মতামত

ফানুস ওড়ানো : উৎসবের আগুনে ঝরছে কান্না

লীনা পারভীন: বাঙালি উৎসব বলতে আগে বুঝতাম বাংলা নববর্ষকে। ইংরেজি বর্ষবরণের রেওয়াজ আমাদের দেশে একদমই নতুনই বলা যায়। খুব বেশিদিনের চর্চা নয়। বাঙালি বরাবর উৎসবপ্রবণ ও উৎসবপ্রিয় জাতি। আমরা যেকোনো একটা উসিলা পেলেই সেখানে একপ্রকার আমুদে ভাব নিয়ে আসতে পারি। বিশ্বের নানা দেশে নিজস্ব বর্ষবরণের পাশাপাশি ইংরেজি বছরকেও স্বাগত জানায় নানা আয়োজনে।

আমাদের সংস্কৃতিতে থার্টি ফার্স্ট নাইট পালনের ঘটনা কবে থেকে শুরু হয়েছিল সেটা মনে করতে না পারলেও তা খুব পুরনো নয়। আমি কোনো দিবসকে আনন্দের সাথে বরণের বিরোধী নই বরং এই একঘেয়ে জীবনে মানুষ বাঁচবে আনন্দের মাঝে এটাই কাম্য। কিন্তু আমরা কোথায় যেন কোনো আনন্দকেই সীমার মধ্যে রাখতে পারছি না। একধরনের আদিমতা ভর করে আমাদের রক্তে।
২০০০ সালের আগমন ছিল গোটা বিশ্বের কাছে বহুল আকাঙ্ক্ষিত ও পালিত একটি দিন। মিলেনিয়ামের কাল শুরু হয়েছিল তখন। বাদ যায়নি বাংলাদেশও। সারাদেশে এখনকার মতো বর্ষবরণের আয়োজন হতো না তখন। ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল সবটাই। আমরা এটাও জানি যে, দেশের সকল বড় আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু সবসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। সুনির্দিষ্ট করে বললে টিএসসি।

দিনে দিনে আমরা কেমন যেন নিয়ন্ত্রণহীন জাতিতে পরিণত হচ্ছি। দেশ উন্নত হচ্ছে কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অনুভূতিগুলো উন্নত হচ্ছে না। আদিম থেকে যাচ্ছে।
১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাত আমাদের গোটা জাতির জীবনের একটি কলঙ্কিত রাত হিসেবে রয়ে গেছে এখনো। কেন? সেই রাতে সবাই যখন উৎসবে মেতেছিল সেখানে ছিল অনেক নারীরাও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা বরাবরই নারী-পুরুষ সবার জন্য নিরাপদ এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই নিরাপদ জায়গাকে কালিমালিপ্ত করে দিল একদল সুযোগ সন্ধানী বখাটে যুবক। বাঁধন নামের একজন তরুণীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছিল সেই রাতে। তারপর থেকে টিএসসিতে রাত ১২ টার জমায়েতের ওপর এলো নিষেধাজ্ঞা। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়কে করে তুলল অনিরাপদ।
২০১৪ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাজার কন্ঠে জাতীয় সঙ্গীত অনুষ্ঠানে নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনা, ২০১৫ সালে বাংলা নববর্ষেও একই ধরনের ঘটনা ঘটল। সেইসব ঘটনার বিচার হয়নি যদিও।আবারও আলোচনায় উৎসব পালনে আমরা কি দিনে দিনে আদিম হয়ে যাচ্ছি? ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতের আগে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটার সংবাদ পাওয়া যায়নি। ঢাকাসহ দেশের প্রায় ২০০টি স্থানে ফানুস ও বাজি থেকে আগুন লাগার সংবাদ পাওয়া গেছে।

পুরান ঢাকায় গোটা একটি বাড়ি পুড়ে গেছে গ্যাসের আগুনে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, যেকোনো উৎসবে ফানুস ওড়ানোকে নিষিদ্ধ করতে হবে। তবে একথাও ঠিক যে, এবার যে পরিমাণ ফানুস ওড়ানো হয়েছে এর আগে এত ফানুস অন্তত বর্ষবরণের রাতে দেখা যায়নি।

