স্বাস্থ্য ক্যাডারে পদোন্নতি বৈষম্য: ‘বিপ্লব পরবর্তী’ সময়েও বঞ্চনার শিকার ২১-২৫তম বিসিএস কর্মকর্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক : ৫ আগষ্ট ২০২৪ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটে। আশা করা হয়েছিল এ পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে বিভিন্ন ক্যাডারে কর্মরত বঞ্চিত, নির্যাতিত ও বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তাদের দূর্ভোগের অবসান ঘটবে।
প্রশাসন, পুলিশ ও শিক্ষা ক্যাডার সহ বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের উল্লেখযোগ্য পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পরপরই প্রশাসন ক্যাডারের যারা উপসচিব ছিলেন তাঁরা পরপর দুটি পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত সচিব হয়েছেন।
অবসরপ্রাপ্তদের অনেককেই ভুতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি দিয়ে আর্থিক সুবিধাদি প্রদান করা হয়েছে। চাকরিচ্যুত অনেককেই হৃত চাকরি ফেরত দেয়া হয়েছে। পদের অতিরিক্ত (সুপার নিউমারারি) পদ সৃজন করে প্রায় সবাইকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ক্যাডারের বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অনেকেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুনরায় বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। অন্য সকল ক্যাডারে ৪র্থ গ্রেডে পদোন্নতি পাওয়ার জন্য সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় পাশ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু স্বাস্থ্য ক্যাডারে পদোন্নতির জন্য সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় পাশ ছাড়াও উচ্চতর ডিগ্রী ও কমপক্ষে তিনটি প্রকাশনা থাকা বাধ্যতামূলক। আবার উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের জন্য কঠিন সিলেবাস সমাপনের মাধ্যমে বিশেষায়িত জ্ঞানার্জন এবং দূরুহ দীর্ঘমেয়াদী সার্বক্ষনিক প্রশিক্ষণলাভ করে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। এতে ডিগ্রি অর্জনের জন্য চার থেকে আট বছর পর্যন্ত লেগে যায়। ফলে বিভিন্ন সময় চিকিৎসা শাস্ত্রে জ্ঞানী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সিনিয়র স্কেল পাশের শর্ত অব্যাহতি দিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনায় পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এতে উচ্চ শিক্ষিত, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবায় অনন্য সাধারণ ভুমিকা রাখছেন। ৫ আগষ্টের পর ১০-২০ তম বিসিএস পর্যন্ত স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা পাশের শর্ত শিথিল রেখে সহযোগী অধ্যাপক এমনকি অধ্যাপক পদেও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এর ১০ থেকে ১৫ বিসিএসের বেশীরভাগ অবসরে চলে গেছেন বাকী ১৬-২০ বিসিএস নিয়োগ হয়েছিল ১৯৯৬- ২০০০ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। কিন্তু ২১-২৫ বিসিএস এর নিয়োগ হয়েছিল ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে। ফলে একই যোগ্যতা ও একই ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এক গ্রুপকে সহযোগী অধ্যাপক এমনকি অধ্যাপক পদেও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে এবং অন্য গ্রুপকে সহযোগী অধ্যাপক পদেও পদোন্নতি দেয়া হচ্ছেনা। ২১ বিসিএস ও তৎপরবর্তী উচ্চতর ডিগ্রিধারী ও দক্ষ বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা যাদের চাকরির বয়স ১৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে চার দলীয় জোট সরকারের আমলে নিয়োগ প্রাপ্ত বিধায় কৌশলে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছেনা। এদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যাদের বিগত সরকারের আমলে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা দিতে বাধা গ্রস্থ করা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা ছাড়া ২০ শতাংশ সমমানের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের পাবলিক সার্ভিস কমিশন সরাসরি নিয়োগ দেয়। এমনকি বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া ও এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় পাশ, বিভাগীয় পরীক্ষা, বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ ছাড়াই সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সেবা বিভাগের সচিব সাইদুর রহমান ২০১৭ সালের পদোন্নতি বিধিমালা গত তিন মাস যাবত সংশোধনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কিন্তু পদোন্নতি বঞ্চিত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন বিধি সংশোধনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ। তাই সংশোধনের আগে তাঁদের নামে একবছরের জন্য সৃজিত পদের অতিরিক্ত পদগুলো বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তাই পূর্বের নজির অনুসরণ করে সিনিয়র স্কেলের পাশের শর্ত শিথিল করে মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনায় সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন জানিয়েছেন। এতে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।
উল্লেখ্য যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মার্চ ২০২৫ এ প্রকাশিত হেলথ বুলেটিনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বিএমডিসির নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা ১ লক্ষ ৪১ হাজার ৯৯৯ জন যাদের অনেকেই বিদেশে থাকেন। এ সংখ্যা মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ১০ লক্ষ বিবেচনায় প্রতি হাজার মানুষের বিপরীতে ডাক্তার আছেন মাত্র ০.৮৩ জন। যা একেবারেই অপ্রতুল। অন্যদিকে সরকারী ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ৭০০ হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ৩৭ টি মেডিকেল কলেজে ২৯ হজার ১৮২ জন চিকিৎসক ও ৪৫০০ জন প্রশিক্ষণার্থী কর্মরতঃ রয়েছেন। প্রায় প্রতিটি মেডিকেল কলেজেই শিক্ষক এবং সকল হাসপাতালে চাহিদার তুলনায় চিকিৎসকের মারাত্মক সংকট বিদ্যমান।
এমতাবস্থায় স্বাস্থ্য ক্যাডারের যেসব কর্মকর্তা উচ্চতর ডিগ্রিধারী, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ এবং যাদের চাকরি ১৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, তাদেরকে সিনিয়র স্কেল পাশের শর্ত শিথিল করে পূর্বের নজির অনুসরণ মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনায় সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রদান করলে একদিকে যেমন দেশ ও জাতির কল্যাণ হবে। অপরদিকে বিগত সরকারের আমলে বঞ্চিত ও নির্যাতনের শিকার চিকিৎসকগন সুবিচার পাবেন।



