মতামত

একটি নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ওয়াটার গার্ডেন ও স্পা নির্মাণ করেছেন সদ্য বিদায়ী গভর্নর এইচ এম মনসুর, বিষয়টি নিয়ে সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

মোঃ আবদুল মান্নান : টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার দাপনাজোর এলাকার একটি বালিকা বিদ্যালয়কে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিছক কোনো স্থানীয় বিরোধ নয়। এটি শিক্ষা, নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে রিসোর্ট ও স্পা সেন্টারে যাতায়াতের বিষয়টি শুধু অবকাঠামোগত ত্রুটি নয়; এটি একটি সমাজের মূল্যবোধ, নিরাপত্তা এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গ্রামবাংলায় একটি বিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি একটি এলাকার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কেন্দ্র। বিশেষ করে একটি বালিকা বিদ্যালয় সমাজে নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই বিদ্যালয়ের পরিবেশ যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে তা পুরো সমাজের জন্যই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত মার্থা লিডস্ট্রিম নূরজাহান বালিকা উচ্চবিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে দাপনাজোর ও আশপাশের এলাকার মেয়েদের শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিষ্ঠালগ্নে এই বিদ্যালয়ে চার শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করত। শান্ত পরিবেশ, নিরাপদ অবস্থান এবং সমাজের সমর্থনের কারণে এটি দ্রুত এলাকার একটি মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ের ছাত্রীর সংখ্যা কমতে কমতে এখন ৮০ জনে নেমে এসেছে। স্থানীয়দের মতে, বিদ্যালয়ের আশপাশে গড়ে ওঠা কিছু বাণিজ্যিক সেন্টার এবং অবকাঠামোগত সিদ্ধান্তই এই পরিবর্তনের মূল কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ২০২০ সালে বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় প্রথমে গড়ে তোলেন ওয়াটার গার্ডেন নামে একটি রিসোর্ট, পরবর্তী সময়ে সেখানে একটি স্পা সেন্টারও চালু করেন। বিতর্কের মূল কারণ হলো—বিদ্যালয় ও রিসোর্টের জন্য আলাদা প্রবেশপথের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে একই গেট ব্যবহার করছে বিদ্যালয়ের কিশোরী ছাত্রীরা এবং রিসোর্টের অতিথিরা। প্রতিদিন সকালে স্কুলে প্রবেশের সময় এবং বিকেলে ছুটির সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রিসোর্টে আসা অতিথিদের একই পথে চলাচল করতে হয়। এতে অভিভাবক, শিক্ষক এবং স্থানীয় লোকজনের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা চাই আমাদের মেয়েরা নিশ্চিন্তে স্কুলে যাতায়াত করুক। কিন্তু রিসোর্টের অতিথিদের সঙ্গে একই গেট ব্যবহার করায় আমরা সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি।” এই সমস্যাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে বহুবার আলোচনা হয়েছে। ২০২২ সালে জেলা শিক্ষা অফিস থেকে তৎকালীন শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা খানম ১৫ দিনের মধ্যে আলাদা গেট নির্মাণের নির্দেশ দেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। ২০২৪ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট বিদ্যালয় ও রিসোর্টের জন্য পৃথক গেট নির্মাণের নির্দেশ দেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। আইনের শাসনের প্রশ্নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আদালতের নির্দেশ যদি বাস্তবায়িত না হয়, তবে তা রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। রিসোর্টের ভেতরে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ আয়োজন করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, মাসে একবার বিশেষ অফারের মাধ্যমে নৃত্য পরিবেশনা এবং বিদেশি মদের আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানের টিকিটের মূল্য প্রায় তিন হাজার টাকা। এ ছাড়া থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে কনসার্ট আয়োজনের সময় প্রকাশ্যে মদ্যপানের ঘটনাও দেখা যায় অহরহ। একটি বালিকা বিদ্যালয়ের পাশেই যদি এই ধরনের আয়োজন হয়, তবে তা সামাজিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে—এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে এমন পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিদ্যালয়টি প্রায় ৩০৬.৫ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমানে প্রায় ১০০ শতাংশ জমি রিসোর্টের দখলে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বাসভবনও রিসোর্টের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে কিছু শিক্ষক জানিয়েছেন। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি একটি গুরুতর বিষয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি অন্য কাজে ব্যবহার করা শুধু নৈতিক নয়, আইনি প্রশ্নও তৈরি করতে পারে। স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি নির্মাণের জন্য সরকারিভাবে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থ দিয়ে রিসোর্টের বাউন্ডারি নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে উপজেলা প্রশাসন কাজ পরিদর্শনে গিয়ে কাজ দেখতে না পেয়ে বিল বন্ধ করে দেয়। এরপর দ্রুত টিন দিয়ে বাউন্ডারি দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা জরুরি। কারণ সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক প্রত্যাশা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এই এলাকারই কৃতীসন্তান হিসেবে পরিচিত। ফলে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন বিতর্ক তৈরি হলে তা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সমাজে যেসব ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকেন, তাদের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশাও থাকে বেশি। কারণ তাদের সিদ্ধান্ত অনেক সময় সমাজের জন্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে। বাসাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ রক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বক্তব্য অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, বিদ্যালয় ও রিসোর্টের জন্য অবিলম্বে পৃথক প্রবেশপথ এবং সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ের জমিসংক্রান্ত অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। তৃতীয়ত, আদালতের নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চতুর্থত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সামাজিক ও নৈতিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। একটি সমাজের অগ্রগতির অন্যতম সূচক হলো সে সমাজ তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা কতটা রক্ষা করতে পারে। একটি বিদ্যালয় কেবল ভবন বা জমির সমষ্টি নয়; এটি একটি সমাজের আশা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের প্রতীক। যদি কোনো কারণে সেই প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—পুরো সমাজের মূল্যবোধের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। বাসাইলের এই ঘটনাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। উন্নয়ন, ব্যবসা বা ব্যক্তিগত উদ্যোগ—সবকিছুরই একটি সামাজিক সীমা রয়েছে। সেই সীমা অতিক্রম করলে তা সমাজে অস্বস্তি ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। এখন প্রয়োজন বিতর্ক নয়, সমাধান। একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একটি বালিকা বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিরাপদ রাখা মানে একটি সমাজের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখা।

লেখক: মোঃ আব্দুল মান্নান, সাংবাদিক, রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিষ্ট।

Related Articles

Back to top button