মতামত

যেহেতু স্লোগান একটি প্রতিবাদের ভাষা, তাই সেটা মার্জিতই হওয়া উচিত

মোঃ আবদুল মান্নান : ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে কখনো অস্ত্র ছিল, কখনো ছিল কলম, আবার কখনো ছিল মানুষের কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বর যখন একত্রিত মানুষের আবেগ, ক্ষোভ ও স্বপ্নের ভাষায় রূপ নেয়, তখনই জন্ম হয় স্লোগানের। স্লোগান মূলত কিছু শব্দের সমষ্টি হলেও এর শক্তি কখনো কখনো বিপ্লবের সমান। মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যখন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়, তখন তা রাস্তায় রাস্তায় ধ্বনিত হয়ে ওঠে স্লোগান হয়ে। স্লোগান পারে ইতিহাস বদলে দিতে। পারে দীর্ঘ অন্ধকার রাতকে পরিণত করতে বিজয়ের প্রভাতে। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে স্লোগান তাই শুধু একটি শব্দ বা বাক্য নয়; এটি জাতির চেতনার বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার সংগ্রাম, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণজাগরণ কিংবা সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই স্লোগান মানুষের প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার প্রথম বড় বিস্ফোরণ। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর কেন্দ্রীয় সরকার যখন ঘোষণা করল—“উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”, তখন তা পূর্ব বাংলার মানুষের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে ধরা পড়েছিল। এই ঘোষণার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ প্রথমে প্রতিবাদ শুরু করে। কিন্তু খুব দ্রুত সেই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র সমাজে। রাজপথে নেমে আসে ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক—সব শ্রেণির মানুষ। রাজপথ তখন কেঁপে উঠছিল একটাই দাবিতে—“রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”। এই স্লোগান ছিল কেবল একটি ভাষার দাবি নয়; এটি ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের দাবি। এটি ছিল বাঙালি জাতিসত্তার আত্মমর্যাদার ঘোষণা। এই সময় আরও কিছু স্লোগান মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। যেমন—“তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা” “নাজিম-নূরুল দুই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই” এসব স্লোগান শুধু প্রতিবাদের ভাষা ছিল না; এগুলো ছিল বাঙালির সম্মিলিত আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের রক্তে রাজপথ ভিজে গেলে সেই স্লোগানগুলো আরও গভীর অর্থ ধারণ করে। বসন্তের বাতাসে মিশে গিয়েছিল রক্তের গন্ধ। সেই রক্তের ওপর দাঁড়িয়েই বাঙালি জাতির রাজনৈতিক চেতনা নতুন পথে যাত্রা শুরু করে। ১৯৬০-এর দশক থেকে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির আন্দোলন আরও তীব্র হতে থাকে। ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান—সবকিছু মিলিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তখন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সেই আকাঙ্ক্ষা বিস্ফোরিত হয় এক মহাসমুদ্রে। রাজপথ, গ্রাম, শহর—সবখানেই শোনা যেতে থাকে—“বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো” এই স্লোগান ছিল সরাসরি যুদ্ধের আহ্বান। এটি মানুষের মনে সাহস জাগিয়ে তুলেছিল। আরেকটি স্লোগান—“তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা” এই স্লোগানটি ছিল বাঙালির ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্লোগানগুলো শুধু রাজনৈতিক ছিল না; এগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক শক্তিও কাজ করেছিল। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই উচ্চারণ—“বাঙলার জয় হোক, বাঙালির জয় হোক” স্বাধীনতার সংগ্রামে নতুন করে অনুরণিত হয়েছিল। স্লোগান তখন হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়ানোর শক্তি, জনগণের ঐক্যের প্রতীক এবং স্বাধীনতার স্বপ্নের ভাষা। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের রাজনীতি নানা সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। ১৯৮০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আবারও স্লোগান মানুষের প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠে। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর শহিদ নূর হোসেন রাজপথে নেমেছিলেন বুক ও পিঠে দুটি বাক্য লিখে—“স্বৈরাচার নিপাত যাক” “গণতন্ত্র মুক্তি পাক” এই দুটি বাক্য ইতিহাসে অমর হয়ে গেছে। নূর হোসেনের আত্মত্যাগ সারা দেশে আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে দেয়। পরবর্তী ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এই স্লোগানগুলো রাজপথ থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হয়। শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারের পতনের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলনের সফল সমাপ্তি ঘটে। