মতামত-বিশ্লেষণ

মুজিববর্ষ উদযাপনে কিছু পরামর্শ

মো. আবদুল কুদ্দুস: ১৭ মার্চ, ২০২০ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হবে। পরের বছর ২৬ মার্চ, ২০২১ বাংলাদেশ উদযাপন করবে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। এ আয়োজনে সব বয়সি ও শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করা হবে। ঘোষণা মোতাবেক শিশু, তরুণ, যুবক সবার জন্য আলাদা কর্মসূচি থাকবে। আয়োজনের বিস্তৃতি থাকবে দেশের সব ওয়ার্ড পর্যন্ত। দিবসটি সরকারিভাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সম্মানিত সদস্য প্রফেসর ড. আবদুল খালেক স্যারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল দেশের চলমান রাজনীতি নিয়ে। আলোচনার একপর্যায়ে স্যার জানান, ১২ এপ্রিল, ২০১৯ প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে একটি বৈঠক হয়েছে। এতে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে গৃহীত ‘মুজিববর্ষ ২০২০-২০২১’ কীভাবে পালন করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই সভায় অন্য উপদেষ্টাম-লীদের সঙ্গে স্যার প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়েছেন যে, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আমাদের প্রেরণার উৎস। আমাদের সবার হাতেই আজ স্মার্টফোন রয়েছে। এই স্মার্টফোন নিয়ে আমাদের দেশের তৃণমূলের খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের কাছে যেতে হবে। এসব মানুষের অন্তরে গাঁথা বঙ্গবন্ধুর জীবন সংগ্রাম, দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধুর রক্তক্ষয়ী অবদান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ইতিহাস শুনতে হবে। সাধারণ মানুষের হৃদয়ে লিখিত এসব মহামূল্যবান ইতিহাস রেকর্ড করতে হবে। তাহলে আমরা জাতির পিতার সম্পর্কে না জানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস আবিষ্কার করতে পারব। জাতি ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে মুক্তি পাবে। সেই ইতিহাস প্রকাশ করতে হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে।’ বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনার প্রবল আস্থাভাজন প্রফেসর ড. আবদুল খালেক স্যারের এসব পরামর্শ সত্যিই অসাধারণ। এসব পরামর্শ মোতাবেক কাজ হলে মুজিববর্ষ উদযাপনের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে আমি মনে করি।
প্রফেসর ড. খালেক স্যারের সঙ্গে সহমত পোষণ করে এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন অনুযায়ী মুজিববর্ষ উদযাপনের অনুষঙ্গ হিসেবে আমাদের তরুণ প্রজন্মের পরামর্শ হলোÑ দিবসটি উপলক্ষে দুই ধরনের অনুষ্ঠানসূচি নেওয়া যেতে পারে। ক. জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠানসূচি। খ. আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুষ্ঠানসূচি। জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আমাদের পরামর্শ হলোÑ এ দিবসটি ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমে উদযাপনের জন্য একটি ‘Celebration Center, একটি ‘Monument, একটি Logo ও কিছু ‘Publications’ করা দরকার। সেলিব্রেশন সেন্টারটি স্থাপিত হতে পারে স্বাধীনতার পূর্ণভূমি রাজধানীর ‘রেসকোর্স ময়দান’ অর্থাৎ বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এখানে এমন একটি ‘মন্যুমেন্ট স্থাপন’ করা দরকার, যা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের চিত্র, শহীদদের আত্মত্যাগের চিত্র, শান্তিপ্রিয় বাঙালির যুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তির চিত্র এবং বাংলাদেশের বর্তমান চলমান উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দুর্নিবার গতিতে এগিয়ে চলার চিত্র ফুটিয়ে তুলতে হবে।
এ ছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের মতামত জানার জন্য একটি ওয়েবসাইট বা ফেইসবুক পেইজ নির্মাণ করা যেতে পারে, যা বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের উন্নয়নের তথ্য-উপাত্ত, ভিডিও ও ছবি প্রেরণের জন্য সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এটি হতে পারে www.mujibborsho100.independence50.bd.com. এ ওয়েব পেইজে প্রদত্ত তথ্য এবং মানুষের কাছে সরাসরি গিয়ে প্রাপ্ত তথ্য বিচার-বিশ্লেষণ করে শ্রেষ্ঠ তথ্যদাতাদের গল্প ও ছবি নিয়ে ২০২০-২০২১ সালের জন্য ক্যালেন্ডার তৈরি করা যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও জাতির পিতার সম্পর্কে নাজানা বহুমাত্রিক তথ্যসমৃদ্ধ এ ক্যালেন্ডার ওই বছর দেশের প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে জাতির পিতাকে দেশ গড়ার কাজে সহযোগিতা করেছেন অথচ এখনও নানা কারণে তার/তাদের বাঙালি জাতি চিনতে পারেনি অথবা অবহেলিত রয়েছেন, এমন মানুষের দোরগোড়ায় বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনা সংক্ষিপ্ত সফর করতে পারেন। এতে মানুষের হৃদ্যতা বাড়বে। তথ্য সংগ্রহের কাজে একটি জাতীয় কমিটির তত্ত্বাবধানে একাধিক স্থানীয় কমিটি করা যেতে পারে। এসব কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, দলীয় সাংগঠনিক নেতা, লেখক-সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, গবেষক, কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মুচি, পেশাজীবী, সামরিক-বেসামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা গেলে সঠিক ইতিহাস সন্ধানে সবার মনে ব্যাপক সাড়া জোগাবে বলে আমি মনে করি। এ কমিটির নাম হতে পারেÔGrassroot organizing for everyone-Call to action.
অন্যদিকে মুজিববর্ষ উদযাপন 2020-2021 উপলক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে বাংলাদেশের সম্মান জানান দেওয়ার জন্যGolden Bangladesh শিরোনামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে আমাদের দেশের উদীয়মান তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প, ব্যবসাবাণিজ্য, পর্যটন, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, সৌহার্দ্য সম্প্রীতির বন্ধন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, দেশ গড়ার কাজে বঙ্গবন্ধুর ২৩ বছরের সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে। এ ছাড়াও এ উৎসবের প্রস্তুতি পর্বের নামকরণ হতে পারে ‘Let’s celebrate MujibBorsho, 2020-2021’. এসব অনুষ্ঠানের অর্থের প্রধান উৎস হতে পারে বাংলাদেশের বিত্তবান মানুষ। বঙ্গবন্ধুপ্রেমী দেশি-বিদেশি বন্ধু। সার্বিকভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতা দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সেøাগান হোক ‘Mujib is Bnagladesh এবং সবার অংশগ্রহণের জন্য অনুষ্ঠানের মূলমন্ত্র হোক ‘We creat Bangladesh, We make Bangladdesh বঙ্গবন্ধু অমর হোক, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

মো. আবদুল কুদ্দুস
শিক্ষক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
shyamoloits@gmail.com

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

Close