হয়। সন্ধ্যার আজানের সময় একটি বাশের মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় ছেলেরা। নিজেদের মুখে কেরসিন তেল নিয়ে ফু দিয়ে সে আগুনে ছুড়ে মারে। এবং সেখান হতে আগুনের গোলাকার বলয় তৈরী হয়। যা দেখে আশে পাশের ছাদের মানুষ আকৃষ্ট হয় বা মুগদ্ধ হয়। এই আগুনের বলয় বের করতে ও এক্সপার্ট লোক লাগে। যাই হোক সব শেষে আগুন জ্বালিয়ে এই অনুষ্ঠানের সমাপনী করা হয়।
আরো জানা গেছে, পুরান ঢাকার প্রায় প্রতিটি বাড়ির ছাদের চিত্র অনেকটা একই। কিশোর-কিশোরীদের ঢল আর হৈ-হুল্লোড়। আকাশে দেখা দিতে শুরু করেছে নানা নামের ঘুড়ির। শুরু হয় নিজের ঘুড়িকে সবচেয়ে উপরে তোলার প্রতিযোগিতা। সেইসঙ্গে ছিলো ঘুড়ি কাটাকাটির লড়াই। পুরান ঢাকার প্রায় সব বাড়িতেই সাকরাইন উৎসব পালন করেছে। এছাড়াও গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় আয়োজনে ফানুস আর আলোকসজ্জার সাথে চলছে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। প্রত্যেক বাসার ছাদে আলোকসজ্জা ও লাইটিং করে সাজানো হয়। এ যেন এক অন্যরকম দৃশ্য।
সরেজমিনে দেখা যায়, সূর্যের আলো যখন মেলে ওঠে, তখনই আকাসে উড়তে শুরু করে ঘুড়ি। বাসাবাড়ির ছাদে কিশোর-কিশোরীদের ঢল আর হৈ-হুল্লোড়। আকাশে দেখা দিতে থাকে চোখদার, পানদার, বলদার, দাবাদার, লেজওয়ালা, পতঙ্গ ইত্যাদি নামের ঘুড়ির। শুরু হয় নিজের ঘুড়িকে সবচেয়ে উপরে তোলার প্রতিযোগিতা। শুরু হয় ঘুড়ি কাটাকাটির লড়াই।
গতকাল শুক্রবার দুপুরের পর থেকেই আকাশের বুকে বাড়তে থাকে ঘুড়ির সংখ্যা। ঘরে ঘরে হবে পিঠাপুলির উৎসব। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেই আকাশে উড়বে রংবেরঙের ফানুস। আতশবাজির আলোয় উজ্জ্বল হবে পুরান ঢাকার আকাশ। সন্ধ্যা পার হলেই শুরু হবে সাউন্ড সিস্টেম আর নাচ-গান।
জানা যায়, পুরান ঢাকার জামাইরা পৌষ মাসের শেষে শ্বশুরবাড়ি আসতেন। তখন তারা ঘুড়ি ও নাটাই নিয়ে উৎসবে মাততেন। সব বাড়ির জামাই ঘুড়ি ওড়ালে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে তা দেখতেন এলাকাবাসী। এমনটা এখন আর হয় না। শহরে এখন শীতের তীব্রতা বেড়ে গেছে। ঘুড়ি উৎসব এখন পৌষকে বিদায় দিয়ে মাঘকে বরণ করার উৎসবের অংশ হয়ে গেছে।
এদিকে ২০২২ সালের ইংরেজি নববর্ষের প্রথম প্রহর উদযাপনের ফলে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আগুনের ঘটনা ঘটে। এছাড়াও অনবরত আতশবাজির বিকট শব্দে নগরবাসী পড়েন ভোগান্তিতে। আতশবাজিতে কেঁপে ওঠে গোটা মহানগরী আর ফানুসের আগুন ছিটকে পড়ে বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে। এসব বিষয় মাথায় রেখে পৌষ-সংক্রান্তি বা সাকরাইন উৎসবের দিন বিকট শব্দের আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলে জানা গেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ তথ্য জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা সাকরাইন উৎসবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। আর যেন এভাবে উদযাপন না করা হয় সে জন্য পুরান ঢাকার বিভিন্ন কমিউনিটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করা কঠিন। আমরা পুরান ঢাকার সর্দারদের নিয়ে বসে এ বিষয়ে কথা বলেছি, এগুলো বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছি।
এদিকে গত মাস থেকে করোনার বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় সরকার ১১ দফা বিধিনিষেধ জারি করেছে। ফলে এবারও এ ঐতিহ্যবাহী উৎসব পালনে নিরুৎসাহিত করা হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

 

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button