মতামত-বিশ্লেষণ

শুভ বড় দিন

জিয়াউদ্দীন চৌধুরী (জেড সেলিম), বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা :আজ শুভ বড়দিন। সারাবিশ্বের খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উত্সব। আজ থেকে দু’হাজারেরও বেশি বছর আগে এই দিনে জেরুজালেমের কাছে বেথলেহেমের এক গোয়ালঘরে মা মেরির গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন যিশুখ্রিস্ট। তার প্রেম ও মানবিকতার বাণী আজও প্রভাবিত করে চলেছে মানবসমাজকে।বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় এবং আনন্দঘন পরিবেশে দিনটি উদযাপিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে ক্যাথলিক-প্রটেস্ট্যান্ট নির্বিশেষে সবকটি গির্জাকে মনোরম সাজে সাজানো হয়েছে, সুন্দরভাবে বসানো হয়েছে ক্রিসমাস ট্রি। সব পাঁচতারকা হোটেল ক্রিসমাস ট্রিসহ বর্ণাঢ্য সাজে সেজেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হয়েছে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন। আজ সকালে বিভিন্ন বয়সী খ্রিস্টধর্মাবলম্বী লোকজন গির্জায় যাবেন খ্রিস্টযাগ নামে পরিচিত বিশেষ প্রার্থনায় অংশ নিতে।আজ সরকারি ছুটির দিন।শুভ বড়দিন উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা,বিএনপি, জাতীয় পার্টি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও ধর্মীয় সম্প্রদায় পৃথক বাণীতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শুভ বড় দিন (ক্রিস্টমাসডে) আজ।প্রতিবছর২৫ডিসেম্বর খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরাএদিনটিপালনকরেথাকেন।আজ থেকে দুই সহস্রাধিক বছর আগেএই শুভদিনে পৃথিবীকে আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন খ্রিষ্টধর্মের প্রবর্তক যিশুখ্রিষ্ট।বেথেলহেমেরএক গোয়ালঘরে কুমারী মাতা মেরির কোলে জন্ম হয়েছিল যিশুর।খ্রিষ্ট ধর্মানুসারীরা বিশ্বাস করেন কোনো পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই যিশু খ্রিষ্টের জন্ম হয়। সেই অর্থে তিনি ঈশ্বরের পুত্র। সৃষ্টিকর্তার অপারমহিমায় সেখান হতেই বিকশিত হয় মুক্তিরএই আলোরদিশারী।যার আগমন পাপের আবর্তে নিমজ্জিত মানুষের অন্তরে এনে দেয় শান্তির পরশ।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে ও উৎসবমুখর পরিবেশে দিনটি উদযাপন করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়।বড়দিনউপলক্ষে দেশের সব চার্চওতারকা হোটেল গুলোকে রঙিনবাতি, বেলুন আর ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।সেই সাথে খ্রিষ্টান পরিবারের বাসাবাড়ি একইভাবে সাজানো হয়েছে।পাশাপাশি হোটেল ও পরিবার গুলো তে নানা ধরনের পিঠা ও বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। খ্রিষ্টানধর্মে বিশ্বাসীদের অনেকের ঘরেই বসানো হয়েছে প্রতীকী গোশালা। বেথেলহেমের গরিব কাঠুরের গোয়াল ঘরেই যিশু খ্রিষ্টেরজন্ম। সেই ঘটনা স্মরণ করে বাড়িতে ধর্মীয় আবহ সৃষ্টি করতেই এটি করেন যিশুর অনুসারীরা।

’ এদিকে বড়দিন উপলক্ষে রাজধানীর পাঁচতারা হোটেলগুলোতে সকাল থেকে শুরু হয় নানা ধরনের উত্সব। সকাল ৯টা থেকে রাজধানীর সোনারগাঁও, র্যাডিসন, রূপসী বাংলা ও ওয়েস্টিন হোটেলে এ উপলক্ষে নানা ধরনের উত্সবের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বড়দিন উদযাপন। প্রতিটি হোটেলে গিয়ে দেখা গেছে, প্রভু যিশুখ্রিস্টের জন্মদিন বড়দিনের আয়োজন ছিল মূলত ছোটদের নিয়ে। শিশুদের নানা কৌতূহল ছিল মূলত সান্তাক্লজকে ঘিরে। সান্তাক্লজকে ঘিরে নানা আনন্দে মেতে ওঠে তারা। হোটেলগুলোতে সাজানো হয় ক্রিসমাস ট্রি। ছোটদের জন্য ছিল আনন্দদায়ক নানা খেলাধুলা ও বিভিন্ন ধরনের খাবারের আয়োজন। শিশুরা মেতে ওঠে গান-বাজনা, ফ্যাশন শো, বালিশ খেলা, কানামাছিসহ নানা ধরনের দেশি-বিদেশি খেলায়।

আজ ছুটির দিন। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন, বেসরকারি টিভি ও রেডিও দিবসের তাত্পর্য তুলে ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে।
বড়দিন দেশের খ্রিস্টান ও অন্যান্য সমপ্রদায়ের মধ্যকার বিরাজমান সৌহার্দ ও সমপ্রীতিকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাণীতে বলেন, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে মানবতার মহান ব্রতে এগিয়ে আসতে হবে।
খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে জেপি’র শুভেচ্ছা
জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান ও পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম শুভ বড় দিন উপলক্ষে বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বের খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, আগামী দিনে একটি শান্তির পৃথিবী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মহামতি যীশুর বাণী বিশ্বকে সঠিক পথ দেখাবে।
(ইংরেজি: Christmas বা Christmas Dayএকটি বাৎসরিক খ্রিষ্টীয়উৎসব। ইংরেজি খ্রিষ্টমাস(Christmas) শব্দটি “খ্রিষ্টেরমাস (উৎসব)” শব্দবন্ধটির যুগ্ম অর্থ থেকে উৎসারিত। শব্দটির উৎপত্তি ঘটে মধ্য ইংরেজি Christemasse ও আদি ইংরেজিCristes mæsse শব্দ থেকে। শেষোক্ত শব্দটির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় ১০৩৮ সালের একটি রচনায়।”Cristes” শব্দটি আবার গ্রিক Christosএবং “mæsse” শব্দটি লাতিন missa(পবিত্র উৎসব) শব্দ থেকে উদগত। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় Χ (চি) হল Christ বা খ্রিষ্ট শব্দের প্রথম অক্ষর। এই অক্ষরটি লাতিন অক্ষর X-এর সমরূপ। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে তাই এই অক্ষরটি খ্রিষ্ট শব্দের নামসংক্ষেপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়।এই কারণে খ্রিষ্টমাসের নামসংক্ষেপ হিসেবে এক্সমাস কথাটি চালু হয়।আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধানে যিশু খ্রিষ্টের জন্মোৎসব খ্রিষ্টমাস উৎসবটিকে বাংলায় বড়দিন আখ্যা দেওয়ার কারণটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে: “২৩ ডিসেম্বর থেকে দিন ক্রমশ বড়ো এবং রাত ছোটো হতে আরম্ভ করে”।বাইবেলের দর্শন হচ্ছে : মানুষকে ঈশ্বর অসীম মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন। কিন’ শয়তানের প্রলোভনে পড়ে মানুষ তার মানবীয় অবস’াকে গ্রহণ না করে বরং অহঙ্কারী হয়ে ওঠে। শয়তানেরই প্ররোচনায় সে ঈশ্বরের সমকক্ষ হতে চায়। এই অহঙ্কার ও অবাধ্যতার কারণেই তার পতন ঘটেছে। ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করার ফলে শুধু ঈশ্বরের সাথেই নয়, বরং মানুষের পরস্পরের মধ্যেও সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে; ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে মানুষ পরস্পরের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে তার নিজের অন্তরের পরিবেশও কলুষিত হয়ে পড়েছে। সেই কলুষ কালিমা বা পাপময়তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সর্বত্র : মানুষের মাঝে ঘৃণা, বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অমিল, দলাদলি, কলহ-বিবাদ, মারামারি, হানাহানি, যুদ্ধবিগ্রহ ইত্যাদি এর প্রমাণ। গোটা পৃথিবীটাই হয়ে পড়েছে অশান্ত। এ পরিসি’তি থেকে মুক্তি লাভের জন্য মানুষ চিরদিনই ব্যাকুল। মানুষ চায় শান্তি- তার অন্তরের গভীরতম আকাঙ্ক্ষাই হচ্ছে শান্তির জন্য। কিন’ এই শান্তির পূর্বশর্ত হচ্ছে ন্যায্যতা, লোভ-লালসার বেড়াজাল থেকে মুক্তি, মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমা দেয়া-নেয়ার মাধ্যমে ভগ্ন সম্পর্কের নিরাময়, পুনর্মিলন ও সমপ্রীতি স’াপন। এ জন্যই যুগে যুগে প্রবক্তা ও মহর্ষিগণ ভাবী ত্রাণকর্তাকে শান্তিরাজ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং মানুষের মনে তাকে বরণ করার প্রত্যাশা জাগিয়েছেন।
যীশুর জন্ম হয়েছিল একটি গোশালায়, দীনবেশে। জীবনভর তিনি দরিদ্র জীবনযাপন করেছেন এবং দরিদ্রদের ধন্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার এই দীনতার জীবনটাই ছিল মানুষের কাছে সুখবর। ‘প্রভুর আত্মা আমার ওপর অধিষ্ঠিত, কেননা তিনি দীনদুঃখীদের কাছে শুভ সংবাদ দেয়ার জন্য আমাকে অভিষিক্ত করেছেন’ (লুক ৪ : ১৮)। দীনদরিদ্রদের সাথেই তিনি একাত্ম হয়েছেন। এ কারণে তিনি বলেছেন : অন্তিম বিচারের দিনে মানুষের মূল্যায়নের মাপকাঠি হবে ক্ষুদ্রতম ভাইবোনদের প্রতি আমাদের আচরণ। তিনি নিজেই ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, আশ্রয়হীন প্রবাসী, বস্ত্রহীন, পীড়িত ও কারারুদ্ধ মানুষ- অর্থাৎ ক্ষুদ্রতমদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন : তোমরা এই ক্ষুদ্রতম মানুষদের একজনেরও প্রতি যা কিছু করেছ, তা আমারই প্রতি করেছ। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আত্মায় দীনহীন যারা, তারাই সুখী, কারণ স্বর্গরাজ্য তাদেরই’ (মথি ৫ : ৩)। তিনি গরিবের বন্ধু। দীনদুখীদের ভালোবাসা ছিল তার জীবনের ব্রত। বড়দিনের আহ্বান হচ্ছে- ঈশ্বরকে জীবনের একমাত্র অভীষ্ট লক্ষ্য হিসেবে জানার ও পাওয়ার সাধনা করার আহ্বান।যীশু জন্ম নিয়েছিলেন ছোট্ট শিশু হয়ে। এটি নম্রতার প্রতীক। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের যদি মন পরিবর্তন না হয় এবং তোমরা যদি শিশুদের মতো না হয়ে ওঠো, তবে স্বর্গরাজ্যে কখনো প্রবেশ করতে পারবে না’ (মথি ১৮ : ৩)। ‘ যে কেউ শিশুর মতো ঈশ্বরের রাজ্য গ্রহণ না করে, সে তার মধ্যে কখনো প্রবেশ করতে পারবে না’ (মার্ক ১০ : ১৫)। বড়দিনের আহ্বান হচ্ছে- শিশুর মতো হওয়ার আহ্বান। সেই শিশু যীশুরই প্রতীক হচ্ছে গোশালায় যাবপাত্রে শায়িত শিশুটি।প্রবক্তা যিশাইয়া যিশুখ্রীষ্টের জন্মের প্রায় ৭৪০ বছর আগে এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন : ‘একটি শিশু আমাদের জন্য আজ জন্ম নিয়েছেন, একটি পুত্রকে আমাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। তার স্কন্ধের ওপর ন্যস্ত রয়েছে সব কিছুর আধিপত্যভার। তাঁর নাম : ‘অনন্য মন্ত্রণাদাতা, শক্তিমান ঈশ্বর, শাশ্বত পিতা, শান্তিরাজ!’ এবার শুরু হবে… অন্তবিহীন শান্তির যুগ! … ন্যায় ও ধর্মিষ্ঠতার ভিত্তিতে, আজ থেকে চিরকালের মতো’ (যিশাইয়া ৯ : ৬-৭)। প্রবক্তা যিশাইয়া আরো বলেছিলেন, ‘শোন, কুমারী কন্যাটি হবে গর্ভবতী; সে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেবে। একদিন সবাই তাকে ইম্মানুয়েল নামে ডাকবে (নামটির অর্থ হলো : ‘ঈশ্বর আমাদের সাথেই আছেন’ (যিশাইয়া ৭ : ১৪)। যিশুখ্রীষ্টের মধ্যে এই ভবিষ্যদ্বাণীর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন বলে খ্রীষ্টানদের বিশ্বাস। যীশুর জন্মের আগে মহাধূত গাব্রিয়েল মারীয়ার নিকট দেখা দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভয় পেয়ো না, মারীয়া! তুমি পরমেশ্বরের অনুগ্রহ লাভ করেছ। শোন, গর্ভধারণ করে তুমি একটি পুত্রের জন্ম দেবে। তার নাম রাখবে যীশু। তিনি মহান হয়ে উঠবেন, পরাৎপরের পুত্র বলে পরিচিত হবেন। প্রভু পরমেশ্বর তাকে দান করবেন তার পিতৃপুরুষ দাউদের সিংহাসন।’ (লুক ১ : ৩০-৩২)। যীশুর জন্মের পর স্বর্গদূত রাখালদের কাছে দেখা দিয়ে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না! আমি এক মহাআনন্দের সংবাদ তোমাদের জানাতে এসেছি; এই আনন্দ জাতির সমস্ত মানুষের জন্যই সঞ্চিত হয়ে আছে। আজ দাউদ নগরীতে তোমাদের ত্রাণকর্তা জন্মেছেন- তিনি সেই খ্রীষ্ট, স্বয়ং প্রভু। এই চিহ্নে তোমরা তাকে চিনতে পারবে; দেখতে পাবে কাপড়ে জড়ানো, যাবপাত্রে শোয়ানো এক শিশুকে; (লুক ২ : ১০-১২)। যীশুতে ঐশ প্রতিশ্রুতির এই বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করেই বড়দিনের উৎসব পালিত হয়। প্রতীকী ভাষায় ঘটনার নাটকীয় বর্ণনার অন্তর্নিহিত এই ভাব ও তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করাই বড়দিন উৎসব পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।যীশু নিজেই আনন্দ। যীশুর জন্মলগ্নে স্বর্গদূত বললেন, ‘আমি এক আনন্দের সংবাদ তোমাদের জানাতে এসেছি। এই আনন্দ জাতির সমস্ত মানুষের জন্যই সঞ্চিত হয়ে আছে’ (লুক ২ : ১০)। বড়দিনের আনন্দ তখনই সার্থক হয় যখন আমরা শুধু মৌখিক প্রচারের মাধ্যমে নয়, বরং অপরের সাথে সহভাগিতার মাধ্যমে তা প্রচার করি। যীশু বলেন, ‘পিতা যেমন আমাকে ভালোবেসেছেন, আমিও তেমনি তোমাদের ভালোবেসেছি। তোমরা আমার ভালোবাসার আশ্রয়ে থেকো। যদি আমার সমস্ত আদেশ পালন করো, তবেই তোমরা আমার ভালোবাসার আশ্রয়ে থাকবে, আমিও যেমন পিতার সমস্ত আদেশ পালন করেছি আর আছি তার ভালোবাসার আশ্রয়ে। এসব কথা তোমাদের বললাম, যাতে আমার আনন্দ তোমাদের অন্তরে থাকতে পারে এবং তোমাদের আনন্দ যেন পরিপূর্ণ হতে পারে’ (যোহন ১৫ : ৯-১১)। এ জগতে মানুষমাত্রই সুখ ও আনন্দ পেতে চায়, কিন’ প্রকৃত ও স’ায়ী আনন্দের উৎস একমাত্র ঈশ্বর। তিনি মানুষকে সুখ ও আনন্দের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। কিন’ অপরকে কষ্ট দিয়ে, অপরকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে আমার পক্ষে প্রকৃত আনন্দ লাভ করা সম্ভব নয়। বড়দিনের আহ্বান হচ্ছে- প্রতিদিনের যাত্রায় জীবন সহভাগিতার মাধ্যমে সেই অকৃত্রিম ও অকপট আনন্দ আস্বাদন করার।