সর্বাগ্রে প্রয়োজন ত্রাণ ও খাবার বিতরণ কার্যক্রমে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহন

আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্ঃ করোনা ভাইরাস সংকটের কারণে সরকার ২৫/০৩/২০২০ তারিখ থেকে কয়েক দফায় লাগাতার দীর্ঘ সাধারণ ছুটি দিতে বাধ্য হয়। প্রয়োজনবোধে এটা আরো বাড়ানো হবে। যাতে করোনা সংক্রামণ জনসাধারণের মধ্যে মহামারী আকারে ছড়িয়ে না পড়ে। ফলে সারা দেশ এবং দেশবাসী লকডাউন এবং কোয়ারেন্টিনের মধ্যে পড়েছে। কিন্তু এতে দিন আনি দিন খাই ভিক্ষুক, ভবঘুরে, দরিদ্র গরীব ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি পেশার মানুষ এবং মাস আনি মাস খাই বেতন, আয়ের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির চাকুরীজীবী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী মানুষরা বেকার, গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে।
কারণ তাদের সবার দোকান, প্রতিষ্ঠান, অফিস, কারখানা এবং নিত্যদিনের কাজকর্ম সব বন্ধ। এতে তারা সবাই অনিশ্চয়তা, হতাশার মধ্যে পড়েছে এবং প্রতিদিন তিনবেলা খাবার, শিশুখাদ্যের ব্যবস্থা করা নিয়ে অসহায় বিপদাপন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে তাদের সহায়তা করতে সরকারের উদাত্ত আহবানে এবং নিজেদের মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিত্তশালী, স্বচ্ছল, সামর্থ্যবান ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে৷ অপরদিকে সরকার, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, এলাকার সরকারী জনপ্রতিনিধি, দায়িত্বশীল ব্যক্তি, সমাজসেবক এবং স্বেচ্ছাসেবকরা এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু তাদের এই ত্রাণ, খাবার, অর্থ বিতরণ ব্যবস্থায়, তাদের নিজেদের সুরক্ষার ব্যাপারে কোন সঠিক চিন্তা, পরিকল্পনা এবং সমন্বয় নেই। এতে তাদের সবার জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং জ্বর-সর্দি-শ্বাস কষ্টজনিত কারণে বাসাবাড়ির ভেতর মানুষের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। তাই-রাস্তায় রাস্তায় কিংবা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সরকারী, ব্যক্তি বা বেসরকারী পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ বা খাবার সহায়তা দেয়া এবং রাস্তা/এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তিকে ধরে ধরে বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ বা খাবার সহায়তা দেয়া দুটাই অত্যন্ত ভুল নীতি। এতে করে প্রথমত একশ্রেণির খারাপ চরিত্রের সামর্থ্যবান সুবিধাবাজ এবং ধান্ধাবাজ ব্যক্তিরা কৌতুহলবশত বা লোভে এইসব ত্রাণ বা খাবার সহায়তার ফায়দা তুলছে বা তোলার সুযোগ পাচ্ছে। হয়ত তারা ঐ এলাকার স্থানীয় মানুষ না। পরবর্তীকালে এরাই আবার নিজ বাসস্থান বা এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন সরকারী, বেসরকারী ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সংস্থা, প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একাধিবার ত্রাণ, খাবার সহায়তা নিচ্ছে বা পেয়ে যাচ্ছে।
তৃতীয়ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে এতে বিভিন্ন স্থানে অযথাচিত জনসমাগম/ভীড় সৃষ্টি হচ্ছে। ত্রাণ, খাবার পাবার আশায় বা লোভে মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে, আসতে সাহস/উৎসাহ পাচ্ছে। চতুর্থত সরকারের নির্দেশ লংঘিত হচ্ছে। ত্রাণ, খাবার বিতরণকারীগণ এবং জনসাধারণের মধ্যে করোনা ভাইরাস সংক্রামণ বাড়ছে এবং ধীর লয়ে তা সারা দেশে বিস্তার লাভ করছে।
