বাংলাদেশ

সরকারি সম্পদ লুটে তাজুলের সাম্রাজ্য

এক যুগ ধরে কোটি টাকার রাজস্ব গিলে খাওয়ার রোমহর্ষক ফিরিস্তি

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেল ঢাকা-এর উচ্চমান সহকারী মো. তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি দখল, ভাড়া বাণিজ্য এবং নজিরবিহীন চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। ২০১১ সাল থেকে সুদীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় তিনি গড়ে তুলেছেন এক দুর্ভেদ্য ‘দুর্নীতি সিন্ডিকেট’। সরকারি কোয়ার্টার, দোকান এবং ক্যান্টিনকে নিজের ব্যক্তিগত আয়ের উৎস বানিয়ে সরকারকে কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ এখন টক অব দ্য টাউন।
সাবেক কেন্দ্রীয় সচিবালয় (এনএসআই) ভবন সংলগ্ন এলাকার সরকারি বাসাগুলো ছিল তাজুলের ব্যক্তিগত আয়ের খনি। অভিযোগ রয়েছে, এনএসআই এলাকার ৫১টি ঘর থেকে তিনি প্রতি মাসে প্রায় ৫,০০,০০০ টাকা ভাড়া আদায় করছেন, যার এক পয়সাও সরকারি তহবিলে জমা পড়ে না। এছাড়া রাজারবাগ এলাকায় আরও একটি সরকারি কোয়ার্টার দখল করে এক বছর সম্পূর্ণ বিনা ভাড়ায় কাটান তিনি। বর্তমানেও নিজস্ব দখলে রাখা ৩টি বাসা থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৪০,০০০ টাকা ভাড়া আদায় করে নিচ্ছেন তিনি। এই আবাসন বাণিজ্যে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব লোপাট হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পূর্ত ভবনের সাধারণ কর্মীদের কাছে তাজুল ইসলাম এখন চাঁদাকরাজ হিসেবে কুখ্যাত। অভিযোগ রয়েছে, ক্যান্টিন বরাদ্দ দেওয়ার সময় তিনি এককালীন ৫,০০,০০০ টাকা ঘুষ নিয়েছেন এবং বর্তমানেও ওই ক্যান্টিন থেকে মাসিক ৩৫,০০০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করছেন। সরকারি সম্পত্তিকে নিজের পৈতৃক সম্পত্তির মতো ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত তিনি ও তার অনুসারীরা এই লুটতরাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তাজুলের এই অবৈধ আয়ের সাম্রাজ্য কেবল সরকারি জায়গাতেই সীমাবদ্ধ নেই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁদাবাজির টাকা দিয়ে রাজধানীর নন্দিপাড়ায় ১০ কাঠা জায়গা কিনে সেখানে বর্তমানে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই বিশাল নির্মাণযজ্ঞে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন মফিজ ও আলী হুজুর নামের আরও দুই ব্যক্তি। এই ত্রয়ীর সিন্ডিকেটই মূলত গণপূর্তের বিশাল এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। তাজুলের আগ্রাসন থেকে রেহাই পায়নি বিচার বিভাগের প্রশাসনিক এলাকাও। প্রথম কোর্ট অব সেটেলমেন্ট এলাকায় আদালতের গাড়িচালকদের জন্য নির্ধারিত দুটি কক্ষ তিনি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। ফলে চালকরা থাকার জায়গা না পাওয়ায় আদালতের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম বিঘ্ন ঘটছে। এছাড়া ২০১১ সাল থেকে ১ম ১২ তলা ভবনের পূর্ব পাশের একটি টিনসেড অবৈধভাবে দখল করে দীর্ঘকাল বসবাস করেছেন তিনি, যেখানে গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল বাবদ সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২২,৬২,০০০ টাকা। বিস্ময়কর বিষয় হলো, গত ৩০ মার্চ ২০২৩ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) এসব অনিয়মের বিস্তারিত তুলে ধরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকায় তাজুল ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই প্রকাশ্য লুটতরাজ বন্ধে এবং অভিযুক্ত তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এখন ফুঁসে উঠেছে সচেতন মহল। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার না করলে এই দুর্নীতি আরও শিকড় গাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেল ঢাকা-এর উচ্চমান সহকারী মো. তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

Related Articles

Back to top button