যীশুই শান্তি। যীশু ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ‘শান্তিরাজ’ (যিশাইয়া ৯ : ৬)। যীশুর জন্মের রাতে স্বর্গের দূতবাহিনী গেয়ে উঠেছিল : ‘জয় ঊর্ধ্বলোকে পরমেশ্বরের জয়! ইহলোকে নামুক শান্তি তার অনুগৃহীত মানবের অন্তরে’ (লুক ২ : ১৪)। ঈশ্বরপ্রদত্ত এই শান্তি অন্তরে গ্রহণ করতে পারলেই মানুষের মন থেকে সব রকম ঘৃণা-বিদ্বেষ দূর হতে পারে। সে সমপ্রীতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ মানুষের একান্ত কাম্য, তাই বড়দিন উৎসবের অন্যতম প্রধান আশীর্বাদ। মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের পরে শিষ্যদের দেখা দিয়ে যীশু দু’বার বলেছিলেন, ‘তোমাদের শান্তি হোক’ (যোহন ২০ : ১৯-২১)। তবে যীশুর দেয়া শান্তি আর মানুষের দেয়া শান্তির মধ্যে অনেক পার্থক্য। যীশু বলেন, ‘তোমাদের জন্য শান্তি রেখে যাচ্ছি, তোমাদের দিয়ে যাচ্ছি আমারই শান্তি; অবশ্য এ সংসার যেভাবে শান্তি দেয়, সেইভাবে আমি তোমাদের তা দিয়ে যাচ্ছি না।’ (যোহন ১৪ : ২৭)। যীশুর দেয়া শান্তি হচ্ছে পবিত্র আত্মা বা পাক রূহের বশে চলার ফল। (গালাতীয় ৫ : ২২)। এর বিপরীতে হচ্ছে রিপু বা পাপ স্বভাবের বশে চলা। এর ফলে মানুষের ব্যক্তিজীবনে ও সমাজে নেমে আসে অশান্তি ও অরাজকতা। বড়দিন উৎসবে শান্তি-শুভেচ্ছা বিনিময় যদি কেবল মৌখিক শিষ্টাচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত শান্তি আশীর্বাদ পেতে পারি না। বড়দিনের আহ্বান হচ্ছে সেই প্রকৃত ও স’ায়ী শান্তি লাভ করার আহ্বান।মঙ্গল সমাচারে যীশুর জন্ম কাহিনীর বর্ণনায় অনেক প্রতীক ও রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। বড়দিন উৎসবের সময় এই প্রতীকসমূহের অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ : আকাশে উদিত উজ্জ্বল তারকা প্রকাশ করে যে যীশু হচ্ছেন জগতের আলো। জগতের অন্ধকার দূর করতেই তিনি ইম্মানুয়েল বা আমাদের নিত্যসঙ্গী ঈশ্বর। পূর্বদেশের তিন পণ্ডিত বলতে বোঝায় অযিহুদী। অর্থাৎ যীশু কেবল কোনো এক জাতি বা গোষ্ঠীর ত্রাণকর্তা নন, তিনি সব মানুষেরই মুক্তিদাতা। বেথলেহেমের গোশালায় দীনবেশে জন্মগ্রহণ করার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, ‘তিনি তো স্বরূপে ঈশ্বর হয়েও ঈশ্বরের সাথে তার সমতুল্যতাকে আঁকড়ে থাকতে চাইলেন না; বরং নিজেকে তিনি রিক্ত করলেন; দাসের স্বরূপ গ্রহণ করে তিনি মানুষের মতো হয়েই জন্ম নিলেন’ (ফিলিপ্পীয় ২ : ৬-৭)। কোনো রাজনৈতিক কূটচাল, তরবারি, অস্ত্রবল, সৈন্যবল বা অশ্বারোহী সেনাবাহিনী দিয়ে প্রকৃত শান্তির রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা কখনো সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে কষ্টভোগী সেবক যীশুর ন্যায় পরার্থে সম্পূর্ণ আত্মদানের মাধ্যমেই প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। প্রেম প্রসূত এই নম্রতা বা দীনতার মধ্যদিয়েই ঈশ্বরের সর্বময় ঐশী ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে।খ্রিষ্টধর্মে খ্রিষ্টমাস বা বড়দিন হল যিশুর জন্মোৎসব। খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, আদি বাইবেলরত্রাণকর্তা-সংক্রান্ত একাধিক ভবিষ্যদবাণীতে বলা হয়েছে যে কুমারী মেরির গর্ভে তাঁদের মসিহা বা ত্রাণকর্তার জন্ম হবে। নূতন নিয়ম বা নূতন বাইবেলের মথিলিখিত সুসমাচার (মথি ১: ১৮ – ২: ১২) এবং লূকলিখিত সুসমাচার (লূক ১: ২৬ – ২: ৪০)-এ বর্ণিত যিশুর জন্মকাহিনী খ্রিষ্টমাস উৎসবের মূলভিত্তি। এই উপাখ্যান অনুসারে, স্বামী জোসেফের সাহচর্যে বেথলেহেম শহরে উপস্থিত হয়ে মেরি যিশুর জন্ম দেন। জনপ্রিয় ধারণা অনুযায়ী, একটি আস্তাবলে