বিচ্ছিন্নভাবে দেয়ার ফলে অনেকক্ষেত্রে একই ব্যক্তি এবং তাদের পরিবার একাধিবার ত্রাণ বা খাবার সহায়তা নিবার সুযোগ নিবে/নিচ্ছে বা ভাগ্যক্রমে পেয়ে যাবে/পাচ্ছে। এইসব দায়িত্বজ্ঞানহীন সুবিধাবাজ, ধান্ধাবাজ মানুষের কারণে অনেকক্ষেত্রে প্রকৃত অসহায় পরিবারের মানুষরা এসব ত্রাণ বা খাবার সহায়তা পেতে বঞ্চিত হচ্ছে এবং না খেয়ে কষ্টে থাকছে। তাই-
১/ সরকার প্রশাসন এবং বেসরকারী ব্যক্তিদের বিভিন্ন সংস্থা, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবক, স্বেচ্ছাসেবকদের উচিত স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ বা খাবার বিতরণ ও সহায়তা বন্ধ করা।
২/ একইভাবে বেসরকারী পর্যায়ের ব্যক্তি, সংস্থা, প্রতিষ্ঠানের উচিত বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ বা খাবার বিতরণ ও সহায়তা বন্ধ করা।
৩/ ত্রাণ বা খাবার দানকারীদের উচিত তাদের ত্রাণ বা খাবার বিতরণ কার্যক্রমে বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা, পরামর্শ নেয়া।
৪/ সরকারের উচিত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসন এবং সংস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে ত্রাণ বা খাবার বিতরণ কার্যক্রম প্রকল্পকে পরিকল্পিত এবং সমন্বিত করার একশান প্লান প্রণয়ন করা।
৫/ প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে পরিকল্পিত, সমন্বিতভাবে দ্রুত বিভিন্ন জেলা, মহল্লা, উপজেলা, গ্রামের অসহায় দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পরিবার প্রতি খোঁজ নিয়ে তাদেরকে পরিবারভিত্তিক লিস্ট করা।
৬/ সেই লিস্ট অনুসারে সরকারের বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় বেসরকারী সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তি, সংস্থাগুলো মিলে
দ্রুত পরিকল্পিত এবং সমন্বিতভাবে দেশের বিভিন্ন শহরের মহল্লা, গ্রামে প্রকৃত অসহায় দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারদের ভোটার/এনআইডি ফটোকপি এবং কপিতে সই নিয়ে ত্রাণ, খাবার, অর্থ সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা করা।
এরফলে দেশে করোনা সংক্রামণ প্রসারের পথ সংকুচিত হবে, নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়বে না।
একই ব্যক্তি বা তার পরিবার কর্তৃক একাধিবার ত্রাণ, খাবার বা অর্থ সহায়তা পাবার সুযোগ বা নেবার ধান্ধা অনেকাংশে বন্ধ হবে।
সারা দেশের সকল অসহায় দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারের মানুষ পরিবারভিত্তিকভাবে ত্রাণ, খাবার বা অর্থ সহায়তা পাবার সমান সুযোগ পাবে।
দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ ত্রাণ, খাবার বা অ মর্থের আশায় বা লোভে রাস্তাঘাটে ঘুড়াঘুড়ি করবে না বা ধান্ধা খোজার সুযোগ পাবে না। ফলে তারা নিজ থেকেই নিজদের বাসার ভেতর থাকবে।
সুষ্ঠু পরিকল্পিত এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় ত্রাণ বা খাবার বিতরণের ফলে কেউ একাধিবার পাবে তো কেউ একবারও কিছু পাবে না এই সামাজিক অন্যায়, বৈষম্য অনেকাংশে হ্রাস পাবে/বন্ধ হবে। গরীব, নিম্নবিত্ত শ্রেণির অভাবী মানুষের সাথে প্রকৃত অসহায় দুর্দশাগ্রস্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ ঘরে বসেই তাদের এবং শিশুদের নূন্যতম খাবার সহায়তা পেতে সক্ষম হবে। এর মাধ্যমে সারা দেশবাসী এই করোনা দুর্যোগের মধ্যে খাবার ভাগযোগ করে পরিমিত/অল্প খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে, চলতে পারবে এবং করোনা যুদ্ধে বিজয়ী হবে ইনশাল্লাহ।
asifultasin18@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

etiler escort taksim escort beşiktaş escort escort beylikdüzü