আইন-অপরাধ

হলি আর্টিজানে হামলা মামলার রায় বুধবার

মোহাম্মদ রফিক, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় বুধবার ঘোষণা করা হবে। রায় ঘোষণা উপলক্ষে ঢাকার আদালত পাড়াসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্পটে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার দিনগত রাত থেকেই আদালত পাড়া এলাকায় নেয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার পর সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে দেশে জঙ্গি হামলা কমেছে। জানা গেছে, গত ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে বিচারক রায় ঘোষণার জন্য ২৭ নভেম্বর নির্ধারণ করেন। এ পর্যন্ত মোট ১১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর ৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। এর আগে ৮ আগস্ট তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হয়। একই বছরের ২৩ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের পরিদর্শক হুমায়ূন কবির মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতের জিআর শাখায় মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে ২৬ জুলাই সিএমএম আদালত মামলাটি ট্রাইব্যুনালে বদলির আদেশ দেন।
অভিযোগপত্রে নাম থাকা ২১ আসামির মধ্যে ১৩ জন মারা যাওয়ায় তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। নিহত ১৩ জনের মধ্যে ৮ জন বিভিন্ন অভিযানে এবং ৫ জন ঘটনাস্থলে নিহত হয়। অভিযোগপত্রের ৮ আসামি হলো, হামলার মূল সমন্বয়ক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, নব্য জেএমবির অস্ত্র ও বিস্ফোরক শাখার প্রধান মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ। তারা সবাই কারাগারে। ঘটনাস্থলে নিহত ৫ আসামি হলো রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। আর বিভিন্ন ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযানের সময় নিহত ৮ আসামি হলো তামিম চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ার জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। এ সময় তাদের গুলিতে দুই পুলিশ সদস্য নিহত হন। পরে অভিযানে ৫ জঙ্গি নিহত হয়। ওই ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় মামলা দায়ের করে পুলিশ।
সূত্র জানায়, আজ বুধবার বহুল আলোচিত গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এ জন্য ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত চত্বরে বিশেষ নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ তথ্য প্রসিকিউশনের উপকমিশনার জাফর হোসেন জানান, মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত চত্বর ঘুরে দেখেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় ও মীর রেজাউল আলম। তারা দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত নানা দিকনির্দেশনা দেন। এসময় উপকমিশনার জাফর হোসেনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আরো বলেন, যদিও হামলার কোনো আশঙ্কা নেই, তবে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকবে।
ঢাকা মহানগর আদালতের হাজতখানার ওসি মঈনুল ইসলাম বলেন, হাজাতখানা থেকে এজলাসে আসামিদের আনা নেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মামলা দায়েরের তিন বছর চার মাস পর বুধবার দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। মামলায় ২১১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১১৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ওই মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গোলাম সারোয়ার খান জাকির বলেন, রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় রায়ে ৮ আসামির মৃত্যুদণ্ড আশা করছি। আমরা সাক্ষ্য প্রমাণে তা প্রমাণ করতে পেরেছি যে, আসামিরা অপরাধী। তাই আমরা আশা করছি, ৮ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেবেন বিচারক।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, সাক্ষীর জেরা ও যুক্তি উপস্থাপনে আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি আসামিরা অপরাধ করেননি। তাই আমরা রায়ে আদালতের কাছে ন্যায় বিচার চাই।
অপর একটি সূত্র জানায়, গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার পর সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে দেশে জঙ্গি হামলা কমেছে। তবে বেড়েছে রেডিক্যালাইজড (উগ্রবাদী মনোভাব) মানুষের সংখ্যা। জঙ্গি সংগঠনে নেতৃত্ব সংকট থাকায় উগ্রবাদীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারছে না। তবে তারা বিভিন্নভাবে তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদের ডিরেডিক্যালাইজড করতে সরকার নানা ধরনের প্রকল্প নিয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৩ সালে চারটি জঙ্গি হামলায় ৯ জন, ২০১৪ সালে পাঁচটি ঘটনায় তিন জন, ২০১৫ সালে ২৩টি ঘটনায় ২৫ জন, ২০১৬ সালে ২৫টি ঘটনায় ৪৭ জন নিহত হয়। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনাও রয়েছে। এ হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ভেঙে যায় জঙ্গি নেটওয়ার্ক।
২০১৮ সালে হামলার সংখ্যা কম হলেও যেক’টি চালানো হয়, তা ছিল চাঞ্চল্যকর। ওই বছর মার্চে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালায় জঙ্গিরা। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। হামলাকারী ‘সেলফ রেডিক্যালাইজড’ বলে পুলিশের তদন্তে বের হয়। এছাড়া একই বছরের জুনে লেখক, প্রকাশক ও বিশাখা প্রকাশনীর মালিক শাহজাহান বাচ্চুকে গুলি করে হত্যা করে জঙ্গিরা। চলতি বছর এখন পর্যন্ত পুলিশের ওপর পাঁচটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ, পথচারী ও রিকশাচালক আহত হয়েছেন। পুলিশের ওপর হামলাকারী সেলটিকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৩-২০১৬ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত জঙ্গি হামলার সংখ্যা বেশি ছিল। হলি আর্টিজানে হামলার পর সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ পদক্ষেপ ও তৎপরতায় জঙ্গি হামলা দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। জঙ্গি মোকাবিলায় ঢাকা মহানগর পুলিশ ‘কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)’ গঠনের পর জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক দ্রুত ভেঙে দিতে সক্ষম হয়। এছাড়া র‌্যাবের অভিযানও জঙ্গি মোকাবিলায় ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও ছিল তৎপর। তাই দ্রুত জঙ্গিদের হামলা কমিয়ে আনা গেছে বলে পুলিশও মনে করছে।
এ বিষয়ে অপরাধ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগের প্রধান ড. জিয়া রহমান বলেন, হলি আর্টিজানের হামলার পর মানুষ উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছে। মানুষ নিজের ও দেশের স্বার্থে তা করেছে। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জঙ্গি সংগঠনের অনেক নেতৃত্ব স্থানীয় গ্রেফতার হয়েছে এবং মারা গেছে। এতে জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্ক ভেঙে যাওয়ায় তারা আর গুছিয়ে উঠতে পারেনি।
এ বিষয়ে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ২০১৬ সালের তুলনায় জঙ্গি হামলা ৯০ শতাংশ কমেছে। কিন্তু উগ্রবাদ বেড়েছে। জঙ্গি সংগঠনের নেতৃত্ব সংকট থাকায় এসব উগ্রবাদী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারছে না। অনেক উগ্রবাদীর প্রতিক্রিয়া অনলাইনে দেখা যায়। তাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগলেই প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে। তবে তাদেরকে সন্ত্রাসবাদ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্যারেশমেটিক লিডারের অভাব রয়েছে। পুলিশের তৎপরতা রয়েছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *