রাজনীতি

‘ব্লেম গেমে’ রাজনীতি শুরু হয়েছে আ’লীগে

সফিকুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : ৬ নভেম্বর থেকে টানা সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন চলছে। এরইমধ্যে কৃষক লীগ,শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন শেষ হয়েছে। গত ২৩ নভেম্বর শনিবার শেষ হয়েছে যুবলীগের সম্মেলন। আগামী শনিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিন আওয়ামী লীগের সসেম্মলন। এই সম্মেলনে পদ পদপ্রত্যাশীরা এরইমধ্যে নানা তৎপরতা শুরু করেছে নেতাকর্মীরা। পদ-পদবী ছিনিয়ে আনতে একে অপরের বিরুদ্ধে শুরু করেছে অপপ্রচারের মতো ‘অসুস্থ প্রতিযোগিতায়’। সম্মেলনের আগে তো বটেই, সম্মেলনের পরও দলীয় হাইকমান্ডের বেছে নেয়া নতুন নেতৃত্বকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মিথ্যা অভিযোগে ঘায়েল করার অপচেষ্টায় মেতেছে একটি চক্রী মহল। এর অংশ হিসেবে একে অন্যের বিরুদ্ধে ‘ব্লেম গেমে’ নেমেছে পদবঞ্চিতদের কেউ কেউ।
জানা গেছে, সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে পদপ্রত্যাশীরা যেন কোনো ধরনের ‘অসুস্থ প্রতিযোগিতায়’ না করে, সেই বিষয়ে দলীয় হাইকমান্ড কঠোর নির্দেশনা দিয়েছিল। এরপরও থেমে নেই এক নেতা অপর প্রতিদ্বন্দ্বির বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর প্রতিযোগীতা। বিষয়টিকে বিরাজনীতিকরনের চক্রান্ত হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। তারা জানিয়েছেন, অপরাজনীতির এই বিষয়টি তাদের জন্য বিব্রতকর। এখনি এগুলোর লাগাম টেনে ধরতে হবে। যারা এগুলো করছে, সুস্পষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে দল। দলীয় সূত্রমতে, এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের চারটি সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং সর্বশেষ যুবলীগের সম্মেলন হয়েছে, যেখানে অনেক যাচাই-বাছাই করে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। প্রার্থীদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছেন। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টও দেখা হয়েছে। অর্থাৎ সার্বিক দিক বিচার-বিশ্লেষনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত করা হয়েছে। গত ৬ নভেম্বর কৃষক লীগের সম্মেলনের আগে থেকেই ‘ব্লেম গেমে’র সূচনা। এরপর শ্রমিক লীগ, স্বেচ্চাসেবক লীগ, যুবলীগের সম্মেলন হলেও চক্র থেকে নেই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে। নেতৃত্ব ঘোষনার পরও তারা দায়িত্বপ্রাপ্তদের চরিত্র হরনে কাজ করে যাচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের টেনে আনছেন এসব ক্ষেত্রে। এ কাজে তারা ব্যবহার করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমকে। গণমাধ্যমকে অনেক সময় ভুল তথ্য দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করছে। কখনো বলা হচ্ছে নির্বাচিতদের কেউ কেউ টেন্ডারবাজির সাথে জড়িত ছিলো, কখনো বলা হচ্ছে বিতর্কিত নেতাদের সাথে যোগাযোগ ছিলো। আবার রাজনীতিতে সম্প্রতি বিতর্কিত হয়েছেন, এমন কারো সাথে আগে তোলা ছবি সামনে এনে বলা হচ্ছে তার কাছের মানুষ। তবে এসবের কোনো সুস্পষ্ট প্রমান দিতে পারছে না এই চক্রটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ছবি ছড়িয়ে দিয়ে প্রমান করতে চাইছে নব নির্বাচিত কেউ কেউ বিতর্কিত। গত কয়েকদিনে এই প্রতিবেদকের কাছে একাধিক মেইল এসেছে, যেখানে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নতুন নির্বাচিত কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে একগাদা অভিযোগ রয়েছে। এসব মেইলের উৎস সম্পর্কে জানা যায়নি। তবে ওই মেইলে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ দেয়া হয়েছে, খোঁজ নিয়ে সেগুলোর কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। কাঁদা ছোড়াছুড়ি ও অপপ্রচার নিয়ে কথা হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিন আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন থানা-ওয়ার্ড নেতাদের সাথে। তারা জানিয়েছেন, যারাই থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে অপপ্রচার-গুজব ও ব্ক্রিান্তিকর তথ্য দিয়ে গণমাধ্যমে ভুল সংবাদ পরিবেশন করতে সহযোহিতা করবে তাদের দলকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা উচিত। এ বিষয়ে ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা সজল বলেন, সম্মেলন আসলেই একটি কুচক্রী মহল দলের পরীক্ষিত-ত্যাগী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। এরা