অর্থনীতি

নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার গুঞ্জন

টাইমস ২৪ ডটনেট: জাতীয় সংসদে ‘ব্যাংক রেজুলেশন বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ার পর প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার গুঞ্জন জোরালো হয়েছে। বিলটি পাস হওয়ায় পূর্বের পরিচালকরা—অর্থাৎ যাদের হাতে ব্যাংকের সিংহভাগ শেয়ার রয়েছে—তাদের মালিকানায় ফিরে আসার পথে আর কোনো বাধা থাকছে না। এদিকে নানা অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকটির অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট কোনো ধরনের নোটিশ বা কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়েই আগের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রভাব খাটিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান ডা. আরিফুর রহমানের নেতৃত্বে একটি ‘অবৈধ’ পর্ষদ গঠন করা হয়। এই পর্ষদের অধিকাংশ পরিচালকই স্বতন্ত্র এবং তাঁদের ব্যাংকে কোনো শেয়ার নেই, ফলে ব্যাংকের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাঁরা উন্নয়নের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থে মনোযোগী হয়ে পড়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বর্তমান পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা, তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া, শাস্তিমূলক বদলি এবং সাবেক পরিচালকদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাসহ বিভিন্ন হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থায় বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে, যার ফলে ব্যাংকের ভেতরে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে গ্রাহকদের আস্থায়। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকদের আস্থা কমে যাওয়ায় ব্যাংকের আমানত উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগের পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সময় ব্যাংকের আমানত ছিল প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমানে কমে প্রায় ৩০ হাজার কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

অমানত হ্রাস পাওয়ায় ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছে, যা গত ২৫ বছরে প্রথম বলে দাবি করা হচ্ছে। অতীতে কখনো ব্যাংকটির এসএলআর (স্ট্যাটিউটরি লিকুইডিটি রেশিও) ঘাটতি হয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়। এ তারল্য সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অনৈতিক আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঋণ ব্যবস্থাপনায়ও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান পর্ষদ নামসর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে শত শত কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

আর্থিক সূচকেও দেখা গেছে বড় ধরনের অবনতি। ২০২৪ সালে যেখানে ব্যাংকটি প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছিল, বর্তমানে সেখানে ৬৩৭ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। প্রকৃত লোকসান প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। খেলাপি ঋণের হার ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অমান্য করে কিছু ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ‘মিথ্যা আয়’ প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে।

ব্যাংকের এ সংকটের প্রভাব শিল্পখাতেও পড়েছে। আগে প্রায় ৫০০টি রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে ৫০টিরও কম প্রতিষ্ঠান সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আমদানি-নির্ভর অনেক প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সহায়তা না পেয়ে কার্যক্রম সংকুচিত বা বন্ধ করে দিয়েছে।

এ ছাড়া নিয়োগ ও পদোন্নতিতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অর্থের বিনিময়ে প্রায় ৬০০ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ, যার ফলে যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।

ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় বনানীর ইকবাল সেন্টার থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং আমানতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বর্তমান পর্ষদের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলে ব্যাংকের ভেতরে ‘ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েম করার অভিযোগও রয়েছে। ফলে আস্থা, সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার অভাবে ব্যাংকটি কার্যত ‘বন্ধ হওয়ার উপক্রম’ হয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত বর্তমান পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে রক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে আবেদনপত্র পাঠিয়েছেন সাবেক পরিচালকরা।

Related Articles

Back to top button