গবাদি পশু পরিবৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন যিশু। যদিও বাইবেলের উপাখ্যানে আস্তাবল বা গবাদি পশুর কোনো উল্লেখই নেই। যদিও লূকলিখিত সুসমাচারে (লূক ২: ৭) একটি যাবপাত্রের উল্লেখ আছে: “আর তিনি আপনার প্রথমজাত পুত্র প্রসব করিলেন, এবং তাঁহাকে কাপড়ে জড়াইয়া যাবপাত্রে শোয়াইয়া রাখিলেন, কারণ পান্থশালায় তাঁহাদের জন্য স্থান ছিল না।” যিশুর জন্ম-সংক্রান্ত প্রথম দিকের চিত্রগুলিতে গবাদি পশু ও যাবপাত্র পরিবৃত একটি গুহায় যিশুর জন্মদৃশ্য দর্শানো হয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এটি বেথলেহেমের চার্চ অফ দ্য নেটিভিটির অভ্যন্তরে। এক স্বর্গদূত বেথলেহেমের চারিপার্শ্বস্থ মাঠের মেষপালকদের যিশুর জন্ম সম্বন্ধে অবহিত করেন। এই কারণে তাঁরাই সেই দিব্য শিশুকে প্রথম দর্শন করার সৌভাগ্য অর্জন করেন।অনেক খ্রিষ্টানই মনে করেন, যিশুর জন্ম আদি বাইবেলেরত্রাণকর্তা-সংক্রান্ত ভবিষ্যদবাণীগুলিকে পূর্ণতা দেয়।মথিলিখিত সুসমাচার অনুসারে, কয়েকজন ম্যাজাই (জ্যোতিষী) স্বর্ণ, গন্ধতৈল ও ধূপ নিয়ে শিশুটিকে দর্শন করতে যান। কথিত আছে, একটি রহস্যময় তারা তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। সাধারণভাবে বেথলেহেমের তারা নামে পরিচিত এই তারাটি ছিল প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে ইহুদিদের রাজার জন্মবার্তার ঘোষক।বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রেই বড়দিন একটি প্রধান উৎসব তথা সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। এমনকি অ-খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশেও মহাসমারোহে বড়দিন উদযাপিত হতে দেখা যায়। কয়েকটি অ-খ্রিষ্টান দেশে পূর্বতন ঔপনিবেশিক শাসনকালে বড়দিন উদযাপনের সূত্রপাত ঘটেছিল। অন্যান্য দেশগুলিতে সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান জনসাধারণ অথবা বৈদেশিক সংস্কৃতির প্রভাবে বড়দিন উদযাপন শুরু হয়। তবে চীন (হংকং ও ম্যাকাও বাদে), জাপান, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ইরান, তুরস্ক ও উত্তর কোরিয়ার মতো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দেশে বড়দিন সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় না।অধিকাংশ দেশে প্রতি বছর বড়দিন পালিত হয় ২৫ ডিসেম্বর তারিখে। তবে রাশিয়া, জর্জিয়া, মিশর, আর্মেনিয়া, ইউক্রেন ও সার্বিয়ার মতো কয়েকটি ইস্টার্ন ন্যাশানাল চার্চ ৭ জানুয়ারি তারিখে বড়দিন পালন করে থাকে। কারণ এই সকল চার্চ ঐতিহ্যশালী জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে থাকে; জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ২৫ ডিসেম্বর প্রামাণ্য জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের ৭ জানুয়ারি তারিখে পড়ে।বিগত কয়েকটি শতাব্দীতে বিশ্বে বিভিন্ন অঞ্চলে বড়দিনের অর্থনৈতিক প্রভাবটি ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে দেখে গেছে। ভারত ও বাংলাদেশে বড়দিন একটি রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়।যে সকল দেশে খ্রিষ্টান সংস্কার প্রবল, সেখানে দেশজ আঞ্চলিক ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে মিলনের ফলে বড়দিন উদযাপনে নানা বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। অনেক খ্রিষ্টানের কাছে ধর্মীয় উপাসনায় অংশ নেওয়া এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। উল্লেখ্য, বড়দিন ও ইস্টারের মরসুমেই গির্জায় জনসমাগম হয় সর্বাধিক।