রাজনীতি

বাংলাদেশে অপপ্রচারে কান না দেয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুজবে কান না দেয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, গুজব ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে আমরা দেখি, অপপ্রচার চালিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়। আমি সবাইকে বলব, এ অপপ্রচারে কান দেবেন না।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি মাল্টিপারপাস হলে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে একথা বলেন।
এদিকে বিকালে সেনাকুঞ্জে অপর এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, দেশের গণতান্ত্রিক ধারা সমুন্নত রাখতে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ ‘আন্তরিকতা’ ও ‘নিষ্ঠা’র সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাবেন। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, সর্বাবস্থায় চেইন অব কমান্ড মেনে ও সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে দেশ গঠনে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।’ বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ ‘দায়িত্ববোধ’ ও ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মপ্রচেষ্টা’র মাধ্যমে কাজ করে যাবেন।
আর্মি মাল্টিপারপাস হলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিশেষ করে পেঁয়াজ, লবণ প্রভৃতির সংকটের অপপ্রচার চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এটা করবে আমি জানি, এটা স্বাভাবিক। কাজেই সেটাকে মোকাবেলা করেই আমাদের চলতে হবে, আমরা সেভাবেই চলছি।’ সম্প্রতি পেঁয়াজ, লবণ এবং চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অপপ্রচার চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সশস্ত্র বাহিনী দিবস-২০১৯ উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্য এবং সশস্ত্র বাহিনীর খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার মাছ এবং সবজিসহ বিভিন্ন তরি-তরকারির উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে এবং এখন জনগণের নিরাপদ খাদ্য এবং পুুষ্টির চাহিদা পূরণে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে ৩০ প্রকারের ওষুধ বিনামূল্যে দিচ্ছি। মৌলিক চাহিদা পূরণে কর্মসূচি গ্রহণ করেছি এবং তা অব্যাহত থাকবে।’
শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা আগামী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে মুক্তিযোদ্ধাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের কাহিনী শিশু, নাতি-নাতনি এবং স্থানীয়দের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সব উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স তৈরি করে দিচ্ছি। কাজেই সেসব অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের দলিল-দস্তাবেজ আর নষ্ট হবে না এবং আগামী প্রজন্মের শিশুরা যুদ্ধের প্রকৃত ঘটনা জানতে পারবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছি, আমরা বিজয়ী জাতি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম জানবে বাঙালি জাতি কখনও হারতে জানে না। এর মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের আত্মমর্যাদার ধারণা তৈরি হবে এবং তারা মাথা উঁচু করে চলতে শিখবে।’
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা তার জ্বালাময়ী ভাষণে বলেন- বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না। কেউ অতীতে বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে পারে নাই এবং পারবেও না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে যে সম্মান অর্জন করেছিল কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে তা আবার হারিয়ে ফেলে এবং দেশটি হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের দেশে পরিণত হয়। সে সময় ১৯টি ক্যু হয়েছিল এবং সশস্ত্র বাহিনীর বহু সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হত্যা করা হয়। ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধ্বংস করার এবং জাতির পিতার নাম মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু ২১ বছর পর সরকার গঠন করে আমরা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা ফিরিয়ে এনেছি। আমরা বঙ্গবন্ধুর খুনি এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতার আদর্শকে ধারণ করে এবং তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে দাঁড় করিয়েছি এবং আমরা অবশ্যই জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণেও সক্ষম হব।’
তিনি বলেন, ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি তা কখনও বৃথা যেতে পারে না।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ এবং আর্থ-সামাজিক সমৃদ্ধিতে আমরা সংকল্পবদ্ধ। আমরা তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং সম্মান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। তিনি সব জেলা এবং উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার মহান দায়িত্ব সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ন্যস্ত। তিনি বলেন, এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনীর দেশপ্রেমিক সদস্যরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা অব্যাহত রেখেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এজন্য আমরা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী যেমন- আধুনিকায়ন, ভৌত এবং অবকাঠামোগত প্রভৃতি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।’ প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধাদের আনুষ্ঠানিক সম্মান প্রদানের উদ্যোগ নেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান।
তিনি দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করেন, সশস্ত্র বাহিনী বিপন্ন এবং অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের জন্য জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ৭ বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্য এবং খেতাবজয়ী সশস্ত্র বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানীর চেক এবং উপহার তুলে দেন। তিনি সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের হাতে ‘বিশিষ্ট সেবা পদক’ এবং ৯ জন সেনা সদস্য, দু’জন নৌবাহিনীর সদস্য এবং তিনজন বিমানবাহিনীর সদস্যের হাতে শান্তিকালীন ‘বাহিনী পদক’ তুলে দেন।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পিএসও লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল আবু মোজাফফর মহিউদ্দিন মোহাম্মাদ আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সশস্ত্র বাহিনীর খেতাবজয়ী ১০১ জন মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবার-পরিজন ও ৭ বীরশ্রেষ্ঠের নিকটাত্মীয়রা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে একযোগে কাজ করুন : ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে বিকালের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে নিজ অবস্থানে থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে একযোগে দায়িত্ব পালনের জন্য সকলের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের অর্থনীতি এখন অনেক শক্তিশালী। কাজেই আমি চাই, প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে নিজের দেশকে গড়ে তুলবেন।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘কারো কাছে হাত পেতে নয়, কারো কাছে মাথা নত করে নয়।
বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে, সম্মানের সঙ্গে চলবে। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী জাতি হিসেবে আমরা এগিয়ে যাব, এটাই আমাদের লক্ষ্য। আর সেভাবেই আমরা দেশকে গড়তে চাই।’ ‘অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বের পাঁচটি দেশের একটি এখন বাংলাদেশ’-এমন অভিমত ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ তাঁর উন্নয়ন বাজেটের শতকরা ৯০ শতাংশ এখন নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে যদি শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে তাহলে অগ্রগতি অবশ্যম্ভাবী, এটা হতেই হবে। তাই, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে তা অব্যাহত থাকবে।’
‘দেশের মানুষ যেন শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, সে ব্যবস্থাই আমরা করতে চাই,’ যোগ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীকে ‘দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক’ আখ্যায়িত করে এ সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জনকল্যাণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি এ সময় সাম্প্রতিককালের ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোকাবেলায় সশস্ত্র বাহিনীর সাফল্যেরও উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল আবু মোজাফ্ফর মহিউদ্দিন মোহাম্মাদ আওরঙ্গজেব চৌধুরী এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত ভাষণদানরত প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, জাতীয় পার্টির (এরশাদ) চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ ১৪ দলীয় নেতা, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্যান্য বিশিষ্ট রাজনীতিকগণ, বিদেশি কূটনীতিকরা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তি, সম্পাদক, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক নেতা এবং তাদের সহধর্মিণীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর সিনিয়র সদস্যরা, তাদের পরিবারের সদস্য এবং বিদেশি কূটনীতিকসহ অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রী এর আগে সম্প্রসারিত এবং পুনর্নির্মিত সেনাকুঞ্জের বর্ধিতাংশের ও উদ্বোধন করেন।
‘শিখা অনির্বাণে’ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ প্রধানমন্ত্রীর : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে ঢাকা সেনানিবাসের ‘শিখা অনির্বাণে’ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে সশস্ত্র বাহিনীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে শহীদদের মহান আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর বাছাইকৃত চৌকস সদস্যের একটি দল গার্ড অব অনার প্রদান করে এবং বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে।
পরে শিখা অনির্বাণ চত্বরে পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। প্রধানমন্ত্রী শিখা অনির্বাণে পৌঁছলে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল আবু মোজাফফর মহিউদ্দিন মোহাম্মাদ আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবত এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে যান, যেখানে তিন বাহিনী প্রধানরা তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে প্রধানমন্ত্রীকে পিএসও এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের মহাপরিচালকরা অভ্যর্থনা জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার নির্দেশে প্রণীত প্রতিরক্ষা নীতিমালার আলোকে ফোর্সেস গোল-২০৩০ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় তিন বাহিনীর পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের কার্যক্রমসমূহ পর্যায়ক্রমে তার সরকার বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। প্রতিটি বাহিনীকে যুগোপযোগী করার পদক্ষেপ তার সরকার নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির প্রয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কাজেই আধুনিকায়নের দিকে আমাদের যেতে হবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্যই সে ক্ষেত্রে আমাদের সরকার সবসময় পদক্ষেপ নিয়ে থাকে, আমরা তাই নিচ্ছি।
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার সিলেট, রামু এবং পটুয়াখালীতে তিনটি পূর্ণাঙ্গ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, সরঞ্জামাদি ও জনবলের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। জাতিসংঘ ১৯৮২ সালে সমুদ্রসীমা আইন করলেও ১৯৭৪ সালেই জাতির পিতা বাংলাদেশে এ আইন করে যান বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতে জয়লাভের মাধ্যমে আমরা ভারত ও মিয়ানমারের কাছ থেকে দু’দফায় এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি সমুদ্রসীমায় অধিকার লাভ করেছি।
সমুদ্রসীমা নিরাপদ রাখার পাশাপাশি ‘ব্লু ইকোনমি’র সর্বোচ্চ উপযোগিতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশীয় শিপইয়ার্ডে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি পেট্রলক্রাফট নির্মাণ করেছে। তিনি বলেন, আমাদের বিমানবাহিনীকে আমরা আধুনিক বিমানবাহিনী হিসেবে গড়ে তোলায় বিভিন্ন সরঞ্জামাদি কিনে দিচ্ছি এবং প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা নিচ্ছি।
সশস্ত্র বাহিনীর কল্যাণে তার সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, সরকার ইতিমধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট, টেকনিক্যাল ও ট্রেনিং ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তাদের আবাসন সমস্যার সমাধান করেছে।
’৯৬ সালে সরকারে থাকার সময় ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ স্থাপন (এনডিসি), ওয়ার কলেজ স্থাপন, মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে, বলেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, দেশকে উন্নত করার পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের দিকেও আমরা দৃষ্টি দিচ্ছি।
দেশ পরিচালনায় জাতির পিতার দূরদর্শী নীতিকথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু গভীর প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি নিয়ে একটি আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লক্ষ্যই ছিল একটি দক্ষ ও চৌকস সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা। শেখ হাসিনা বলেন, মাত্র সাড়ে তিন বছরে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রয়োজনীয় বুনিয়াদ তৈরি করে দেন জাতির পিতা। প্রধানমন্ত্রী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী ১১ লাখেরও বেশি মিয়ানমারের নাগরিককে সহায়তা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত নারী সদস্যসহ বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্বে আমরা যে স্বীকৃতি পেয়েছি, তা আমাদের ধরে রাখতে হবে। এ জন্য ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। তিনি বলেন, ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করব। আর সে সময়কে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। যখন বাংলাদেশে আর দরিদ্র থাকবে না।

ট্যাগ সমূহ
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *