মতামত-বিশ্লেষণ

লকডাউন এবং কোয়ারেন্টিন

আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্ঃ বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ায় তা বাংলাদেশের জনজীবনের উপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। জন আতংকের প্রেক্ষাপটে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার সকল প্রকার স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি ১৮ থেকে ৯ই এপ্রিল পর্যন্ত এবং দেশের সকল পর্যটন কেন্দ্র অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করেছে। সকল প্রকার রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় জনসমাবেশ এবং অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছে। অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে এবং বন্ধ রেখেছে। সিনেমা হল মালিক সমিতি সারা দেশে সিনেমা হল বন্ধ ঘোষনা করেছে। বিভিন্ন বড় কোম্পানী সরাসরি পাবলিক সার্ভিস দেয়া বন্ধ করে অনলাইনে কাজ চালিয়ে যাবার ব্যবস্থা করেছে। বিদ্যানানন্দ ফাউন্ডেশান, ঢাকা ক্যারেজ ডিপোর মত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা জীবাণুমুক্তকরণ অভিযান চালানো শুরু করেছে। আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “করোনা ভাইরাসের কারণে পরিস্থিতি বুঝে কিছু কিছু এলাকা শাট ডাউন করে দেওয়া হতে পারে। এছাড়া প্রয়োজন হলে আন্তঃজেলায় বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।” মহামান্য হাইকোর্ট আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেশের সকল বিদেশ ফেরত প্রবাসীকে বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করার আদেশ দিয়েছে। কোন প্রবাসী হোম কোয়ারেন্টাইন না মানলে তার পাসপোর্ট জব্দ করা হবে। সরকার জনসাধারণকে গণপরিবহন পরিহার করার এবং বয়স্ক ও অসুস্থ্য রোগীদের মসজিদে না যাবার পরামর্শ দিয়েছে। সর্ব সাধারণকে মসজিদে না যেয়ে বাসায় নামায পড়ার আহবান জানিয়েছে।
রাজধানীর আশকোনার হজ্জ ক্যাম্প এবং উত্তরার দিয়াবাড়ির কাছে রাজউক এপার্টমেন্ট প্রকল্পে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এই দুটি কোয়ারেন্টিন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং এবং ইনিগ্রেশান কার্যক্রম সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে। এছাড়া তারা বিমানবন্দর থেকে সব যাত্রীদের নেয়ার পর তাদের ডাটা সংগ্রহ করবে। সেন্টারে থাকার সময় খাবার, চিকিৎসা এবং অন্যান্য সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থা প্রয়োজনীয় সহায়তা দিবে।
এছাড়া বিশ্ব এজতেমা ময়দান এবং কিছু হাসপাতালকে কোয়ারেন্টিনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্রুত ভিত্তিতে ৮টি করোনা ভাইরাস নির্নয়ের ল্যাব প্রতিষ্ঠার উদ্যেগ নেয়া হয়েছে। চীন থেকে টেস্টিং কিট, সার্জিক্যাল মাস্ক, ডাক্তার ও নার্সদের জন্য সুরক্ষা গাউন, ইনফ্রাইড থার্মোমিটার আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আলী বাবার কর্ণধার জ্যাক মা বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন করোনা আক্রান্ত দেশকে মাস্ক, কিট, গাউন, থার্মোমিটারের চালান সহায়তা পাঠাবার ঘোষনা দিয়েছে। তবে শুধু বিদেশ থেকে আমদানীর জন্য এবং বিদেশী সহায়তা পাবার জন্য অপেক্ষা না করে বিভিন্ন দেশী প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যেগে পার্সোনাল প্রটেকশান ইকুপমেন্ট/পিপিই তৈরির ব্যবস্থা করছে। সরকার পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত মাস্ক এবং হেন্ড সেনিটাইজার রপ্তানী বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে ৪৫ জন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী পাওয়া গিয়েছে। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৫ জন মারা গেছে এবং ১১ জন সুস্থ হয়েছে। মাদারীপুরের শিবচর, মিরপুরের কিছু অংশ, বান্দরবনের লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যণছড়ি উপজেলা লক ডাউন করা হয়েছে। নানাবিদ কারণে রাজধানী ঢাকা এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রাম সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ এলাকা হিসাবে চিহ্নিত। প্রবাস ফেরত ব্যক্তিরা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা নিজ দায়িত্বে সেল্ফ কোয়ারেন্টিন পালন করছে না। এই সমস্ত কারণে সারা দেশে জনসাধারণের মধ্যে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হবার ঝুকি বেড়েছে। করোনা ভাইরাস বিস্তারের আগাম প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসাবে বাংলাদেশ সরকার ২৬শে মার্চ থেকে ৪ঠা এপ্রিল পর্যন্ত একটানা ১০ দিন সাধারণ ছুটি ঘোষনা করেছে। এই সময়কালে সকল প্রকার গণপরিবহন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সকল প্রকার নৌপরিবহন বন্ধ করা হয়েছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য সকল আভ্যন্তরীণ ফ্লাইট এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী দেশের সকল জেলা এবং উপজেলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং তত্ত্বাবধান করতে লজিস্টিক সহযোগীতা প্রদান করবে। এই সময়কালে সরকারী- বেসরকারকারী সেবা দানকারী পুলিশ ফাড়ি, হাসপাতাল, ফার্মেসী, কাঁচাবাজার খোলা থাকবে এবং জরুরী সেবা দানকারী যানবাহন চলবে। যারা শহরে জীবনযাপন করতে অসমর্থ তাদের সরকার ঘরে ফেরা কর্মসূচীর আওতাভুক্ত করে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে এবং তাদের জন্য নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপের ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত আবাসন প্রকল্প উন্মুক্ত করে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারের এসব উদ্যেগে বাংলাদেশ করোনা ভাইরাসের দ্রুত জ্যামিতিক হারে ছড়িয়ে পড়ার মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ থাকতে এবং রক্ষা পেতে অনেকটা সক্ষম হবে ইনশাল্লাহ।

