রাজনীতিবিদেরা অতীত থেকে শিক্ষা নিতে চান না

মোঃ আবদুল মান্নান : মানুষের একটি চিরাচরিত স্বভাব হলো—সে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে চায় না। ইতিহাসে একই ধরনের ভুল বারবার ঘটেছে, আর প্রতিবারই নতুন প্রজন্ম মনে করেছে তারা হয়তো ব্যতিক্রম হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেখা যায়, সেই একই ভুল আবার ফিরে আসে নতুন রূপে। রাজনীতির ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। ক্ষমতা যখন একটি নির্দিষ্ট নেতৃত্বের হাতে দীর্ঘদিন কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন তার চারপাশে ধীরে ধীরে একটি বলয় তৈরি হয়। এই বলয়ের সদস্যরা সাধারণত সেইসব ব্যক্তি, যারা প্রধান নেতার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রদর্শন করেন। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকেন অভিজ্ঞ, স্বাধীনচেতা বা ভিন্নমত পোষণকারী নেতারা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দৃশ্য নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বহুবার দেখা গেছে—ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থানকারী নেতৃত্ব ধীরে ধীরে নিজেদের চারপাশে এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছেন, যেখানে সমালোচনা বা মতভিন্নতার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। এই বাস্তবতার আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক শাসনের অভিজ্ঞতা। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগ দেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছিল। তবে সেই দীর্ঘ শাসনের শেষদিকে একটি অভিযোগ ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠে—দল ও সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছিল। সমালোচকদের মতে, মন্ত্রিসভা এমনভাবে গঠিত হয়েছিল, যেখানে প্রবীণ বা ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা সীমিত হয়ে যায়। অভিজ্ঞ নেতাদের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত অনুগত বা প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক ব্যক্তিদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল। এর ফলে মন্ত্রিসভা ধীরে ধীরে একটি সংকীর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পরিণত হয়। রাজনীতিতে এটি একটি পরিচিত সমস্যা। যখন একটি সরকার বা দল কেবল অনুগত নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তখন সেখানে মতভিন্নতার জায়গা কমে যায়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় পর্যাপ্ত বিতর্ক বা বিশ্লেষণ ছাড়াই নেওয়া হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মন্ত্রিসভা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক মস্তিষ্ক। এখানে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, মতাদর্শ এবং রাজনৈতিক পটভূমির মানুষ একত্রিত হন। তাদের আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের বড় বড় নীতি নির্ধারণ হয়। কিন্তু যদি মন্ত্রিসভা এমনভাবে গঠিত হয় যেখানে সবাই মূলত প্রধান নেতার মতামতের প্রতিধ্বনি করেন, তাহলে সেই কাঠামো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাজনীতিতে একটি প্রচলিত ধারণা আছে—echo chamber। অর্থাৎ এমন একটি পরিবেশ যেখানে সবাই একই মতামত পুনরাবৃত্তি করেন এবং ভিন্নমত প্রায় অনুপস্থিত থাকে। একটি সরকার যখন এই পরিস্থিতিতে পৌঁছে যায়, তখন তার জন্য বাস্তবতা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো সরকারের পতন কখনোই হঠাৎ ঘটে না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। প্রথমে জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। তারপর প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অহংকার—এসব বিষয় ধীরে ধীরে জমতে থাকে। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় সমালোচনাহীন নেতৃত্ব, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রাজনীতির একটি অমোঘ সত্য হলো—দীর্ঘ ক্ষমতা অনেক সময় নেতৃত্বকে সমালোচনা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যখন কোনো নেতা কেবল প্রশংসা শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তার ধারণা দুর্বল হয়ে যায়। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আলোচনায় উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম— তারেক রহমান। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কিভাবে তারা অতীতের ভুলগুলো এড়িয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করবেন। কিন্তু সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোতেও এমন কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যা অতীতের রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিল রাখে। বিশেষ করে মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে যে, সেখানে স্বাধীন মত প্রকাশে সক্ষম সিনিয়র নেতাদের উপস্থিতি খুব বেশি নয়। রাজনীতিতে আনুগত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি দল পরিচালনার জন্য নেতৃত্বের প্রতি আস্থা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু যখন পুরো নেতৃত্ব কাঠামোই অনুগত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়, তখন সেখানে মতবিরোধের জায়গা থাকে না। এর ফলে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়—যেখানে কেউ ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও কথা বলতে চান না। ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক শক্তিশালী নেতাও শেষ পর্যন্ত এই সমস্যার কারণে সংকটে পড়েছেন। কারণ নেতৃত্বের চারপাশে যদি কেবল প্রশংসাকারী মানুষ থাকে, তাহলে বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে “মুরুব্বি নেতৃত্ব” একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটি কেবল বয়সের প্রশ্ন নয়; বরং অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং বাস্তবতার গভীর উপলব্ধির বিষয়। একজন মুরুব্বি নেতা অনেক সময় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে শান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেন। তিনি জানেন কখন আপস করতে হয়, কখন কঠোর হতে হয়, আর কখন পিছু হটতে হয়। কিন্তু যদি মন্ত্রিসভায় এমন নেতৃত্বের উপস্থিতি কম থাকে, তাহলে সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় একমুখী হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত আন্দোলনের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—সবকিছুই রাজপথে সংগঠিত হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন রাজপথে সংগ্রাম করেছেন, তারা সাধারণ মানুষের মনোভাব বুঝতে বেশি সক্ষম। কিন্তু যদি সেই নেতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে দূরে রাখা হয়, তাহলে সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা হলো—যারা অতীত ভুলে যায়, তারা একই ভুল আবার করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বহুবার দেখা গেছে। কিন্তু প্রতিবারই সেই কেন্দ্রীকরণ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্যই জরুরি। বাংলাদেশের রাজনীতি আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়ে নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তারা কি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে? নাকি আবারও এমন একটি ক্ষমতার বলয় তৈরি হবে, যেখানে ভিন্নমত শোনা যায় না? ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করা গেলে সেই সংস্কৃতি দীর্ঘদিন টিকে থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর—নেতৃত্ব কি সমালোচনা শুনতে প্রস্তুত, নাকি ইতিহাস আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছে?