অনেক ক্যাথলিক দেশে খ্রিষ্টমাসের পূর্বদিন ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। অন্যান্য দেশে সান্টাক্লজ ও অন্যান্য মরসুমি চরিত্রদের নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই মরসুমের অন্যতম বহুলপ্রচলিত বৈশিষ্ট্য হল পারিবারিক সম্মেলন ও উপহার আদানপ্রদান।খ্রিষ্টানরা নানাভাবে বড়দিন উদযাপন করে থাকে। এগুলির মধ্যে বর্তমানে গির্জার উপাসনায় যোগ দেওয়া সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম জনপ্রিয় প্রথা বলে বিবেচিত হয়। এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য বিভিন্ন উপাসনা পদ্ধতি ও জনপ্রিয় রীতিনীতি। বড়দিনের পূর্বে যিশুর জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চনেটিভিটি উপবাস পালন করে থাকে; অন্যদিকে পাশ্চাত্য খ্রিষ্টধর্মে অধিকাংশ চার্চে অ্যাডভেন্ট পালন করা হয়। বড়দিনের সর্বশেষ প্রস্তুতিটি নেওয়া হয় খ্রিষ্টমাস পূর্বসন্ধ্যায়।বড়দিন উপলক্ষ্যে বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার ইতিহাসটি অতি প্রাচীন। প্রাক-খ্রিষ্টীয় যুগে, রোমান সাম্রাজ্যের অধিবাসী শীতকালে চিরহরিৎ বৃক্ষের শাখাপ্রশাখা বাড়ির ভিতরে এনে সাজাত। খ্রিষ্টানরা এই জাতীয় প্রথাগুলিকে তাদের সৃজ্যমান রীতিনীতির মধ্যে স্থান দেয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর লন্ডনের একটি লিখিত বর্ণনা থেকে জানা যায়, এই সময়কার প্রথানুসারে খ্রিষ্টমাস উপলক্ষ্যে প্রতিটি বাড়ি ও সকল গ্রামীণ গির্জা “হোম, আইভি ও বে এবং বছরের সেই মরসুমের যা কিছু সবুজ, তাই দিয়েই সুসজ্জিত করে তোলা হত।” প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, হৃদয়াকার আইভিলতার পাতা মর্ত্যে যিশুর আগমনের প্রতীক; হলিপ্যাগান (অখ্রিষ্টান পৌত্তলিক) ও ডাইনিদের হাত থেকে রক্ষা করে; এর কাঁটার ক্রুশবিদ্ধকরণের সময় পরিহিত যিশুর কণ্টকমুকুট এবং লাল বেরিগুলি ক্রুশে যিশুর রক্তপাতের প্রতীক।খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে রোমে নেটিভিটি দৃশ্য প্রচলিত ছিল। ১২২৩ সালে সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসি এগুলিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এরপর শীঘ্রই তা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র খ্রিষ্টান বিশ্বে স্থানীয় প্রথা ও প্রাপ্ত দ্রব্যাদির অনুষঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সাজসজ্জার প্রথা চালু রয়েছে। ১৮৬০-এর দশকে শিশুদের হাতে নির্মিত কাগজের শিকলের অনুপ্রেরণায় প্রথম বাণিজ্যিক খ্রিষ্টমাস সজ্জা প্রদর্শিত হয়।মাছ। ইংল্যান্ড ও ইংরেজি সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবান্বিত দেশগুলিতে সাধারণ বড়দিন ভোজসভার পদে দেখা যায় টার্কি (উত্তর আমেরিকা থেকে আনীত), আলু, শাকসবজি, সসেজ ও গ্রেভি; এছাড়াও থাকে খ্রিষ্টমাস পুডিং, মিন্স পাই ও ফ্রুট কেক। পোল্যান্ড, পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের ভোজে মাছের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়; তবে এই সব অঞ্চলে ভেড়ার মাংসের মতো অত্যধিক-চর্বিওয়ালা মাংসের ব্যবহারও বাড়ছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ায় হাঁস ও শূকরের মাংস বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া প্রায় সারা বিশ্বেই গোমাংস, হ্যাম ও মুরগির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ফিলিপিনসের ভোজসভার প্রধান খাদ্য হল হ্যাম।