আইন-অপরাধ

৪ শিশুর ভবিষ্যৎ কেড়ে নিল গামছা পার্টি

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: আজাদ পাটোয়ারি ঝালমুড়ি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। স্ত্রী তানিয়া আক্তার ও চার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে থাকতেন তুরাগের ধউর এলাকায় ভাড়া বাসায়। স্বপ্ন দেখতেন সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবেন। কিন্তু ‘গামছা পার্টি’ তা হতে দিল না, কেড়ে নিল প্রাণ। ২৯ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় ঝালমুড়ি বিক্রির জন্য বের হলে আর ফিরতে পারেননি আজাদ। এক মাস পর ২৯ জানুয়ারি তার লাশ খুঁজে পান স্ত্রী তানিয়া। চার শিশুর ভবিষ্যৎই এখন অন্ধকারে। এর তিনজনই পড়ে স্থানীয় মেধাবিকাশ মডেল একাডেমিতে- পাপিয়া তৃতীয় শ্রেণিতে, ইয়াসিন প্রথম ও ফারহানা নার্সারিতে। সবার ছোট রাবেয়া।
ওই দিন সকালে সিলভারের পাতিলে ঝালমুড়ি বানানোর সামগ্রী নিয়ে বাসা থেকে বের হন আজাদ। স্ত্রীকে বলে আসেন, মিরপুরে সনি সিনেমা হলের সামনে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিক্রি করবেন ঝালমুড়ি। তানিয়া জানান, পাপিয়ার স্কুলখাতায় পাতা আছে মাত্র তিনটি। ছিঁড়ে গেছে ইয়াসিনের প্যান্টও। দুধ শেষ রাবেয়ার। এর মধ্যে বের হওয়ার আগমুহূর্তে রাবেয়ার হাত থেকে পড়ে দু-টুকরো হয়ে যায় মোবাইল ফোন সেটটি। তা হাতে নিয়ে বের হন আজাদ।


প্রতিদিন রাত সাড়ে ১১টার মধ্যে বাসায় ফিরলেও ওইদিন ১২টা পেরিয়ে গেলেও বাসায় ফিরছিলেন না আজাদ। সারা দিনে স্বামীর সঙ্গে কথাও বলতে পারেননি তানিয়া। পরে স্বজনদের নিয়ে সম্ভাব্য সব স্থানে খুঁজেও সন্ধান মেলেনি। এ নিয়ে ১ জানুয়ারি তুরাগ থানায় জিডি করেন আজাদের শ্যালক রাশেদ।
তানিয়া বলেন, ঘরে নেই একমুঠো চাল। স্বামীকে খুঁজতে গিয়ে অনিয়মিত হওয়ায় যে বাসায় কাজ করতাম তারা আমাকে বাদ দেয়। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধপ্রায়। বাকি পড়েছে বাসাভাড়া। স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। এর মধ্যে তেজগাঁওয়ের ডিসি (তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার) বিপ্লব বিজয় তালুকদার স্যারের একটি ফেসবুক পোস্ট ২৯ জানুয়ারি দেখে আমার বাড়িওয়ালার ছেলে মাহি। সে আমাদের ছবিটি দেখায়। এরপর ডিসি স্যার ও খিলক্ষেত পুলিশের সহযোগিতায় ছুটে যাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। আজাদের লাশ সেখানে ফ্রিজিং করে রাখা ছিল।
উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার বলেন, ৫ জানুয়ারি রাত দেড়টায় মগবাজার ফ্লাইওভারের ওপর সোনারগাঁও প্রান্তে মিজানুর রহমান মিজান নামে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রের লাশ পায় পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশের একটি টিম ২৩ জানুয়ারি রাতে টঙ্গী থেকে নুরুল ইসলাম ও ২৫ জানুয়ারি গাজীপুরা ও তুরাগ এলাকা থেকে আবদুল্লাহ বাবু ও জালাল নামে তিনজনকে গ্রেফতার করে।
নুরুল ইসলাম সিএনজি অটোরিকশা চালক। পুলিশকে সে জানায়, অটোরিকশা চালানোর আড়ালে তার মূল পেশা ছিনতাই। আটজন মিলে গড়ে তুলেছে অটোরিকশা দিয়ে ছিনতাই ও হত্যার দুটি গ্রুপ। রাত ৮টার পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত রাজধানী ও সংলগ্ন এলাকায় যাত্রী উঠিয়ে চলতে থাকে অপকর্ম। প্রতি রাতে ১-৬টি ছিনতাই করে ওরা। ‘টার্গেট ব্যক্তি’র পাশে সিএনজি থামিয়ে তার গন্তব্য জানতে চায় নুরুল। তিনি যে গন্তব্যই বলুক না কেন সে পেছনের সিটে যাত্রী হিসেবে বসা তার দুজন সহযোগীও ওই গন্তব্য বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকার কথা বলে। টার্গেট ব্যক্তি সিএনজিতে উঠলে কৌশলে তাকে মাঝে বসানো হয়। অনেক সময় রাজি না হলে একজন বমির ভান করে বা অন্য কোনো অজুহাতে টার্গেট ব্যক্তিকে মাঝের সিটে বসায়। অটোরিকশা নির্জন স্থানে পৌঁছামাত্র শাহীন টার্গেটের পিঠে শক্ত করে আঙুল উঁচিয়ে ধরে জানায়, আমরা ছিনতাইকারী।


যা আছে দিয়ে দে। বিনা বাধায় টাকা, পয়সা, মোবাইল ও মূল্যবান মালামাল দিয়ে দিলে তাকে সুবিধাজনক স্থানে সিএনজি থেকে নামিয়ে দেয়। তবে কেউ দিতে না চাইলে, বাধা দিলে বা চিৎকার করলে টার্গেট ব্যক্তির দুপাশে বসা শাহিন ও নাজমুলের একজন শক্ত করে তার হাত ধরে এবং অন্যজন গলায় গামছা প্যাঁচিয়ে ধরে। এতে কেউ মারা গেলে তার লাশ অটোরিকশা থেকে নামিয়ে ফেলা হয় ফ্লাইওভারের ওপর বা নির্জন অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে।
নুরুল ইসলাম আরও জানায়, ২৯ ডিসেম্বর রাত ১১টার দিকে আজাদকে ওরা স্লুইস গেট এলাকা থেকে যাত্রী হিসেবে সিএনজিতে ওঠায়। আজাদ কামারপাড়ায় যেতে চেয়েছিল। তাকে ওঠানোর পর টাকা-পয়সা কেড়ে নিতে চাইলে আজাদ বাধা দেয়। এ সময় নাজমুল শক্ত করে তার হাত ধরে রাখে এবং শাহিন তার গলায় শক্ত করে গামছা প্যাঁচিয়ে হত্যা করে। পরে লাশ খিলক্ষেত ফ্লাইওভারে ওঠার পথের ডান পাশে ফেলে দেয়। সঙ্গে ফেলে দেয় তার সিলভারের পাতিলও। ওই রাতেই হাতিরঝিলে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায় নাজমুল ও শাহীন।
গ্রেফতারের পর ১০ ডিসেম্বর থেকে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন ফ্লাইওভারে পাওয়া ৪টি লাশের বিষয়ে তথ্য দেয় পুলিশকে নুরুল। সে জানায়, তাদেরকে গামছা প্যাঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি ছিনতাইয়ের পর অজ্ঞান বা অর্ধমৃত অবস্থায় ৩০-৪০ যাত্রীকে বিভিন্ন ফ্লাইওভার বা নির্জন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ৮-১০ জন বাস-ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা গেছে। উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, নুরুল ইসলামের তথ্যমতে সিএনজি অটোরিকশা সরবরাহকারী গোলাম মোস্তফা জীবনকে ২৯ জানুয়ারি রাতে তুরাগ থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
২ ফেব্রুয়ারি তানিয়া সন্তানদের নিয়ে উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে এসে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। এ সময় বিপ্লব বিজয় তালুকদার তানিয়ার সন্তান পাপিয়া, ইয়াসিন ও ফারহানার পাঁচ মাসের স্কুলের বেতন, রাবেয়ার জন্য দুধ ও নতুন কাপড়, বকেয়া বাসাভাড়া এবং খাবার কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা করেন।

DY365 - Mat Vinnmat
সূত্র: যুগান্তর অনলাইন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

mersin escort mut escort mersin escort canlı tv izle konya escort