যুদ্ধে বিভীষিকায় তীব্র পানিসংকটে ইরানিরা

# যুক্তরাষ্ট্র নয়, যুদ্ধ কবে শেষ হবে ঠিক করবে ইরান
# যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু, ইরানের শর্ত আর কোনো আগ্রাসন নয়
# ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প
# যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা নয়: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
# হরমুজ প্রণালি দখলে নেওয়ার চিন্তা করছে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প
# ইরানের ৫ সহস্রাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের
# ইরানের হামলায় ইসরায়েলে আহত বেড়ে ২৩৩৯
# নিজ নাগরিকদের লেবানন ছাড়তে বলল যুক্তরাষ্ট্র
# পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
টাইমস ২৪ ডটনেট: এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তন আর অব্যবস্থাপনায় পানিশূন্য হয়ে পড়েছিল ইরান। চলমান যুদ্ধ সেই সংকটকে ঠেলে দিয়েছে খাদের কিনারে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কেশম দ্বীপের একটি লোনা পানি শোধন কেন্দ্রে বোমা হামলা চালিয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের ৩০টি গ্রামের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে ওয়াশিংটন এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার রেশ ধরে ইরানও বাহরাইনের একটি পানি শোধন কেন্দ্রে বোমা হামলা চালিয়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পানি অবকাঠামোগুলোতে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা লাখ লাখ মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
এক কোটি মানুষের শহর তেহরান বছরের পর বছর ধরে খরায় ভুগছে। গত বছরের শেষের দিকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৫ শতাংশ কমে যায়। ফলে রাজধানীর জলাধারগুলোতে পানির স্তর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ইরানের আবহাওয়া সংস্থা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, শহরগুলো পানিহীন অবস্থা দিকে যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগেই প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছিলেন, পানিসংকট ও পরিবেশগত বিপর্যয়ে তেহরান ‘বসবাসের অযোগ্য’ হয়ে পড়েছে। তিনি এমনকি রাজধানী স্থানান্তরেরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক এরিক লোব বলেন, তারা আগে থেকেই সংকটের মধ্যে ছিল। পানিসংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট চরম আকার ধারণ করেছে। এখন শাসনব্যবস্থা এসবের জন্য যুদ্ধকে দোষারোপ করার সুযোগ পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটের মূলে রয়েছে কয়েক দশকের অব্যবস্থাপনা। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান পানিনির্ভরতা বাড়াতে দ্রুত বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ শুরু করে। কিন্তু এর অনেকগুলোই ভুল স্থানে তৈরি করা হয়েছিল। এরিক লোব বলেন, বাস্তুসংস্থান বা পানির চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন আর মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সমালোচকরা এখন এসব খালি জলাধারকে ‘ব্যর্থতার স্মৃতিস্তম্ভ’ হিসেবে অভিহিত করছেন। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাম্প করা ৫০টি ভূগর্ভস্থ পানিস্তরের ৩২টিই ইরানে। সেন্টার ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড সিকিউরিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফ্রান্সেসকো ফেমিয়া বলেন, গত ডিসেম্বরের বৃষ্টিপাতও ভূগর্ভস্থ পানিস্তর পূরণ করতে পারেনি, কারণ মাটি অত্যন্ত শুষ্ক ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে ওমান সাগর থেকে পানি আমদানির কথা বলা হলেও সরকার কখনোই পানিসংকট সমাধানে সিরিয়াস ছিল না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার জনস্বাস্থ্যের চেয়ে সামরিক শক্তি, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে। পরিবেশকর্মী ও কর্মকর্তারা এ নিয়ে সরব হতে চাইলেও তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার গ্লোবাল ওয়াটার সিকিউরিটি সেন্টারের পরিচালক মাইকেল এস গ্রেমিলিয়ন বলেন, নিকট ভবিষ্যতে খরার প্রকোপ কমার কোনও লক্ষণ নেই। তিনি সতর্ক করেন যে, পানিসংকটের সঙ্গে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ যোগ হলে তা চরম খাদ্যসংকট তৈরি করতে পারে এবং মানুষকে দেশান্তরী হতে বাধ্য করতে পারে।

এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান হামলা খুব শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সোমবার ফ্লোরিডার ডোরালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দাবি করেন, এই যুদ্ধ পরিকল্পনার চেয়েও দ্রুতগতিতে লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে। বক্তব্যের আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে এক ঘণ্টার মতো কথা বলেন ট্রাম্প। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, পুতিন মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত নিরসনে সহায়তা করতে ইচ্ছুক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইরানজুড়ে ৫ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আজ থেকে আমরা তাদের ড্রোন তৈরির প্রতিটি আস্তানা সম্পর্কে জানি এবং সেগুলো একটার পর একটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ১০ শতাংশ বা তারও নিচে নেমে এসেছে।’ সাংবাদ সম্মেলনে তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা জানান তিনি। বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।’ তবে কী কী নিষেধাজ্ঞা তোলা হবে, কাদের ওপর থেকে তোলা হবে, এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট ভাবে কিছু জানাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করায় ইরানকেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তিনি সরাসরি বলেন, ‘তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে গোটা বিশ্বকে বন্দি করার কথা ভাবছে ইরানের সন্ত্রাসী সরকার। এর ফল ভুগতে হবে।’ তেলের দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রেই প্রবল চাপের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। চলতি বছরেই মিড টার্ম নির্বাচন আছে। তার আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, ‘এই মূল্যবৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদি। যুদ্ধ শেষ হলেই দাম আবার কমে যাবে।’

তবে ট্রাম্পের যুদ্ধের সময়সীমা সম্পর্কিত মন্তব্যের জবাবে আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নায়িনী বলেন, যুদ্ধে সমাপ্তি ঠিক করার ক্ষমতা তাদের হাতে, ওয়াশিংটনের নয়। ট্রাম্পের মন্তব্য ‘মিথ্যা ছাড়া আর কিছু নয়’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভুয়া সামরিক সাফল্য তৈরি করার চেষ্টা করছেন, অথচ তারা ইতোমধ্যেই বিব্রতকর পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে।’ তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে নায়িনী বলেন, ‘আমরাই এই যুদ্ধে সমাপ্তি ঠিক করব। আমরা জানি আপনার গোলাবারুদ শিগগিরই শেষ হতে চলেছে এবং আপনি মর্যাদাপূর্ণভাবে যুদ্ধে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন। কেন আপনি মার্কিন জনগণকে সত্য বলছেন না? ট্রাম্প চান না, আমেরিকানরা জানুক, পারস্য উপসাগর অঞ্চলের সমস্ত মার্কিন সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে।’ ১১ দিন আগে ইরানে ব্যাপক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায় ইরানও। এছাড়া দখলদার দেশ ইসরায়েলেও ভয়াবহ হামলা চালায় ইরান। শুরুতে চার-পাঁচ সপ্তাহ যুদ্ধ চলতে পারে বলে মন্তব্য করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সোমবার তিনি বলেছেন, ‘ওদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে।’ ট্রাম্পের এই মন্তব্যের ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই পাল্টা বিবৃতি দেয় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। সংগঠনটি জানিয়ে দেয়, ‘যুদ্ধ কবে শেষ হবে, সেটা আমরা ঠিক করব। আর কেউ নয়।’ একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে এক লিটার তেলও নিয়ে যেতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেয় তারা।
আইআরজিসির মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নায়িনী বলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সশস্ত্র বাহিনী আগ্রাসী দেশ ও তাদের মিত্রদের কাছে অঞ্চল থেকে এক লিটার তেলও রফতানি করতে দেবে না। তার মতে, তেল ও গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে আনার যে চেষ্টা করা হচ্ছে, তা ‘অস্থায়ী এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে’। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে ট্রাম্প যে মন্তব্য করেছেন তাও অস্বীকার করেন আইআরজিসির মুখপাত্র। নায়িনীর দাবি, ‘যুদ্ধের শুরুর দিনের তুলনায় এখন আরও বেশি সংখ্যায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে এবং সেগুলোর ওয়ারহেডের ওজন এক টনেরও বেশি।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত বন্ধে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে চীন, রাশিয়া ও ফ্রান্স। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেছেন, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে ইরানের প্রথম শর্ত হলো তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো আগ্রাসন চালানো যাবে না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে দেশটির সর্বোচ্চ নেতাআয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর জবাবে ইরান পাল্টা হামলা শুরু করে। ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এতে করে সংঘাত দ্রুত পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইরানের ওপর চালানো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে ব্যর্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গত সোমবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম পিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমেরিকানরা আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে আমাদের ওপর আক্রমণ করার কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই। তারা ইরানের পারমাণবিক সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ ও সমঝোতামূলক সমাধান চেয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, তাদের প্ল্যান-এ ব্যর্থ হয়েছে এবং এখন তারা অন্য পরিকল্পনা নিয়ে চেষ্টা করছে। কিন্তু সেগুলোও একইভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মনে কোনো সুনির্দিষ্ট শেষ লক্ষ্য নেই এবং সে কারণেই তারা আবাসিক এলাকাগুলোতে নির্বিচারে হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে আরাঘচি বলেন, এ‘ই সুযোগ আসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। আমেরিকানদের সঙ্গে আমাদের কথা বলার অত্যন্ত কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা রয়েছে। এজন্য আমেরিকানদের সঙ্গে আলোচনার বিষয় এবার টেবিলে থাকবে না, যোগ করেন তিনি। পূর্ববর্তী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আরাঘচি বলেন, তেহরান সর্বদা বিশ্বাসের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল, কিন্তু এর জবাবে পুনরায় শত্রুতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আলী খামেনির ছেলেকে নিয়োগ দেওয়ায় তার পিতার শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষা হবে। একইসঙ্গে কিছুটা স্থিতিশীলতাও এনে দেবে।’ তেলের দাম নিয়ে আরাঘচি বলেন, ‘তেলের দাম বৃদ্ধি আমাদের দোষ নয়। এর জন্য তিনি ইসরায়েল ও আমেরিকাকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা ও আগ্রাসনকে দায়ী করেন। তিনি আরও বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেনি। আমরা কাউকে ওই প্রণালিতে চলাচল থেকে বিরত করছি না বলেও জানান তিনি।’ নাগরিক হতাহতের বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ইরানি হামলায় কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে। তবে ইরান কোনো বেসামরিক স্থাপনা, কোনো বেসামরিক লক্ষ্য বা কোনো বেসামরিক স্থানে কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা করেনি।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তার প্রশাসন চিন্তাভাবনা করছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। তবে প্রায় ১০ দিন আগে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সিবিএস নিউজকে ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালিটি বর্তমানে উন্মুক্ত রয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস এটি ‘দখলে নেওয়ার কথা ভাবছে’ এবং সেখানে তারা ‘অনেক কিছুই’ করতে পারে। ইরান এখন পর্যন্ত প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়নি। তবে দেশটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো তেলের ট্যাংকার এ পথ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করলে সেগুলোতে হামলা চালানো হতে পারে।
এদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ এবং ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক ঘণ্টার মতো টেলিফোনে আলাপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্রেমলিন জানিয়েছে, এই আলোচনা ছিল ‘খোলামেলা ও গঠনমূলক।’ গত সোমবার হওয়া ওই ফোনালাপটি গত ডিসেম্বরের পর দুই নেতার প্রথম কথোপকথন। রুশ প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা ইউরি উশাকফ দেশটির গণমাধ্যমকে জানান, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেই আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। উশাকভ বলেন, আলোচনায় মূল গুরুত্ব দেওয়া হয় ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ইউক্রেন সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর। তিনি জানান, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধে দ্রুত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন পুতিন। ইরান দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কেও ট্রাম্পকে অবহিত করেন পুতিন। তিনি বলেন, ফ্রন্টলাইনে রুশ সেনারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছে। ইউক্রেন সংঘাতে মধ্যস্থতার জন্য ট্রাম্পের উদ্যোগকেও ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। যদিও রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হলেও এখনও যুদ্ধবিরতির কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি। উশাকভ জানান, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেই এই ফোনালাপ চেয়েছিল ওয়াশিংটন। ক্রেমলিনের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনাটি ছিল গঠনমূলক। এর আগে গত বছরের আগস্টে আলাস্কায় মুখোমুখি বৈঠক করেছিলেন ট্রাম্প ও পুতিন।
ইরানের ৫ হাজারের বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু গত ১০ দিনে ধ্বংস করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম) থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই দাবি করা হয়েছে। সেন্টকোম থেকে দেওয়া বিবৃতি অনুসারে, ধ্বংস হওয়া এসব সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ৫০টিরও বেশি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ও নৌযান রয়েছে। এছাড়াও আছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম), ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন তৈরির কারখানা, সামরিক যোগাযোগ কেন্দ্র এবং সামরিক কমান্ডকেন্দ্র। ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ। তার পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও। যুদ্ধের প্রথম দিন ২৮ অক্টোবর নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-সহ ইরানের অন্তত ৪০ জন সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিমান অভিযান চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। ইরানের জ্বালানি কাঠামো এবং কয়েকটি জ্বালানি তেলের ডিপো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্তর আরব আমিরাত, ওমানের মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলোতে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে ইরান।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের হামলায় ইসরায়েলজুড়ে কমপক্ষে দুই হাজার ৩৩৯ জনকে আহত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আহতদের মধ্যে ৯৫ জন এখনো চিকিৎসাধীন, যাদের কয়েকজনের অবস্থা অতিমাত্রায় সংকটজনক। গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে আরও বলেছে, ইরানের হামলায় আঘাত পেয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালগুলোতে ১৯১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে—এর মধ্যে একজনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক, তিনজন গুরুতর, দু’জন মাঝারি অবস্থায়, ১৭২ জনের অবস্থা হালকা এবং ১০ জন উদ্বেগজনিত রোগে ভুগছেন। এছাড়াও এখন পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ, যার মথ্যে মধ্যাঞ্চলীয় শহর বেইত শেমেশে একটি বোমাআশ্রয় কেন্দ্রে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ৯ জন নিহত হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, গত ১০ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে নিহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন এবং আহত হয়েছেন ১০ হাজারেরও অধিক।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লেবানন ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে বৈরুতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। আর যারা দেশটি ছাড়তে পারছেন না, তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলেছে তারা। গতকাল মঙ্গলবার সকালে প্রকাশিত এক নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় দূতাবাস বলে, যদি নিরাপদ মনে করেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বৈরুত রফিক হারিরি বিমানবন্দর ছেড়ে যেতে থাকা মিডল ইস্ট এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে দেশ ছাড়ার বিষয়টি ‘গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা’ উচিত। গত এক সপ্তাহ ধরে বৈরুত ও লেবাননের দক্ষিণাংশ এলাকা ইসরায়েলের অব্যাহত বোমাবর্ষণের আওতায় রয়েছে। ইসরায়েল বলছে, তারা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে এসব আক্রমণ চালাচ্ছে।
এদিকে, ইসরায়েল আবার দক্ষিণ লেবাননের মানুষদের জরুরি-ভিত্তিতে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, কারণ দেশটি ওই এলাকায় বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) মুখপাত্র আভিচায় আদ্রেয়ি বলেন, লিতানি নদীর দক্ষিণে হেজবুল্লাহর তৎপরতার কারণে ইসরায়েল ‘কঠোর’ ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি এক্স-এ লিখেছেন, ‘আমরা আবারও জরুরি আহ্বান জানাচ্ছি—আপনারা অবিলম্বে আপনার ঘরবাড়ি ছাড়ুন এবং লিতানি নদীর উত্তরে চলে যান’। সোমবার আইডিএফ জানায়, তারা লেবাননে আল-কার্দ আল-হাসান অ্যাসোসিয়েশন (একিউএএইচ)-এর লক্ষ্যবস্তুতে একাধিক হামলা চালিয়েছে; এটি হেজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট একটি আর্থিক সংস্থা। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গতকাল পর্যন্ত এই মাসের শুরুর দিকে ইসরায়েলি অভিযান শুরুর পর থেকে ৪৮৬ জন নিহত হয়েছে।