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন ছিল নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে লাখো মানুষ শাহবাগে সমবেত হয়েছিল। সেই সময় আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে উঠেছিল—“ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই” আরেকটি স্লোগান ছিল— “রাজাকারের ঠিকানা, সোনার বাংলায় হবে না” এই স্লোগানগুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে একই সময় অন্য রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমাবেশেও ভিন্নধর্মী স্লোগান শোনা গিয়েছিল, যা সমাজে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে আবার দেখা যায় নতুন ধরনের স্লোগান। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথে নেমে আসে, তখন তাদের মুখে শোনা যায় ব্যঙ্গ, শ্লেষ ও বেদনার মিশ্রণ। যেমন—“আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে” আরেকটি স্লোগান ছিল— “আমার মা কাঁদছে, নৌমন্ত্রী হাসছে” এই স্লোগানগুলো তরুণদের হতাশা ও ক্ষোভের প্রতিফলন ছিল। সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনেও স্লোগান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে আবার ফিরে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি—“একাত্তরের হাতিয়ার, গর্জে ওঠো আরেকবার” পাশাপাশি শোনা গেছে— “আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম” “দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ” এসব স্লোগান আন্দোলনের শক্তিকে আরও সংগঠিত করেছে। তবে সব স্লোগান ইতিহাসে সম্মানের জায়গা পায় না। কিছু স্লোগান আছে যা সহিংসতা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়। যেমন— “একটা একটা লীগ ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর” “একটা দুইটা লীগ ধর, সকাল-বিকাল নাশতা কর”, “টিনের চালে কাউয়া, তা…. জি…. শা…” “১ ২ ৩ ৪, তা…. কোন চ্যা…. বা…” এসব স্লোগান কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। একইভাবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অপমান করে দেওয়া স্লোগানও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে। ইতিহাসে এসব স্লোগান টেকে না। মানুষ এগুলো ভুলে যায়, কিন্তু এগুলো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একসময় ভিন্ন মতাদর্শের নেতাদের মধ্যেও পারস্পরিক সম্মান ছিল। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো মুসলিম লীগের নেতা খান এ সবুর এবং আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্ক। রাজনৈতিকভাবে তারা ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার নেতা। তবুও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান খুলনায় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গেলে প্রায়ই খান এ সবুরের বাসায় উঠতেন। আবার খান এ সবুরও মাঝে মাঝে শেখ মুজিবকে আর্থিক সহায়তা পাঠাতেন। রাজনীতির ময়দানে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সৌজন্য বজায় রাখতেন। এটি ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতার পর যখন খান এ সবুর কারাগারে যান, তখনও সেই মানবিক সম্পর্কের দৃষ্টান্ত দেখা যায়। বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের বাসা থেকে কারাগারে তার জন্য খাবার পাঠানো হতো। একই সঙ্গে তার পরিবারের খোঁজখবরও নেওয়া হতো। এই ঘটনা দেখায় যে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও মানবিক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব। আজকের বাংলাদেশে তরুণরাই আগামী দিনের রাষ্ট্র নির্মাতা। তাদের হাতে যদি থাকে ইতিবাচক ভাষা, যুক্তিবোধ ও মানবিকতা—তবে রাজনীতি আবারও সভ্যতার পথে ফিরতে পারে। তরুণদের মনে রাখতে হবে—স্লোগান শুধু ক্ষণিকের উত্তেজনা নয়; এটি ইতিহাসের অংশ হয়ে যেতে পারে। যে স্লোগান মানুষের ঐক্য গড়ে তোলে, তা যুগ যুগ ধরে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্লোগান কখনো স্বাধীনতার ডাক দিয়েছে, কখনো গণতন্ত্রের দাবি তুলেছে, আবার কখনো মানুষের ক্ষোভের ভাষা হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি বিষয় সবসময় সত্য—স্লোগান তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তা মানুষের মুক্তি, ঐক্য এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়। আজকের তরুণদের দায়িত্ব হলো সেই ইতিবাচক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—তরুণরা ঠিক থাকলে দেশও ঠিক থাকে। আর স্লোগান তখনই মহৎ হয়, যখন তা মানুষের আশা ও মুক্তির কথা বলে।

Related Articles

Back to top button