এখানে উল্লেখ্য, ভারত এবং ব্রিটেনের সরকার ২১দিন/৩ সপ্তাহের জন্য ২৪শে মার্চ মধ্যরাত থেকে সারা ভারত এবং ব্রিটেনে লকডাউন ঘোষনা করা হয়েছে। অবস্থা দৃষ্টে সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশ সরকার পর্যায়ক্রমে লকডাউন এবং কোয়ারেন্টিনের পথে হাটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ইতালীতে ৩য় সপ্তাহ থেকে লকডাউন ঘোষনা করলেও ইতালী জনসাধারণ সরকারের ঘোষিত লকডাউন মানেনি। যার ফলাফল ইতালী জুড়ে করোনা ভাইরাসের মহামারী, চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া এবং অবিরাম মৃত্যুর মিছিল। তাই করোনা ভাইরাসকে মোটেও হালকাভাবে নিবেন না কেউ। দেশবাসীর প্রতি সদয় নিবেদন ইউরোপ মহাদেশ, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারগণ এবং জনসাধারণ করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে অবহেলা করে আজ অনেক চড়া মাসুল দিচ্ছে এবং দিশেহারা হয়ে এ থেকে মুক্তির পথ খুজছে। অপরদিকে করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে
তাইওয়ান, সিংগাপুর, হংকং, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণ নিজ নিজ দেশের সরকারের গৃহিত কার্যক্রমের প্রতি সহযোগীতা করায় এবং মেনে চলায় তারা সম্মিলিতভাবে করোনা ভাইরাসের প্রকোপকে রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে।

তাই ইউরোপ, আমেরিকার নেতিবাচক দিক এবং
তাইওয়ান, সিংগাপুর, হংকং, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশের ইতিবাচক দিক হতে আমাদের সবার শিক্ষা নিতে হবে। কারণ করোনা ভাইরাসের ঝুকি এবং হুমকি মোকাবেলা করা সরকার, সেনাবাহিনী এবং জনসাধারণ কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। বরং সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এক হয়ে সমন্বিতভাবে কাজ এবং পরস্পরকে সহযোগীতা করতে হবে। তা না হলে অনেক পরিবার ধবংস হয়ে যাবে, সমাজ, জাতি, দেশ বিরাট বিপর্যয়ের মুখে পড়বে এবং আগামী দুই দশক পিছিয়ে যাবে। তাই বাংলাদেশের জনসাধারণের উচিত নিজের, নিজের পরিবার, সমাজ, জাতি, রাষ্ট্রের সমষ্টিগত বৃহত্তর নিরাপত্তা, অস্তিত্ত্ব রক্ষার স্বার্থে সরকার ঘোষিত লকডাউন এবং হোম কোয়ারেন্টিন কঠোরভাবে মেনে চলা।
তবেই কেবল করোনার ভাইরাসের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া এবং এই মহামারী থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। asifultasin18@gmail.com

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

mersin escort mut escort mersin escort canlı tv izle konya escort