উৎসবের সর্বজননীতায় আমরা ফানুস ওড়ানো গ্রহণ করলাম কিন্তু তা ধারণ করতে পারলাম না। একবারও ভেবে দেখলাম না যে, আমার ছাদে ওড়ানো ফানুস কোথায় গিয়ে পড়ছে বা এর আগুন থেকে ঘনবসতিপূর্ণ এই ঢাকায় অন্য কারও ক্ষতি করছে কি না।

আমরা এমন কোনো উৎসবের আয়োজন চাই না যা সামগ্রিকভাবে আমাদের জন্য ক্ষতিকর ফলাফল বয়ে নিয়ে আসে। উৎসব হবে সবার আনন্দের খোরাক। সেই আনন্দ আয়োজনে একজন মানুষের চোখেও যেন পানি না আসে।
ফানুস ওড়াতে হয় একদম ফাঁকা জায়গায় যাতে করে আগুন কোথাও উড়ে গিয়ে পড়লেও কোনো ক্ষতি না হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাজির শব্দ ও ফানুসের আগুনের ঝলকানিতে রাস্তায় থাকা কুকুর ও নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা পাখিদের ভয়ার্ত প্রকাশও দেখেছি। পশুপ্রেমীরা তাই দাবি তুলেছে, এমন উৎসব আমরা চাই না যা অন্যের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমি সত্যি জানি না, কেন আমরা এতটা অবিবেচক হয়ে যাচ্ছি। উৎসব পালন হবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে। আমোদ আয়োজন সবই থাকবে, তবে মাত্রাহীন কোনোকিছুই ভালো কিছু বয়ে আনে না।

এমনিতেই বেশ কয়েকবছর ধরে সরকার বিভিন্ন সামাজিক উৎসবে নানা প্রকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে নিরাপত্তার নামে। বিদেশেও কিন্তু ফায়ার ওয়ার্কস হয়। এটা এখন একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। শুনেছি সেখানে কেন্দ্রীয়ভাবে স্থান নির্ধারণ করা থাকে যেখানে সবাই গিয়ে জমায়েত হয়ে উৎসব করে। তাহলে কী আমাদের দেশেও সময় এসেছে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপের?

দিনে দিনে আমরা কেমন যেন নিয়ন্ত্রণহীন জাতিতে পরিণত হচ্ছি। দেশ উন্নত হচ্ছে কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অনুভূতিগুলো উন্নত হচ্ছে না। আদিম থেকে যাচ্ছে। আদিমতারও একটা সৌন্দর্য আছে যদি সেটা পরিকল্পিতভাবে প্রকাশ করা হয়। আমাদের প্রকাশগুলো হয়ে যাচ্ছে লাগামহীন বেয়ারা। না চিন্তা করছি নিজের নিরাপত্তা, না অন্যের।

মানবিক অনুভূতিহীন জাতি কখনো উন্নত দেশের নাগরিক হতে পারে না। আমরা উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি, নিচ্ছি প্রস্তুতিও। কিন্তু সেই প্রস্তুতির একটা বড় অনুষঙ্গ হওয়া উচিত আমাদের সাংস্কৃতিক ও মানবিক উন্নয়ন। সভ্য দেশের সবকিছুরই একটা সীমা সংজ্ঞায়িত করা থাকে।

মহামারি করোনায় এমনিতেই মানুষ গুটিয়ে আছে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত গোটা মানবজাতি। এমন পরিস্থিতিতে অনেক দেশেই বর্ষবরণের উৎসবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও আমাদের দেশে কিন্তু সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করা হয়নি।

আমরা এমন কোনো উৎসবের আয়োজন চাই না যা সামগ্রিকভাবে আমাদের জন্য ক্ষতিকর ফলাফল বয়ে নিয়ে আসে। উৎসব হবে সবার আনন্দের খোরাক। সেই আনন্দ আয়োজনে একজন মানুষের চোখেও যেন পানি না আসে। কান্না মাখা উৎসবের প্রতিযোগিতা বন্ধ হোক।

লেখক: লীনা পারভীন: কলামিস্ট ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button