প্রকৃত আওয়ামী লীগার না, খোজ নিলে জানতে পারবেন,তাদের পরিবারের লোকজন বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত। একই কথা জানিয়েছেন ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি চৌধুরী আশিকুর রহমান লাভলু ও শাহাবাগ-বংশাল ও লালবাগ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি জি এম আতিকসহ আরো অনেকে। আশিকুর রহমান লাভলু বলেন, যারা প্রকৃত আওয়ামী লীগার তারা কখনো দল ও দল মনোনীত নেতাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে পারেনা। এই নোংরা কাজটি যারা করছে, তাদের অবিলম্বে শাস্তির আওতায় আনা উচিত।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো.শাহে আলম মুরাদ বলেন, সরকার ও দরের বিরুদ্ধে সবসময় অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি-জামায়াত। সুতরাং আওয়ামী লীগের বিতরে প্রবেশ করে যারা গুজব-সন্ত্রাস ও অপপ্রচার করছে, তারা বিএনপি-জামায়াতের প্রেতাত্মা। তিনি বলেন, নতুন গজিয়ে ওঠা আওয়ামী লীগার যারা ‘হাইব্রিড’ নামে পরিচিত, তারা দলের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। তিনি বলেন, হাইব্রিডরা বিএনপি-জামায়াতের প্রেতাত্মা। এখন সময় এসেছে,তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধ্যান করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
কথা হয় দলের শীর্ষপর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতাদের সাথে। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অসুস্থ প্রতিযোগিতার এই বিষয়টিকে তারা খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন। এজন্য এগুলো কঠোর হাতে দমনের কথা ভাবছেন তারা। কারন এই চর্চা অব্যাহত থাকলে তা দলের জন্য খুবই ক্ষতিকর হবে। অভিযোগগুলো কোনো উৎস থেকে এসব আসছে? কারা করছেন? এসব ব্লেম গেমের সাথে কারা জড়িত? সেসব খুঁজে বের করা হবে। প্রয়োজনে সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। প্রমান পেলে ব্লেম গেম যারা খেলছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাদেরমতে, রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে সেটা স্বাভাবিক। কালে কালে সেটা হয়ে এসেছে। কিন্তু অসুস্থ প্রতিযোগিতা মেনে নেয়া হবে না। রাজনীতি করতে গেলে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একে অন্যের সাথে ছবি তোলা হয়। স্মার্ট ফোনের যুগে সেটা আরো বেশি। সেসব ছবি পরবর্তীতে সামনে এনে একজনকে বিতর্কিত করা অপরাধ। কারন একসময় ভালো একজন রাজনীতিক পরে বিতর্কিত হয়ে গেলে তার সঙ্গে অতীতে কেউ ছবি তুললে সেও বিতর্কিত হয়ে যায় না। আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতার সাথেও অনেকের ছবি আছে। কাল সেই নেতা বিতর্কিত হয়ে গেল যারা ছবি তুলেছেন তারাও কি বিতর্কিত হবেন? অবশ্যই হবেন না।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, এগুলো চরিত্র হননের অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। সর্বোচ্চ যাচাই-বাছাই করে সহযোগী সংগঠনের নতুন নেতৃত্ব আনা হয়েছে। এগুলো আসলে রাজনীতিকে বিরাজনীতিকরনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা। এজন্য গণমাধ্যমকে আরো বেশি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। তিনি বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা দলের যে ইতিবাচক রাজনীতির সূচনা করছে তা কিছু দুষ্ঠু লোকের জন্য থেমে থাকবে না। প্রয়োজনে দল এসব ক্ষেত্রে আরো কঠোর হবে এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহন করবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, যখন দল নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করবে, তখন সেই নেতৃত্বকে সম্মান জানিয়েই রাজনীতি করতে হবে। ওই নেতৃত্বের ভাবমুর্তি রক্ষা করা সকলের কর্তব্য। এটাই সঠিক রাজনীতি। মিথ্যা অভিযোগ তুলে কারো বিরুদ্ধে অপরাজনীতি করলে সে রাজনীতিতে টেকে না। আমাদের মনে রাখতে হবে প্রতিযোগিতা যেন প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, কাঁদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করতে হবে। আমাদের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা হবে সুস্থ। অসুস্থ প্রতিযোযিতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। আমি নেত্রীর পক্ষ থেকে পরিস্কারভাবে সবাইকে জানিয়ে দিতে চাই। কেউ কারো বিরুদ্ধে অপপ্রচার কিংবা কুৎসা রটালে কঠোর ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *