রাজনীতি

বাংলাদেশে মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা শুরু

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ক্ষণগণনা (কাউন্টডাউন) শুরু হয়েছে। শুক্রবার বিকাল ৫টায় কেন্দ্রীয়ভাবে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে লোগো উন্মোচন, ঘড়ি চালুর মধ্যদিয়ে মুজিববর্ষের ক্ষণগণনার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । এরপর প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও পাবলিক স্থানে একইসঙ্গে ক্ষণগণনা শুরু হয়।
এই বিমানবন্দরে আজ থেকে ৪৮ বছর আগে জাতির জনকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘটনাপ্রবাহের প্রতীকী মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনার সূচনা হলো। আর এই অনুষ্ঠানে আবেগ আপ্লুত হয়ে যান বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, তাদের পরিবারের সদস্য, সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য, দুই হাজারের বেশি আমন্ত্রিত অতিথি এবং দশ হাজারের বেশি নিবন্ধিত দর্শকের উপস্থিতে শুক্রবার বিকালে স্মরণ করা হল সেই মুহূর্তটিকে, যেদিন পূর্ণতা পেয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনন্দ। আমন্ত্রিত অতিথি ও নিবন্ধিতদের জন্য দুপুরের পর থেকেই উন্মুক্ত করে দেয়া হয় অনুষ্ঠানস্থলের নির্ধারিত প্রবেশ পথগুলো। সবাইকে নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়। মন্ত্রিসভার সদস্য, কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ বেলা ২টা থেকেই অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করতে শুরু করেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে এসে মঞ্চে বসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এবং বিকল্প ধারা বাংলাদেশের সভাপতি সাবেক প্রেসিডেন্ট ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীও ছিলেন।
মূল অনুষ্ঠানের শুরুতে পুরাতন বিমানবন্দরে অবতরণ করে সি-১৩০জে মডেলের একটি উড়োজাহাজ। পাকিস্তানের কারগার থেকে মুক্তি পাওয়ার দুই দিন পর লন্ডন হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি অপরাহ্নে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের এরকম একটি উড়োজাহাজে করেই তেজগাঁওয়ের বিমানবন্দরে পৌঁছান জাতির পিতা। বিমানটি ধীরে ধীরে টারমাকে অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে এসে থামে। এ সময় বাজানো হয় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের সেই গান-‘বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায়’। বিমানটি টারমাকে পৌঁছানোর পর দরজা খোলা হলে ২১ বার তোপধ্বনি দেয়া হয়। পাতাকা হাতে ১৫০ জন তখন সেখানে লাল গালিচার পাশে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। তাদের জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান আর লেজার লাইটের মাধ্যমে বিমানের দরজার ফুটিয়ে তোলা হয় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। পুষ্পবৃষ্টির মধ্যে সেই আলোকবর্তিকা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে লাল গালিচার মাথায় ছোট্ট মঞ্চে এসে থেমে যায়।
এরপর গার্ড অব অনার দেয় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল। বঙ্গবন্ধু যে আলোকবর্তিকা হয়ে সেদিন দেশে ফিরেছিলেন, তারই প্রতীকী উপস্থাপনা ছিল এ আয়োজন। প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেয়ার পর মুজিববর্ষের লোগো উন্মোচন ও ক্ষণগণনার উদ্বোধন করেন বোতাম চেপে। অসংখ্য বেলুন উড়ানো হয় এবং শত পায়রা ছেড়ে দেয়া হয় আকাশে।
ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে রাজধানীর তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ২০ বছরের সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। বাঙালি জাতি মুক্তি পেয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে যার কাছে যা আছে তা নিয়ে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছিল। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হতে পারতো না। আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মমর্যাদা অর্জন করতে পারতাম না। বঙ্গবন্ধুকন্য শেখ হাসিনা আরো বলেন, ২৫শে মার্চ যখন পাকিস্তানি হানাদাররা হামলা শুরু করেছিল ঠিক তখনই জাতির পিতা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয় অর্জন করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানিরা এ বিজয় মেনে নিতে পারেনি। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে যার যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। নির্দেশ দেন বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। বাংলার জনগণ তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। ৭ই মার্চের ভাষণের পর ২৫শে মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসন অচল হয়ে পড়েছিল। ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে তিনি যে নির্দেশ দিতেন সে অনুযায়ী দেশ চলতো। ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও যুদ্ধে বিজয় যে অবশ্যম্ভাবী, সে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাঙালি তার নির্দেশ পালন করে সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছিল। তিনি বলেন, ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদাররা আত্মসমর্পণ করে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপে পাকিন্তানিরা বাধ্য হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে। আমাদের বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারত আমাদের সহায়তা করেছিল। আমাদের শরাণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, অস্ত্র দিয়েছিল। এমনকি যারা জাতিসংঘে আমাদের সমর্থন দিয়েছিলেন আমি তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি। শেখ হাসিনা বলেন, ৮ই জানুয়ারি জাতির পিতা পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পান। সেখান থেকে লন্ডন যান। তারপর দিল্লি হয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন। ১০ই জানুয়ারি তিনি বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন। আমরা ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করেছিলাম সত্য কিন্তু তারপরও বঙ্গবন্ধু দেশে না ফেরা পর্যন্ত সকলের কাছে মনে হয়েছিল স্বাধীনতার আনন্দ যেন অধরা। দেশের মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলার মানুষের কথা বলতে গিয়ে তিনি জীবনের অনেক সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। এ দেশের মানুষ যেন অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও উন্নত জীবন পায় এটাই ছিল তার স্বপ্ন। জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলবো, এটাই আমার প্রত্যয়।
মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা উদ্বোধন ঘোষণা করে তিনি বলেন, আজ জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিন। এই দিনেই তার জন্মশতবাষির্কী উদযাপনের ক্ষণগণনা ঘোষণা করছি। যে দিনে তিনি তার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছিলেন, সে দিনই তার জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠান উদযাপনের ক্ষণগণনা ঘোষণা করছি।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে বিজয়ের যে ‘আলোকবর্তিকা’ তুলে দিয়েছেন, তা নিয়েই পথচলার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে বিজয়ের আলোকবর্তিতা তিনি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, সে মশাল নিয়েই আমরা আগামী দিনে চলতে চাই। বাংলাদেশকে আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে গড়তে চাই।
আয়োজকদের ধন্যবাদ দিয়ে ১৯৭২ সালের সেই দিনের কথা উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সেদিনটিতে আমরা হয়ত বিমানবন্দরে আসতে পারিনি, তখন আমার বাচ্চাটি ছোট ছিল, আমরা এমন অবস্থায় ছিলাম। কিন্তু আমার মনে পড়ে মা সর্বক্ষণ একটি রেডিও নিয়ে বসেছিলেন, ধারাবাহিক বিবরণ শুনছিলেন, আমরা পাশে বসে সারাক্ষণ ধারা বিবরণী শুনেছিলাম। স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমার মনে পড়ে বঙ্গবন্ধু বাংলার মাটিতে এসে কিন্তু আমাদের কথা ভাবেননি। তিনি চলে গিয়েছিলেন রেসকোর্স ময়দানে, তার প্রিয় জনগণের কাছে। তারপরে আমরা তাকে পাই। তিনি এদেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবেসেছেন। চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষ সুন্দর জীবন পাবে। এই প্রেক্ষাপটে কবিগুরুর ’বঙ্গমাতা’ কবিতার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ’সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি’। তারই উত্তর (বঙ্গবন্ধু) দিয়েছিলেন এই ১০ই জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে।
জাতির পিতা বলেছিলেন, কবি গুরু দেখে যান আপনার সাত কোটি বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে, তারা যুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছে। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে চলার প্রত্যয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাঝখানে একটা কালো অধ্যায় চলে গেছে, সেই কালো অধ্যায় যেন আর কোনো দিন আমাদের দেশের মানুষের উপর ছায়া ফেলতে না পারে।
আমাদের দেশের মানুষ যেন জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলে এই বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারে, সেই কামনা করে ক্ষণগণনার শুভ সূচনা ঘোষণা করছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলুন আজকের দিনে আমরা সেই প্রত্যয় নিই যে, এই বাংলাদেশ কারও কাছে মাথা নত করে না, বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে বিশ্বে চলবে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন সেই সোনার বাংলা ইনশাআল্লাহ আমরা গড়ে তুলব। বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে সবাইকে তার সঙ্গে স্লোগান ধরতে বলেন। জয় বাংল, জয় বাংলা এবং জয় বাংলা বলে বক্তব্যে শেষ করেন তিনি।
সারা দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের ২৮টি জায়গা, বিভাগীয় শহর, ৫৩ জেলা, দুই উপজেলা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীতে মোট ৮৩টি স্থানে একসঙ্গে ক্ষণগণনার ঘড়ি চালু করা হয়েছে। এই ক্ষণ গণনা শেষে আগামী ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে সূচনা হবে মুজিববর্ষের বছরব্যাপী অনুষ্ঠানের; বছরজুড়ে চলবে সেই আয়োজন। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নানা আয়োজন থাকবে। ২০২০ সালের ১৭ই মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম গ্রহণের শততম বছর পূর্ণ হবে। এবছরের ১৭ই মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ই মার্চ পর্যন্ত জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদযাপন করবে বাংলাদেশ।

ট্যাগ সমূহ
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *