বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম বন্দরের দুর্নীতির রাজা পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক

স্টাফ রিপোর্টার : চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জমি ইজারা প্রক্রিয়াকে ঘিরে উঠছে গুরুতর অনিয়ম, কারসাজি ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ। উন্মুক্ত দরপত্রের আড়ালে জমি ভাগ করে বরাদ্দ, পরবর্তীতে চুক্তির শর্ত পরিবর্তন এবং অস্বচ্ছ রেয়াতি সুবিধা -সব মিলিয়ে প্রশ্নের মুখে বন্দরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র বলছে, ২০২৫ সালের ৪ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পর্ষদ সভার সিদ্ধান্ত (নং ১৯,৩৮৫)অনুযায়ী ট্রান্সমেরিন লজিস্টিকস লিমিটেডকে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্হিত ৭ একর জমি ২০ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়।বার্ষিক ১৫ কোটি টাকা ভাড়ায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে – এমনটাই দাবি কর্তৃপক্ষের।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই এই চুক্তির প্রকৃতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠে আসে।
সাত একরের পর আরও ৩.৬ একর- টেন্ডার ছাড়াই বরাদ্দ
২০২৫ সালের ২৪ জুন একই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সংলগ্ন আরও ৩.৬ একর জমির আবেদন করা হয়। মাত্র দুই মাস পর, ২৫ আগস্টের পর্ষদ সভায় ( সিদ্ধান্ত নং ১৯,৫৯৯) আগের হারে-বার্ষিক ৭ কোটি ৮৪ লাখ ২৮ হাজার ৫৭২ টাকায় -জমিটি লিজ দেওয়া হয়। বিস্ময়করভাবে, এ ক্ষেত্রে কোন উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।
প্রশ্ন উঠছে – যদি প্রকল্পটি শুরু থেকেই ১০.৬ একরের হয়, তবে পুরো জমি একত্রে দরপত্রে আহ্বান করা হয়নি কেন? জমি কি ইচ্ছাকৃতভাবে ভাগ করা হয়েছিল
প্রতিযোগিতামূলক দর এড়াতে? এতে কি নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার তৈরি হয়েছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো জমি একসঙ্গে উন্মুক্ত দরপত্রে আহ্বান করলে রাজস্ব আয় আরও বাড়তে পারত। জমি ভাগ করে দাপে দাপে বরাদ্দ দেওয়ার ফলে সম্ভাব্য প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে গেছে – যা রাষ্ট্রয় আয়ের ক্ষতির ইঙ্গিত বহন করে।

আরো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভাড়া রেয়াত নিয়ে। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রথম ৭ একর জমির টেন্ডার নথিতে দুই বছরের ভাড়া মওকুফ বা বিশেষ সুবিধার কোনো উল্লেখ ছিল না। অথচ পরবর্তীতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দুই বছরের পূর্ণ ভাড়া মওকুফ করা হয়।
হিসাব অনুযায়ী, বছরে ১৫ কোটি টাকা হিসাবে দুই বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা সরাসরি ভাড়া সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য চার্জ, সার্ভিস ফি ও আনুষাঙ্গিক সুবিধা যুক্ত করলে এ অণ্ক ৪৫ থেকে ৪৬ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
টেন্ডারে উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করা হলে তা কি সরকারি ক্রয় নীতিমালা ও আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী নয়? এ সিদ্ধান্তে কার স্বাক্ষর ছিল, কারা অনুমোদন দিয়েছেন – সে প্রশ্নেরও উত্তর মিলছে না।
সৃষ্টি হতে পারে, নৌপথ রক্ষণাবেক্ষণে বাধা দেখা দিতে পারে এবং বন্দরের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বিঘ্নিত হতে পারে।
বর্তমানে পতেঙ্গা ১১ নম্বর ঘাট থেকে ১৮ নম্বর নেভাল জেটি পর্যন্ত বন্দরের নিজস্ব খালি জমি নেই বলেও জানা গেছে। তাহলে এমন কৌশলগত জমি ২০ বছরের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
এই সিদ্ধান্ত কি তাৎক্ষণিক আর্থিক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, নাকি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা উপেক্ষা করা হয়েছে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা দাবি করছেন, অতিরিক্ত জমি বরাদ্দ ও ভাড়া রেয়াতের বিষয়ে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়কে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি। পুরো প্রক্রিয়া সীমিত প্রশাসনিক পরিসরে সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
যদি তা-ই হয়, তবে এটি শুধু প্রশাসনিক বিচ্যুতি নয়-বরং নীতিগত লঙ্ঘনের সামিল।

এই পুরো ইজারা প্রক্রিয়ার সমন্বয় ও তদারকিতে ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক। কে এই ওমর ফারুক? অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগের সাবেক নৌপরিবহণ মন্ত্রী শাহজাহান খান ও বর্তমান চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের পৃষ্ঠপোষকতায় নিরাপত্তা রক্ষী থেকে সহকারী সচিব পরবর্তীতে পদোন্নতি নিয়ে বর্তমানে পরিচালক প্রশাসক ওমর ফারুক বন্দরে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতি ও ক্ষমতার খেলার এক অঘোষিত সাম্রাজ্য। অতীতেও নিয়োগ, পদোন্নতি ইজারা প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলে উঠেছিল।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Related Articles

Back to top button