পাশ্চাত্য সমাজ ও এশিয়ার অখ্রিষ্টান সম্প্রদায় সহ এক বিরাট সংখ্যক জনসাধারণের মধ্যে এই প্রথা জনপ্রিয়। চিরাচরিত শুভেচ্ছাবার্তার বাণীটি হল “পবিত্র খ্রিষ্টমাস ও শুভ নববর্ষের শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন” (“wishing you a Merry Christmas and a Happy New Year”)। ১৮৪৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত স্যার হেনরি কোল নির্মিত প্রথম বাণিজ্যিক খ্রিষ্টমাস কার্ডের বাণীটিও এই প্রকারই ছিল। যদিও এই শুভেচ্ছাবার্তা রচনার বহুতর পন্থা বিদ্যমান। অনেক কার্ডে একদিকে যেমন ধর্মীয় অনুভূতি, কবিতা, প্রার্থনা বা বাইবেলের স্তব স্থান পায়, তেমনই অন্যদিকে “সিজন’স গ্রিটিংস”-এর মতো কার্ডগুলি ধর্মীয় চেতনার বাইরে সামগ্রিক ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়।অনেক দেশেই বড়দিন উপলক্ষ্যে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। ডাকব্যবহারকারীরা খ্রিষ্টমাস কার্ড পাঠানোর সময় এই ডাকটিকিটগুলি ব্যবহার করে থাকেন। ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের কাছেও এগুলি খুব জনপ্রিয়।অনেক দেশেই বড়দিন বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে উপহার আদানপ্রদানের মরসুম। বড়দিন ও উপহার আদানপ্রদানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একাধিক খ্রিষ্টীয় ও পৌরাণিক চরিত্রের উদ্ভবের সঙ্গেও বড়দিন উৎসব অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। এঁরা হলেন ফাদার খ্রিষ্টমাস বা সান্টাক্লজ, পেরে নোয়েল, ও ওয়েনাকসম্যান; সেন্ট নিকোলাস বা সিন্টারক্লাস; ক্রাইস্টকাইন্ড; ক্রিস ক্রিঙ্গল; জৌলুপুক্কি; বাব্বো নাতালে; সেন্ট বাসিল; এবং ফাদার ফরেস্ট।আধুনিককালে এই চরিত্রগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় হল লাল পোষাক পরিহিত পৌরাণিক উপহার প্রদানকারী সান্টাক্লজ। সান্টাক্লজের উৎস একাধিক। সান্টাক্লজ নামটি ডাচ সিন্টারক্লাস নামের অপভ্রংশ; যার সাধারণ অর্থ সেন্ট নিকোলাস।সান্টাক্লজের আধুনিক রূপকল্পটির সৃষ্টি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে। এই রূপান্তরের পশ্চাতে ছয়জন মুখ্য অবদানকারী ছিলেন। এঁদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ওয়াশিংটন আরভিং এবং জার্মান-আমেরিকান কার্টুনিস্ট টমাস ন্যাস্ট (১৮৪০–১৯০২)।বাংলাদেশ একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও এ দেশে রয়েছে বিপুলসংখ্যক খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের এই ধর্মীয় উৎসবে প্রতিবছরের মতো এবারও অন্য সব ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষের সংহতি থাকবে—সেই প্রত্যাশা রইল। খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী সবার প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। সবার জন্য আনন্দময় হয়ে উঠুক পবিত্র এই দিনটি। শুভ বড়দিন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *